কেমন করে সেটা পাব?
পাবেন না, যদি না কালুলুর মতো কেউ আপনাদের সেখানে নিয়ে যায়। একটা ভাসমান দ্বীপে জলায় থাকে সে, হ্রদের আগাছার একটা দ্বীপ। নদীর বাইরের অংশের কাছে।
ওকে কীকরে পাব?
খোঁজ করে, তন্নতন্ন করে, আর ভাগ্য ভালো হলে। কাঁধ ঝাঁকাল পোতো। কিংবা হয়তো সেই আপনাদের খুঁজে নেবে। তারপর অনেকটা যেন দ্বিতীয় ভাবনার ঢঙে সে বলল, কালুলু বিরাট অলৌকিক শক্তিঅলা একজন শামান, কিন্তু তার পা নেই।
ওরা গ্রাম ছাড়ার সময় পোতোকে দুই মুঠো কাঁচের পুঁতি দিল তাইতা। কেঁদে ফেলল বুড়ো। আমাকে আপনি ধনী করে দিয়েছেন, বুড়ো বয়সে সুখী হয়েছি। এখন আমার দেখা শোনা করতে দুটি অল্প বয়সী বউ কিনতে পারব।
*
তীর বরাবর দক্ষিণে এগোনোর সময় দেখা গেল নীল নদের গতি কিছুটা জোরাল হয়েছে, তবে জলরেখার উচ্চতা থেকে ওরা বুঝতে পারছিল আগের বছরগুলোর তুলনায় পানির স্তর অনেক অনেক নিচে।
বিশগুন শুকিয়ে গেছে, হিসাব করে বলল মেরেন। সায় দিল তাইতা। যদিও মুখে তেমন কিছু বলল না। অনেক সময় মেরেনকে মনে করিয়ে দিতে হয়, সে মোহান্ত নয়, কিছু কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো এসব যারা বোঝে তাদের হাতেই ছেড়ে দেওয়া উচিত।
পশ্চিম তীর ধরে এগোনোর সময় দিন পেরুনোর সাথে সাথে মানুষ ও পশু ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে লাগল। হ্রদের কাছে পৌঁছুতে পৌঁছুতে সবাই মাছির আক্রমণের প্রভাব থেকে পুরোপুরি সেরে উঠল। পোতোর বর্ণনার মতোই আবিষ্কার করল ওরা হ্রদটা। বিশাল।
সামান্য হ্রদ নয়, এটা নির্ঘাৎ সাগর, ঘোষণা দিল মেরেন। নদী থেকে এক কলসি পানি আনতে পাঠাল ওকে তাই।
এবার খেয়ে দেখ, সৎ মেরেন, নির্দেশ দিল ও। ইতস্তত করে এক চুমুক পানি নিয়ে মুখের ভেতর ঘোরাল সে। তারপর কলসীর বাকি পানিটুকুও খেলো।
লোনা সাগর? করুণার হাসি দিল তাইতা।
না, ম্যাগাস, মধুর মতো মিষ্টি। আমার ভুল হয়েছে, আপনার কথাই ঠিক।
হ্রদটা এত বিশাল, মনে হচ্ছে নিজেই বায়ুমণ্ডল তৈরি করে নিয়েছে। ভোরের হাওয়া ঠাণ্ডা, নিথর। তলদেশে থেকে শুন্যে উঠে আসা ধোঁয়ার মতো লাগছে।
আগ্নেয়গিরির কারণে পানি গরম হয়ে উঠছে, বলল একজন।
না, বলল আরেক জন। কুয়াশার মতো উবে যাচ্ছে পানি। বৃষ্টি হয়ে অন্য কোথাও ঝরে পড়বে।
উঁহু, এটা পানিতে বাস করা সাগর দানোর ভয়াল নিঃশ্বাস, কর্তৃত্বের সাথে বলল মেরেন।
শেষে সত্যি কথা জানবার জন্যে তাইতার দিকে তাকাল ওরা।
মাকড়শা, বলল তাইতা, ফলে আরেকটা প্রবল বিতর্কে লিপ্ত হলো ওরা।
মাকড়শা উড়তে পারে না। ফড়িংয়ের কথা বুঝিয়েছেন উনি-গঙ্গা ফড়িং।
আমাদের বিশ্বাস নিয়ে ঠাট্টা করছেন তিনি, বলল মেরেন। ওকে ভালো করেই চিনি। ছোটখাট মজা করতে ভালোবাসেন।
দুদিন বাদে বাতাস পড়ে গেল, একটা মেঘের মতো জটলা ভেসে এলো শিবিরের উপর। জমিনের কাছে আসার পর নামতে শুরু করল ওটা। লাফিয়ে শূন্যে উঠে কি যেন লুফে নিল ফেন।
মাকড়শা! চিৎকার করে উঠল ও। তাইতার কখনও ভুল হয় না। অগুনতি সদ্য জন্মানো মাকড়শা মিলে তৈরি করেছে মেঘটা, এত ছোট যে স্বচ্ছই মনে হয়। ভোরের হাওয়া ধরার জন্যে এক ধরনের জালের পাল তৈরি করে নিয়েছে ওরা, যাতে হ্রদের কোনও নতুন এলাকায় নিরাপদে নামতে পারে।
সূর্য রশ্মি পানি স্পর্শ করার সাথে সাথে বাতাস চড়ে উঠল। দুপুরের দিকে বাতাসকে আঘাত করে ঘূর্ণী তৈরি করতে লাগল। বিকেলের দিকে কমে আসতে শুরু করে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অব্যাহত রইল। চারদিকে নেমে এলো সুনসান নীরবতা। তরঙ্গায়িত গোলাপি ডানায় ভর করে দিগন্তে উড়ে চলল ফ্লামিঙ্গোর ঝক। জলহস্তীর দল গ্রানিট বোল্ডারের মতো জলে গড়াগড়ি যাচ্ছে, বিশাল গুহার মতো গোলাপি চোয়াল হাঁ করে দীর্ঘ শ্বদন্ত বের করে ভয় দেখাচ্ছে প্রতিপক্ষকে। বালির উপর শুয়ে আছে দানবীয় কুমীরের দল, রোদ পোহাচ্ছে; মুখ হাঁ করে রেখেছে যাতে পানির পাখিরা হলদে দাঁতের ফাঁকে আটকে যাওয়া মাংসের টুকরো খুঁড়ে বের করে আনতে পারে। রাতগুলো নিথর, মখমলের মতো চকচকে জলে ঠিকরে যায় তারার আলো।
হ্রদের পশ্চিম দিকটা এত বিশাল যে ওখানটায় জমিনের কোনও চিহ্ন চোখে পড়ে না, স্রেফ কয়েকটা ছোট ছোট দ্বীপ বাতাসের আঘাতে বিক্ষিপ্ত জলের উপর ডিঙি নৌকার মতো ভেসে চলে বলে মনে হয়। আর দক্ষিণে হ্রদের কেবল অপর প্রান্ত কোনওমতে চোখে পড়ে। উঁচু পাহাড়চূড়া বা আগ্নেয়গিরি বলে কিছু নেই, কেবল নিচু টিলার নীল বিস্তার।
স্থানীয় গোত্রগুলোর হিংস্রতা সম্পর্কে ওদের সাবধান করে দিয়েছিল পোতো। তাই সুরক্ষিত হ্রদের কিনারায় জন্মানো বাবলা গাছের কাঁটা ডালের শিবির গড়ে তুলল ওরা। দিনের বেলায় ঘোড়া আর খচ্চরগুলো উপকূলে জন্মানো ঘেসো জমিনে চরে বেড়ায় বা জল ভেঙে নেমে যায় শাপলা আর অগভীর জলে জন্মানো অন্যান্য জলজ গাছের ফুলের ভোজ উৎসবে মেতে উঠতে।
আমরা শামান কালুলুর খোঁজে নামছি কখন? জানতে চাইল ফেন।
আজই সন্ধ্যার খাবার শেষ করে।
প্রতিশ্রুতি মতো ওকে সৈকতে নিয়ে গেল তাইতা, ভেসে আসা কাঠ দিয়ে একটা আগুন জ্বালল এখানে। ওটার পাশে বসে ফেনের হাত তুলে নিল তাইতা, তারপর প্রতিরক্ষার একটা বৃত্ত তৈরি করে নিল। কালুলু মোহন্ত হলে, পোতো যেমন বলেছে, ইথারে তাকে আহবান জানাতে পারব আমরা, বলল তাইতা।
