তোমাদের ফ্লাই সুইচগুলো বের করো, হুকুম দিল মেরেন। অচিরেই হুল ফোঁটানো মাছিদের তাড়াতে গিয়ে ধর্মীয় আত্মনিপীড়নকারীদের মতো ঘোড়া আর নিজেদের গায়ে ক্রমাগত আঘাত হেনে চলল ওরা। পরের দিনগুলো রীতিমতো একটা অত্যাচারের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল, অবিরাম আক্রমণ হেনে চলেছে মাছির দল। দিনের উত্তপ্ততম সময়টায় সবচেয়ে খারাপ হয়ে ওঠে ওদের অবস্থা, কিন্তু চাঁদ ও তারার আলোতেও আক্রমণ চালিয়ে যায়, মানুষ আর ঘোড়াকে সমানভাবে পাগল বানিয়ে ছাড়ে।
অবিরাম শরীর আর পেছনে আঘাত হানছে ঘোড়াগুলোর লেজ। হামা দিয়ে চোখ আর কানে ঢুকে পড়া মাছি তাড়াতে বারবার মাথা নাড়ছে, চামড়ায় ঝাঁকি দিচ্ছে।
লোকদের চেহারা অদ্ভুতুড়ে কোনও লাল ফলের মতো ফুলে গেছে চোখগুলো বেল থলতলে মাংসের ফাঁকে রেখায় পরিণত হয়েছে। ওদের কাঁধের পেছন দিকটা কুঁজের মতো হয়ে গেছে, সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে চুলকানী। আঙুলের ডগা দিয়ে কানের পেছনে চুলকাতে চুলকাতে কাঁচা মাংস বের করে ফেলেছে ওরা। রাতে হাতির শুকনো গোবর দিয়ে ধোঁয়াটে আগুন জ্বালছে ওরা, তারপর তার উৎকট ধোয়ার পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে কাশছে, বিষম খাচ্ছে, নিস্তার পাওয়ার উপায় খুঁজছে। কিন্তু যখনই টাটকা বাতাসের সন্ধানে সরে আসছে, মাছির ঝাঁক হামলা চালাচ্ছে ওদের উপর, নেমে আসার সাথে সাথে গভীরে বিধিয়ে দিচ্ছে তীক্ষ্ণ হুল। ওদের শরীর এত শক্ত যে, হাতের তালু দিয়ে সজোরে থাপ্পড় মেরেও তেমন কিছু করা যায় না। এমনকি ওদের বসা অবস্থা থেকে ফেলে দিলেও আবার একইভাবে ফিরে আসে, শরীরের অন্য কোনও খোলা জায়গায় হুল ফোঁটায়। কেবল ফ্রাইসুইচগুলোই একমাত্র কাজের অস্ত্র। ওগুলোকে মারতে পারে না, তবে লম্বা পেছনের লম্বা চুল ঝুলে থাকা পা আর ডানা প্যাঁচ লেগে যায়, তখন আঙুলে চেপে ধরে মারা যায়।
এই দানোগুলোর আওতার নিশ্চয়ই একটা সীমা আছে, লোকদের উৎসাহিত করে তাইতা। নাকোন্তো ওদের স্বভাব ভালো জানে। ও বলছে, যেমন হুট করে ওদের মাঝে এসে পড়েছে, ঠিক তেমনি মুক্তি মিলবে।
জোর গতি স্থির করে ফোর্সড মার্চের নির্দেশ দিয়ে কলামের সামনে চলে এলো মেরেন। ঘুম থেকে বঞ্চিত ও রক্তের ধারায় মাছিগুলোর বিষ ঢেলে দেওয়ায় দুর্বল হয়ে পড়ায় স্যাডলের উপর দোল খাচ্ছে লোকেরা। কোনও সৈনিক ঢলে পড়লেই সতীর্থ আবার ঘোড়ার পিঠে তুলে দিচ্ছে তাকে, তারপর আবার সামনে বাড়ছে।
নাকোন্তোই কেবল পোকামাকড়ের হাত থেকে মুক্ত রয়েছে। মসৃণ ও চকচকে রয়ে গেছে ওর ত্বক। হুলের কোনও চিহ্ন নেই। পোকাগুলোকে ওর রক্ত পুরোপুরি শুষে নিতে দেয় ও, ফলে ওগুলো আর নড়াচড়া করতে না পারে। তখন ডানা ছিঁড়ে নেওয়ার সময় টিটকারী মারে ওদের সাথে মানুষ আমাকে ঘাই মেরেছে, চিতা কামড়েছে, সিংহ থাবা বসিয়েছে। তুমি কে এসেছ বিরক্ত করতে? এবার সোজা নরকে চলে যেতে পারো।
পাহাড় ছেড়ে আসার দশম দিনে মাছিদের এলাকা থেকে বের হয়ে এলো ওরা। ব্যাপারটা এত আকস্মিকভাবে ঘটল যে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না ওরা। এই পাক খাওয়া পোকাগুলোকে অভিশাপ দিয়ে আঘাত হেনে চলছিল ওরা, তারপর আরও পঞ্চাশ কদম সামনে বাড়ার পর দেখা গেল বনের নীরবতা ভীষণ গুঞ্জনে আর ভঙ্গ হচ্ছে না। এমনি স্বেচ্ছাচারের কবল থেকে বেঁচে লীগখানেক দূরে আসার পরেই একটা বিচ্ছিন্ন নদীর পুকুরে হাজির হলো ওরা। দলের প্রতি করুণা দেখাল মেরেন। ছড়িয়ে পড়ো! নির্দেশ দিল সে। সবার শেষে যে জলে নামবে সে একটা নির্বোধ কুমারী।
নগ্ন শরীরের হুটোপুটি লেগে গেল, স্বস্তি আর আনন্দের সাড়া পড়ে গেল গোটা বনে। ওরা যখন পুকুর থেকে উঠে এলো, সবার হুল ফোঁটা জায়গায় ম্যাগাসের একটা মলম মেখে পরিচর্যা করল তাইতা ও ফেন। সেরাতে ক্যাম্পফায়ার ঘিরে ওদের হাসি আর ঠাট্টা তামাশা ছিল নির্মল।
মাঝরাতে তাইতার উপর ঝুঁকে পড়ে ঝাঁকি দিয়ে ঘুম থেকে জাগাল ওকে ফেন। জলদি এসো, তাইতা! মারাত্মক কিছু ঘটছে। ওর হাত জাপ্টে ধরে টেনে হিঁচড়ে ঘোড়ার আস্তাবলে নিয়ে এলো। ওরা দুজনই, বেদনায় ভেঙে যাচ্ছে ফেনের কণ্ঠ। উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ড, একসাথে।
ওরা যখন আস্তাবলে পৌঁছুল, কোল্টটা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে, শ্বাস প্রশ্বাসের প্রবল চাপে ওঠানামা করছে বুকটা। ওটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে উইন্ডস্মোক, জিহ্বার দীর্ঘ ছোঁয়ায় চেটে দিচ্ছে ওর শরীর। ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টায় দুর্বলভাবে টলছে। গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেছে, ঘামে সপসপ করছে সারা শরীর। পেট থেকে ঝরে পড়ছে, গড়িয়ে নামছে পা দিয়ে।
শোফার আর ওর দলবলকে ডাকো। জলদি আসতে বলল ওদের। তারপর দৌড়ে গিয়ে ওদের সবচেয়ে বড় তিনটা পাত্রে পানি গরম করে আমার কাছে নিয়ে আসতে বলো। তাইতার মুল লক্ষ্য ওয়ার্লউইন্ডকে আবার খাড়া করা ও উইন্ডস্মোককে দাঁড় করিয়ে রাখা। ঘোড়া একবার লুটিয়ে পড়লে সেটা যুদ্ধ করার মনোবল হারিয়ে ফেলে, রোগের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
শোফার আর তার লোকজন ওয়ার্লউইন্ডকে দাঁড় করিয়ে দিল, তারপর উষ্ণ পানিতে ওটার গা মুছে দিল তাইতা। সামনে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে নাকে ফুঁ দিতে লাগল ফেন। ফিসফিস করে সাহস উৎসাহ আর আদর দেওয়ার ফাঁকে একটা তোলাস পিঠা খাওয়ানোর চেষ্টা করছে।
