বিবাহিতা মেয়েরা তাইতা, মেরেন, ও তার ক্যাপ্টেনদের জন্যে কালাবাশ ভর্তি টক বিয়র নিয়ে এলো। ওদিকে সেই প্রবীন লোকটা, তার নাম পোলতা, গর্বিত ভঙ্গিতে তার পাশে বসে রইল। নাকোন্তোর প্রশ্নের জবাব দিতে লাগল ঝটপট।
দক্ষিণের এলাকা ভালো করেই চিনি আমি, গর্বের সাথে বলল সে। আমার বাবা আর তার বাবা মহা হ্রদের পাশে ছিল, মাছে ভরা ছিল সেগুলো, কোনওটা এত বিশাল যে চার জনে মিলে একটা মাছকে তুলতে হতো। ওদের পেট ছিল এত বড়… শীর্ণ বাহু দিয়ে একটা বৃত্ত তৈরি করল সে।…আর এত লম্বা… লাফ দিয়ে উঠে বিশাল পায়ের আঙুলে মাটির উপর একটা রেখা আঁকল, তারপর চার কদম সামনে বেড়ে আঁকল দ্বিতীয় রেখাটা।…এখান থেকে ওই পর্যন্ত।
সারা দুনিয়ার জেলেরা একই রকম, মন্তব্য করল তাইতা, তবে বিস্ময়ের জুৎসই আওয়াজ করল মুখে। পোতোকে ওর গোত্রের লোকেরা অবহেলা করে বলে মনে হলো, একবারের জন্যে হলেও পূর্ণ মনোযোগ পেয়েছে সে। নতুন বন্ধুদের সঙ্গ তার ভালো লাগছে।
তোমাদের গোত্র অমন একটা চমৎকার জায়গা ছেড়ে চলে এলো কেন? জানতে চাইল তাইতা।
পুব থকে আরেকটা শক্তিশালী ও অনেক বড় একটা দল আসায় ওদের ঠেকাতে পারিনি। নদী বরাবার আমাদের উত্তরে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে ওরা। মুহূর্তের জন্যে বিমর্ষ দেখাল তাকে, তারপর ফের খেই ধরল। আমার খত্ন আর দীক্ষার পর বাবা আমাকে আমাদের এই নদীর জন্মস্থান সেই বিরাট জলপ্রপাতের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। নীলের দিকে ইঙ্গিত করল সে, ওটার তীরেই বসেছিল ওরা। জলপ্রপাতের নাম তালা মাদযি, বজ্রের ধনি তোলা জল।
এমন অস্বাভাবিক নাম কেন?
পড়ন্ত পানির গর্জন আর সাথে করে নিয়ে আসা পাথরের ভেঙে পড়ার আওয়াজ দুই দিনের দূরের পথ থেকেও শোনা যায়। আকাশের বুকে রূপালি মেঘের মতো প্রপাতের মাথার উপরে উঠে আসে পানির ফোয়ারা।
এমন অসাধারণ দৃশ্য চোখে দেখেছে কে? জিজ্ঞেস করে প্রবীন লোকটার উপর অন্তর্চক্ষু স্থির করল তাইতাতো।
খোদ এই চোখ দিয়েই, বলে উঠল পোতো। জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় নিভে যাওয়ার আগে জ্বলজ্বল করতে থাকা তেলের শিখার মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে ওর আভা। সত্যি কথা বলছে লোকটা।
তোমার বিশ্বাস এটাই নদীর জন্মস্থান? উত্তেজনায় দ্রুত হয়ে উঠেছে তাইতার হৃৎস্পন্দন।
বাবার আত্মার কসম খেয়ে বলতে পারি, জলপ্রপাতের ওখানেই শুরু হয়েছে নদীর।
ওদের উপরে ওপাশে আর কী আছে?
পানি, বিরস কণ্ঠে বলল পোত। পানি ছাড়া আর কিছু নেই। জগতের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত খালি পানি আর পানি।
জলপ্রপাতের ওপাশে আর কোনও জমিন দেখনি?
পানি ছাড়া আর কিছু না।
আকাশে ধোঁয়া উগড়ে দেওয়া জ্বলন্ত পাহাড় চোখে পড়েনি?
কিছু না, বলল পোতো। পানি ছাড়া আর কিছু না।
আমাদের জলপ্রপাতের কাছে নিয়ে যাবে? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
নাকোন্তো প্রশ্নটার তর্জমা করে দিতেই সতর্ক হয়ে উঠতে দেখা গেল তাকে। আমি আর কোনওদিন ফিরতে পারব না। ওখানকার লোকজন আমাদের শত্রু। আমাকে মেরে খেয়ে ফেলবে। নদী বরাবর যেতে পারব না, কারণ দেখতেই পাচ্ছেন, নদী অভিশপ্ত, মরতে চলেছে।
আমাদের সাথে এলে কাঁচের পুঁতি ভরা ব্যাগ দেব তোমাকে, প্রতিশ্রুতি দিল তাইতা। গোত্রের সবচেয়ে ধনী লোক হয়ে যাবে।
দ্বিধা করল না পোতো। ছাইয়ের মতো শাদা হয়ে গেছে তার চেহারা। ভয়ে কাঁপতে শুরু করেছে এখন। না! কোনওদিন না! একশো ব্যাগ পুঁতি দিলেও না। ওরা আমাকে খেয়ে নিলে আমার আত্মা আর কোনওদিন আগুনের ভেতর দিয়ে যেতে পারবে না। হায়েনা হয়ে সারা জীবন রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়াবে, পচা লাশ আর ফেলে দেওয়া টুকরাটাকরা খাবে। মনে হলো যেন লাফ দিয়ে উঠে পালাবে সে। কিন্তু আস্তে ওকে স্পর্শ করে বিরত রাখল তাইতা। নিজের প্রভাব প্রয়োগ করে শান্ত, আশ্বস্ত করল ওকে। ওর সাথে আবার কথা বলার আগে বড় বড় দুই ঢোক বিয়ার খেতে দিল ওকে।
আমাদের পথ দেখানোর মতো আর কেউ আছে?
মাথা নাড়ল পোতো। ওরা সবাই ভীতু, এমনকি আমার চেয়েও।
খানিকক্ষণ চুপ করে বসে রইল ওরা। তারপর নড়াচড়া শুরু করল পোতো। কঠিন সিদ্ধান্তে পৌঁছুনোর জন্যে ওকে সময় দিল তাইতা। শেষ পর্যন্ত কেশে উঠল সে, ধূলির উপর বিরাট এক দলা হলদে কফ ফেলল। মনে হয়ে একজন আছে, নিজে থেকেই বলল সে। কিন্তু না, নিশ্চয় সে মরে গেছে। শেষ বার যখন দেখি তখনই অনেক বয়স হয়েছিল তার। অনেক দিন আগের কথা সেটা। এমনকি তখনও সে আপনার চেয়ে বয়স্ক ছিল, সম্মানিত পুরুষ। তাইতার উদ্দেশে শ্ৰদ্ধার ইঙ্গিত করে মাথা দোলাল সে। সে হচ্ছে আমাদের গোত্র অস্তিত্ব পাওয়ার পর থেকে বেঁচে থাকাদের একজন।
কে সে? ওকে কোথায় পাওয়া যাবে? জানতে চাইল তাইতা।
তার নাম কালুলু। কোথায় পাওয়া যাবে তার পথ বাৎলে দেব আমি। আবার বালির উপর পায়ের আঙুল দিয়ে আঁকতে শুরু করল পোতো। আপনারা মহান নদী ধরে এগিয়ে গেলে, যেটা মরতে চলেছে, এমন একটা জায়গায় হাজির হবেন যেখানে এটা অনেক হ্রদের একটার সাথে মিলেছে। বিশাল পানির বিস্তার এটা। আমরা একে বলি সেমলিকি নিয়নযু। চ্যাপ্টা ভাঙা বৃত্তের মতো করে আঁকল সে।
এখানেই তাহলে নদীর জন্মস্থানের সেই জলপ্রপাতের দেখা পাব? জানতে চাইল তাইতা।
না। মাছের পেট থেকে বের হয়ে আসা বর্শার ফলার মতো হ্রদ থেকে বের হয়ে এসেছে নদীটা। বৃত্তের ভেতর দিয়ে ফুটো তৈরি করল সে। আমাদের নদীটা বাইরের অংশ, ভেতরের অংশ পড়েছে হ্রদের দক্ষিণ তীরে।
