কোল্টকে গোসল করানোর পরপরই এবার উইন্ডস্মোকের দিকে ফিরল তাইতা। সাহস রাখ, প্রিয়া আমার, ভেজা এক টুকরো লিনেন দিয়ে গা মুছে দেওয়ার সময় বিড়বিড় করে বলল ও। টাটকা কাপড়ে ভালো করে মোছার সময় মেরেন সাহায্য করল, তারপর তাইতার বাঘের ছাল পরিয়ে দিল ওরা। আমরা একসাথে এটাকে ঠেকাব, মেয়ারের সাথে কথা বলে চলল ও। নাম ধরে ডাকার সময় বারবার কণ্ঠের শক্তি কাজে লাগাল। কান খাড়া করে ওর কথা শুনতে লাগল ও। পা ছড়িয়ে ভারসাম্য ধরে রাখল। বাক-হার। উইন্ডস্মোক। হাল ছাড়িস না।
নিজের হাতে মধুতে ডোবানো ভোলাস পিঠা খাওয়াল ওকে। এমনকি এমনি বিপর্যয়ের মুহূর্তেও এই মজাদার খাবারটা ঠেকাতে পারল না সে। এবার ঘোড়াটাকে এক বাটি ওর তৈরি ঘোড়ার সর্দি কাশির বিশেষ প্রতিষেধক খেতে বাধ্য করল। ফেন আর ও হাতে হাত মিলিয়ে ঘোড়ারূপ দেবতা হোরাসের প্রতিরক্ষার জন্যে মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল। মেরেন আর ওর লোকজন প্রার্থনায় যোগ দিল, রাতের বাকি অংশ অব্যাহত থাকল তা। সকাল নাগাদ উইন্ডস্মোক ও তার কোল্টটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। কিন্তু ওদের মাথা ঝুলে পড়েছে, পিঠা খেতে চাইছে না। তবে ভয়ানক পিপাসার্ত হয়ে পড়েছে ওরা, তাইতা ও ফেনের ধরে রাখা পাত্র থেকে আগ্রহের সাথে পানি খাচ্ছে। দুপুরের ঠিক আগে আগে মাথা ওঠাল উইন্ডস্মোক, কোল্টের উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল। তারপর টলমল পায়ে এগিয়ে গেল ওটার দিকে। কাঁধে ধাক্কা দিল। মায়ের দিকে তাকাতে মাথা ওঠাল সে।
মাথা উঠিয়েছে, উত্তেজিত কণ্ঠে বলল একজন।
আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে মেয়ারটা, বলল আরেকজন। নিজের আর বাচ্চাটার জন্যে লড়ছে।
ঘামছে না আর। জ্বর নেমে যাচ্ছে।
সেদিন বিকেলে মধু মাখানো আরও পাঁচটা তোলাস পিঠা খেল উইন্ডস্মোক। পরের দিন সকালে তাইতার পিছু পিছু নদীর কাছে গিয়ে শাদা বালিতে গড়াগড়ি খেল। সব সময় নীলের তীরে জন্মানো রসাল গোলাপি শিষঅলা একটা বিশেষ ধরনের ঘাসের প্রতি দুর্বল সে, তাই তাইতা ও ফেন বেশ কয়েক বান্ডিল কেটে পছন্দসই ডগা বেছে দিল। চতুর্থ দিন সকালে উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ড পেট ভরে খেল ওই জিনিস।
বিপদ কেটে গেছে ওদের, ঘোষণা দিল তাইতা। ওয়ার্লউইন্ডকে আলিঙ্গন করল ফেন। তারপর এমনভাবে কাদল যেন ওর মন ভেঙে গেছে, আর কোনওদিন ভালো হবে না।
তোলাস পিঠা সত্ত্বেও অন্য ঘোড়াগুলোর রোগের একই রকম লক্ষণ দেখা গেল। বারটা মারা গেল, কিন্তু বেঁচে যাওয়া ঘোড়াদের ছোট পাল থেকে তাদের শূন্য স্থান পূরণ করল মেরেন। কয়েকজন লোকও মাছির বিষাক্ত প্রভাবে ভুগছিল। দুঃসহ মাথা ব্যথায় অস্থির হয়ে উঠেছে তারা, ওদের শরীরের প্রতিটি সন্ধি এমন আড়ষ্ট হয়ে গেছে যে বলতে গেলে হাঁটতে পারছে না। আবার যাত্রা শুরু করার মতো সুস্থ হয়ে উঠতে মানুষ ও পশুর আরও অনেক কটা দিন লেগে গেল। তারপরও তাইতা ও ফেন ওদের জন্যে উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ডকে ভারাক্রান্ত করতে গেল না। বরং হল্টার রোপ দিয়ে টেনে বাড়তি ঘোড়ার পিঠে এগোল। দৈনন্দিন যাত্রার বেগ ও পাল্লা কমিয়ে নিল মেরেন যাতে ওরা পুরোপুরি সেরে উঠতে পারে। তারপর দিন পেরিয়ে যাবার সাথে সাথে গতি বাড়াতে লাগল ও, আরও একবার বেশ দ্রুত আগে বাড়তে লাগল।
মাছিদের রাজত্বের পর দুই শশা লীগ এলাকাজুড়ে জনমনিষ্যির কোনও চিহ্ন ছিল না কোথাও। তারপর যাযাবর জেলেদের একটা ছোট গ্রামের দেখা মিলল। ঘোড়সওয়ারদের দলের আগমনের সাথে সাথে পালিয়ে গেল ওখানকার বাসিন্দারা। ফ্যাকাশে ত্বকের অদ্ভুত ব্রোঞ্জের অস্ত্রশস্ত্র আর অদ্ভুত শিঙহীন পশুর পিঠে আসীন লোকগুলোর সাথে দেখা হওয়াটা ওদের পক্ষে ভয়ানক ছিল। ওদের মাছ ঝলসানোর তাক পরখ করল তাইতা, দেখা গেল ওগুলো প্রায় খালি। নীলও এখন গ্রামের জন্যে পর্যাপ্ত উপহার বিলোচ্ছে না। স্পষ্টতই জেলেরা উপোস মরছিল।
নদী তীরের প্লাবন রেখা বরবার একটা বিরাট বাঁকা তলোয়ারের মতো শিঙ আর চোখের চারপাশে শাদা ছোপঅলা স্বাস্থ্যবান অ্যান্টিলোপের পাল চরে বেড়াচ্ছিল। মদ্দাগুলো কালো রংয়ের, মাদীগুলোর গায়ের রঙ গাঢ় লাল। পাঁচ জন। অশ্বারোহী তীরন্দাজকে পাঠিয়ে দিল মেরেন। ঘোড়াগুলোর প্রতি অ্যান্টিলোপগুলোকে কৌতূহলী মনে হলো। ওদের সাথে যোগ দিতে এগিয়ে এলো। তীরের প্রথম হামলায় লুটিয়ে পড়ল চারটা অ্যান্টিলোপ, পরের হামলায় প্রায় সমান সংখ্যক। শান্তির প্রতীক হিসাবে মৃতদেহগুলোকে গ্রামের সীমানায় ফেলে রাখল ওরা। অপেক্ষা করতে লাগল তারপর। বেশি সময় বিরত থাকতে পারল না ক্ষুধার্ত গ্রামবাসী। সাবধানে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসতে শুরু করল। আগন্তকদের তরফ থেকে আক্রমণের যেকোনও লক্ষণ চোখে পড়ামাত্রই সটকে পড়তে তৈরি। ওরা পশুগুলোর ছাল খসিয়ে মাংস গোটা বার আগুনে পোড়াতে দেওয়ার পর শুভেচ্ছা জানাতে এগিয়ে গেল নাকোন্তো। ওদের মুখপাত্র ধূসর দাড়িঅলা শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তীক্ষ্ণ ভাঙা ভাঙা কথায় সাড়া দিল সে।
তাইতাকে রিপোর্ট করতে ফিরে এলো নাকোন্তো। এই লোকগুলো ঊতাসাদের সাথে সম্পর্কিত। খুবই পরিচিত ওদের ভাষা, পরিষ্কার বুঝতে পারি আমরা।
ইতিমধ্যে যথেষ্ট সাহসী হয়ে উঠেছে গ্রামবাসীরা, ওদের এবং ওদের অস্ত্র আর ঘোড়া পরখ করতে সামনে এগিয়ে এসেছে। অবিবাহিতা মেয়েরা স্রেফ কোমরে একটা পুঁতির মালা জড়িয়ে রেখেছে, শিলুক শিবির অনুসারী নেই এমন সৈনিকদের সাথে বলতে গেলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলল ওরা।
