কর্নেল তিনাত তোমাকে এখানে রেখে গেল কেন?
আমাকে শস্য রোপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ওর জন্যে ঘোড়া তৈরি রাখতে বলা হয়েছে, আর পেছনের এই ঘাঁটি পাহারা দিতে বলা হয়েছে যাতে দক্ষিণের বুনো এলাকা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হলে এখানে আশ্রয় নিতে পারেন। তিনি।
সে চলে যাবার পর তার আর কোনও খবর পেয়েছ?
কয়েক মাস পরে বেঁচে যাওয়া সবগুলো ঘোড়াসহ তিনজন লোককে ফেরত পাঠিয়েছিলেন তিনি। মনে হচ্ছে দক্ষিণের এমন কোথাও গেছেন যেখানে মাছির খুব অত্যাচার, ঘোড়ার পক্ষে ওদের কামড় মারাত্মক। প্রায় সব ঘোড়াই হারিয়েছেন। তিনি। ওরা তিন জন পৌঁছানোর পর আর কোনও খবর পাইনি। বুনো দেশের পেটে হারিয়ে গেছেন ওরা। অনেক বছর আগের কথা এটা। এতগুলো বছরে কেবল আপনারাই একমাত্র সভ্য জগতের মানুষ যাদের সাথে আমাদের দেখা হলো। বিষণ্ণ শোনাল তার কণ্ঠস্বর।
এই জায়গা ছেড়ে লোকজন নিয়ে মিশরে ফেরার কথা ভাবোনি? লোকটার সাহস মাপতে জিজ্ঞেস করল তাইতা।
কথাটা ভেবেছি, সায় দিল রাবাত। কিন্তু এই জায়গাটা ধরে রাখার নির্দেশ ছিল আমার উপর, একটু দ্বিধা করে আবার খেই ধরল, তাছাড়া, মানুষখেকো চিমা ও বিশাল জলাভূমি আমাদের আর মিশরের মাঝে বাধা হয়ে আছে। সম্ভবত এটাই তোমার এই অবস্থান আঁকড়ে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ, ভাবল তাইতা। কথা বলতে বলতে পাসের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ওরা, সামনে বিছিয়ে আছে বিস্তৃত মালভূমি। নিচের সমতলের চেয়ে ঢের প্রীতিকর এটা।
ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়ে চরে বেড়াচ্ছ গরুর পাল, ওদের ওপাশে দেখার মতো সামরিক দুর্গের মাটির দেয়াল দেখে অবাক হলো তাইতা। এই প্রত্যন্ত বুনো এলাকায় কেমন যেন অদ্ভুত ঠেকল ওটাকে। দুবছরেরও বেশি আগে কেবুইয়ের দুর্গ ছেড়ে আসার পর এই প্রথম সভ্যতার কোনও চিহ্ন চোখে পড়ল। সাম্রাজ্যের নিখোঁজ চৌকি এটা, যার কথা মিশরের কারও জানা নেই।
এই জায়গার নাম কী? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
কর্নেল তিনাত একে আদারি দুর্গ বলতেন।
চরে বেড়ানো গরুগুলোর ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলল ওরা: লম্বা, ছিপছিপে পশু, বিরাট কুঁজঅলা কাঁধ আর ভারি শিংয়ের বিরাট বিস্তার। প্রতিটি পশুর চামড়ার ভিন্ন ভিন্ন রঙ ও নকশা রয়েছে: দুটো পশু এক রকম নয়। লাল বা শাদা, কালো বা হলুদ, বিপরীত রঙের ফুটকি ও দাগ।
ওই গরুর পাল পেলে কোথায়? ওগুলোর মতো আর চোখে পড়েনি।
স্থানীয় উপজাতীদের সাথে বদলাবদলি করেছি। ওরা এদের যেৰু ডাকে। ওই পাল থেকে মাংস আর দুধ পাই আমরা। ওগুলো না থাকলে আরও বেশি কষ্ট পোহাতে হতো আমাদের।
ভুরু কোঁচকাল মেরেন, রাবাতের প্রাণশক্তি ঘাটতির জন্যে ওকে ভর্ৎসনা করতে মুখ খুলল, কিন্তু ওর ইচ্ছার কথা বুঝে চট করে মাথা নেড়ে নিষেধ করল তাইতা। এই লোকের গুরুত্ব সম্পর্কে মেরেন ও ফেনের সাথে মোটামুটি একমত হলেও ওকে খামোকা অপমান করা ওদের পক্ষে কাজে আসবে না। বলতে গেলে নিশ্চিতভাবেই পরে এর সাহায্য লাগবে ওদের। দুর্গের চারপাশের জমিনে ধুরা, তরমুজ ও তাইতার অচেনা সজির চাষ করা হয়েছে। ওকে ওগুলোর বিচিত্র স্থানীয় নাম জানাল রাবাত, একটা বড় চকচকে কালো ফল ছিঁড়তে স্যাডল থেকে নেমে পড়ল। তাইতার হাতে দিল ওটা। স্টুর মতো রান্না করলে বেশ স্বাদু আর পুষ্টিকর হয়।
দুর্গে পৌঁছার পর ঘাঁটির নারী ও শিশুরা ওদের স্বাগত জানাতে দরজা গলে বের হয়ে এলো। ওদের হাতে ছানা কাটা দুধ ও ধুরা পিঠাভর্তি থালা। সবমিলিয়ে তিরিশিজনেরও কম। দেখতে কাহিল, বিষণ্ণ চেহারা ওদের, যদিও যথেষ্ট বন্ধুসুলভ। দুর্গের ভেতরে থাকার ব্যবস্থা সীমিত। তাইতা ও ফেনকে একটা জানালা বিহীন কুঠরী দিল মহিলারা। মেঝেটা মাটি-লেপা, কর্কশ দেয়ালের উপর দিয়ে সামরিক কায়দায় কুচকাওয়াজ করে চলছে পিঁপড়ের সরি, দেয়ালের ফোকরে ফোকরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে চকচকে কালো তেলাপোকার দল। নোংরা অপরিচ্ছন্ন দেহ ও আগের বাসিন্দাদের মলত্যাগের পাত্রের গন্ধ মিশে আছে চারদিকে। ক্ষমা চাওয়ার সুরে ব্যাখ্যা করল রাবাত, মেরেন ও অন্যান্য অফিসারসহ বাকিদের কমান্ড ফাড়ির সৈনিকদের সাথে থাকতে হবে। কৃতজ্ঞতা ও বিষাদের অভিব্যক্তি নিয়ে এই আতিথেয়তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল তাইতা।
দুর্গের আধা লীগ পেছনে একটা প্রবহমান জলধারার পাশে ছায়াময় গাছপালার মাঝে আরামদায়ক জায়গা বাছাই করল মেরেন ও তাই। ওদের দুর্গে রাখতে হচ্ছে না বলে স্পষ্ট স্বস্তি লাভকারী রাবাত মেরেনের বাজপাখির সীলমোহরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে টাটকা দুধ, ধুরা আর নিয়মিত বিরতিতে একটা করে জবাই করা আঁড় যোগান দিল।
আশা করি এখানে বেশি দিন থাকতে হবে না আমাদের, দ্বিতীয় দিন তাইতার উদ্দেশে মন্তব্য করল হিলতো। এই লোকগুলো এত মনমরা যে আমাদের লোকজনের মনোবল ভেঙে পড়বে। ওদের মনোবল এখন চাঙা, ওভাবেই থাকুক, চাইছি আমি। তাছাড়া, এখানকার বেশির ভাগ মেয়েই বিবাহিতা, কিন্তু আমাদের ছেলেরা অনেক দিন হয় নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত। অচিরেই ওদের সাথে মজা করতে চাইবে ওরা। তাতে ঝামেলা বেধে যাবে।
তোমাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, সৎ হিলতো, ব্যবস্থা করা মাত্রই রওয়ানা হবো আমরা। পরের কটা দিন বিষণ্ণ রাবাতের সাথে নিবিড় আলোচনায় সময় কাটাল তাইতা ও মেরেন।
