কাঁধ ঝাঁকাল তোলাস। উতাসারা অদ্ভুত নামে ডাকে একে, তবে আমি কখনও কোনও মিশরিয় নাম রাখার কথা ভাবিনি।
তাহলে আমি এটার নাম রাখলাম তোলাস ফল, ঘোষণা দিল ফেন। খুশি হয়ে হাসল তোলাস।
পরের দিন তাইতা ও ফেন শোফার, চার সৈনিক আর প্রচুর পরিমাণ তোলাস পিঠা বানোনার জন্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে বনে ফিরে এলো। বনের মাঝে নীলের শুকনো তলদেশের মুখে একটা ফাঁকা জায়গায় শিবির খাটাল ওরা। দশদিন ওখানে থেকে পিঠা দিয়ে বিশটা বড় আকারের চামড়ার বস্তা বোঝাই করল। পিঙ্গল দাগে ভরা হাত ও দশটা মালবোঝাই খচ্চর নিয়ে যখন ফিরে এলো, মেরেন ও তার লোকজন তখন রওয়ানা দিতে উদগ্রীব হয়েছিল।
*
ওরা রাবাতকে বিদায় জানানোর সময় তাইতাকে বেদনার্ত কণ্ঠে সে বলল, এই জীবনে আমাদের হয়তো আর কোনওদিন দেখা হবে না, ম্যাগাস, তবে কিছুটা সেবা করার সুযোগ পাওয়াটা আমার জীবনের এক বিরাট সম্মানের ব্যাপার ছিল।
তোমার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সেবা ও চমৎকার সঙ্গের জন্যে আমি কৃতজ্ঞ। স্বয়ং ফারাও এই সংবাদ পাবেন, ওকে নিশ্চিত করল তাইতা।
তোলাসকে গাইড হিসাবে নিয়ে ফের দক্ষিণে কুমারীর বুকের মতো দেখতে পাহাড় আর মাছির দেশের পথ ধরল ওরা। আদারি দুর্গে কাটানো সময়টুকু মানুষ ও পশুর দলকে তরতাজা করে তুলেছে, ভালোই অগ্রগতি হয়েছে ওদের। শিকারীরা শিকার করা পশুর লেজ রেখে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল তাইতা। ছাল খসানোর কায়দা শিখিয়েছে, মাংস কুঁদে লবণ মেখে শুকোনোর জন্যে খোলা বাতাসে রেখে দিতে হবে। এই সময়ে কাঠ কেটে হাতল বানিয়েছে ওরা, তারপর শুকনো চামড়ার হাড়ের ফুটোয় জায়গায় বসিয়ে দিয়েছে, যেখান থেকে হাড় বের করে নেওয়া হয়েছে। শেষে, একটা ফ্লাই সুইচ নেড়েচেড়ে দেখিয়ে তাইতা ওদের বলেছে, শিগগিরই এর জন্যে শোকর করবে তোমরা। সম্ভবত মাছিদের পিছু হঠানোর এটাই একমাত্র অস্ত্র।
আদারি দুর্গ ছেড়ে আসার পর বিশতম দিন সকালে যথারীতি ভোর হতেই দ্রুত যাত্রা শুরু করল ওরা। দুপুর পেরুনোর অল্প খানিক পরে তোলাসের ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক কুমারীর বুকের মতো পাহাড়ের জোড়া চূড়া দিগন্তে মাথা তুলে দাঁড়াল।
আর নয়। থামার নির্দেশ দাও, মেরেনের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল তাইতা। আদারি দুর্গ ছেড়ে আসার আগেই স্থির করে রেখেছিল ও, তোলাসের কথা অন্ধের মতো অনুসরণ করবে না। এরই মধ্যে উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ডকে পিঠা খাওয়াতে শুরু করে দিয়েছে, আশা করছে, প্রথম বারের মতো হুলের ঘাঁই খাওয়ার আগেই ওষুধটা ওদের রক্তে জমাট বাঁধবে। মাছিদের এলাকায় প্রবেশ করার আগের সেই সন্ধ্যায় ফেনকে নিয়ে ঘোড়ার আস্তাবলে চলে এলো ও। ওদের আসতে দেখে হ্রেষাধ্বনি করে উঠল উইন্ডস্মোক। ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিল তাইতা, কানের পেছনে চুলকে দিল; তারপর তোলাস পিঠা খেতে দিল ওকে। ওয়ার্লউইন্ডের বেলায়ও একই কাজ করল ফেন। এতদিনে দুটোরই পিঠার জন্যে রুচি গড়ে উঠেছে, ক্ষুধার্তের মতো খেল ওরা। ছায়া থেকে দেখছিল তোলাস। এবার সামনে এসে অবিশ্বাসের সাথে সম্ভাষণ জানাল। তাহলে ধূসর মেয়ার আর ওর বাচ্চাটাকে নিয়ে যাচ্ছেন? জানতে চাইল সে।
ওদের ফেলে যেতে পারব না আমি, জবাব দিল তাইতা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলল তোলাস। বুঝতে পারছি, ম্যাগাস। সম্ভবত আমিও এমন কিছুই করতাম, কারণ এরই মধ্যে আমিও ভালোবেসে ফেলেছি ওদের। হোরাস আর আইসিসের কাছে প্রার্থনা করি, ওর যেন বেঁচে থাকে।
ধন্যবাদ, তোলাস। আমরা আবার একসাথে ফিরে আসব, এতে কোনও সন্দেহ নেই।
পরদিন সকালে আলাদা হয়ে গেল ওরা। তোলাসের পক্ষে এরচেয়ে বেশি দূরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না, আদারি দুর্গে ফিরে যাচ্ছে সে। নাকোন্তো রয়েছে সবার সামনে, ট্রেইল বের করছে; মেরেন ও তিনটা স্কোয়াড জোর কদমে এগিয়ে চলেছে তার পেছনে। ঠিক তারপরেই উইন্ডস্মোক ও ওয়ার্লউইন্ডের পিঠে রয়েছে তাইতা ও ফেন। আঠারটা স্বাস্থ্যবান ঘোড়া শিথিল পালে অনুসরণ করছে। চার নম্বর স্কোয়াডের সাথে বাকি সবাইকে নিয়ে আসছে শাবাকো।
সেদিন সন্ধ্যায় পাহাড়ের নিচে তাঁবু খাটাল ওরা। আগুনের পাশে বসে রাতের খাবার খাওয়ার সময় পাহাড়ের ওধারের সমভূমিতে শিকারী সিংহদের একটা দল গর্জন ছাড়তে শুরু করল, ভীতিকর শব্দ। বেঁধে রাখা ঘোড়াগুলোর দড়ির বাঁধন পরখ করতে গেল তাইতা ও মেরেন। কিন্তু সিংহগুলো কাছে এলো না, আস্তে আস্তে কমে এলো ওদের গর্জন, তারপর রাতের নীরবতা নামল।
পরদিন সকালে কলাম তৈরি হবার সময় ঘোড়াগুলোকে তোলাস পিঠা খাওয়াল তাইতা ও ফেন। তারপর স্যাডলে চেপে দুই পাহাড়ের মাঝখান দিয়ে আগে বাড়ল। চলার ছন্দে কেবল নিজেকে ছেড়ে দিয়েছে তাইতা, এমন সময় সহসা সোজা হয়ে বসল ও, উইন্ডস্মোকের ঘাড়ের দিকে তাকাল। একটা বিরাট গাঢ় পোকা ওর কেশরের বেশ কাছে চকচকে চামড়ার উপর এসে পড়েছে। ডান হাত কাপের মতো করে পোকাটার তীক্ষ্ণ কালো হুল বের করে মেয়রের চামড়ার নিচে রক্তবাহী শিরায় ঢোকানোর অপেক্ষা করতে লাগল ও। ফোঁটানো হুল এঁটে বসল, তাতে করে খাবলা মেরে ওটাকে হাতের মুঠোয় পুরতে পারল ও। পালানোর প্রয়াসে তীক্ষ্ণ শব্দে গুনগুন করতে লাগল ওটা। কিন্তু মুঠি শক্ত করে এঁটে ওটার শরীর মাথা থেঁতলে দিল ও। তারপর দু আঙুলের ডগায় তুলে ফেনকে দেখাল। এটাই সেই মাছি উপজাতীয়রা যাকে তসেতসি বলে। এটার মতো আরও আসবে, ভবিষ্যদ্বাণী করল ও। ওর কথা শেষ হতে না হতে আরেকটা মাছি এসে বসল ওর কাঁধে, কানের পেছনে নরম মাংসে হুল ফোঁটাল। চোখ কুঁচকে থাপ্পড় কষাল ও। জোর আঘাত লাগাতে পারলেও বলতে গেলে অক্ষত অবস্থায় সটকে পড়ল ওটা।
