তারপর সামনে কুয়াশাচ্ছন্ন দিগন্তে একটা পাহাড়ের ঢাল দেখা দিল। পরের কয়েক দিনে চোখের সামনে মাথা খাড়া রইল ওটা, অবশেষে আকাশের অর্ধেকটা যেন ঢেকে ফেলেছে বলে মনে হলো। উঁচু এলাকায় গভীর ফোকর দেখতে পাচ্ছিল ওরা, ওগুলোর ভেতর দিয়ে নীল বয়ে গেছে। সোজা ওটার দিকেই এগিয়ে গেল ওরা, জানে পাহাড়ের ভেতর সহজ পথ হবে ওটাই। আরও কাছে আসার পর নিবিড় গাছে ছাওয়া ঢালের প্রতিটি বৈশিষ্ট্য আর ওগুলোর ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া হাতির রাস্তা দেখতে পেল ওরা। অবশেষে আর ধৈর্য ধরতে পারল না মেরেন। ব্যাগেজ ট্রেইন থেকে ছোট একটা দল নিয়ে রেকি করতে এগিয়ে গেল। স্বাভাবিকভাবেই ওদের সাথে গেল ফেন। তাইতার পাশে চলছে ও। নদীর গোর্জে ঢুকল ওরা, এবড়োখেবড়ো হাতি সড়ক ধরে ঢালের চূড়ার দিকে উঠতে শুরু করল। কেবল অর্ধেক পথ উঠেছে, এমন সময় দৌড়ে সামনে চলে এলো নাকোন্তো। জমিন পরখ করতে এক পা ভেঙে বসে পড়ল।
কী ব্যাপার? চিৎকার করে জানতে চাইল তাইতা। জবাব না পেয়ে সামনে এগিয়ে গেল ও, শিলুক কী আবিষ্কার করেছে দেখতে উইন্ডস্মোকের পিঠ থেকে সামনে ঝুঁকে পড়ল।
ঘোড়ার পায়ের ছাপ, এক চিলতে নরম মাটির দিকে ইঙ্গিত করে বলল নাকোন্তো। একদম টাটকা। মাত্র এক দিনের পুরোনো।
পাহাড়ী যেব্রা? জানতে চাইল তাইতা।
প্রবল বেগে মাথা নাড়ল নাকোন্তো।
সওয়ারিসহ ঘোড়া, মেরেনের জন্যে তরজমা করে দিল ফেন।
সতর্ক হয়ে উঠল সে। অচেনা ঘোড়সওয়ার। কারা হতে পারে, সভ্য জগৎ থেকে এত দূরে? ওরা বৈরী হতে পারে। ওদের পরিচয় না জানা পর্যন্ত আর উপরে ওঠা ঠিক হবে না। যেপথে এসেছিল পেছন ফিরে সেদিকে তাকাল ওরা। নিচের সমতলে কলামের বাকি অংশের কারণে ওড়া হলদে ধূলির মেঘ দেখতে পাচ্ছে। এখনও তিন বা তারচেয়ে বেশি লীগ দূরে রয়েছে ওরা। অন্যদের জন্যে অপেক্ষা করতে হবে আমাদের, তারপর সদলে আগে বাড়া যাবে। তাইতা জবাব দেওয়ার আগেই মাথার উপর থেকে তীক্ষ্ণ উঁচু কণ্ঠের হাঁক শোনা গেল, পাহাড়ের গায়ে প্রতিধ্বনি তুলল সেই শব্দ। চমকে দিল সবাইকে।
ধরা পড়ে গেছি! কিন্তু সেথের দুর্গন্ধময় নিঃশ্বাসের কসম, ওরা যেই হোক, মিশরিয় ভাষায় কথা বলছে, বলে উঠল মেরেন। পাসের দিকে ফিরে দুই হাত এক করে চোঙের মতো বানিয়ে মুখের কাছে ধরে পাল্টা হাঁক ছাড়ল সে। তোমরা কারা?
স্বর্গীয় ফারাও নেফার সেতির সৈনিক!
এগিয়ে এসে পরিচয় দাও, হাঁকল মেরেন।
ওদের সাথে মিলিত হতে খটাখট আওয়াজ তুলে তিনজন অচেনা অশ্বারোহীকে নেমে আসতে দেখে স্বস্তির সাথে হাসল ওরা। এমনকি দূর থেকেও একজনকে মামোসের প্রাসাদের নীল পতাকা বইতে দেখল মেরেন। আরও কাছে আসার পর ওদের পরিষ্কার মিশরিয় বৈশিষ্ট্য দেখতে পেল ওরা। ওদের সাথে মিলিত হতে আগে বাড়ল মেরেন। দুই দল এক সাথে হলে স্যাডল থেকে নেমে খুশির সাথে আলিঙ্গন করল ওরা।
আমি ক্যাপ্টেন রাবাত, পরিচয় দিল নেতা, কর্নেল আহ-আখতোনের বাহিনীর অফিসার, ফারাও নেফার সেতির সেবায় নিয়োজিত।
আমি কর্নেল মেরেন ক্যাম্বিসেস, একই স্বর্গীয় ফারাওর বিশেষ দায়িত্বে আছি। বুকের উপর একটা হাত মুঠি করে রেখে স্যালুট ঠুকে ওর উচ্চ পদমর্যাদার স্বীকৃতি দিল রাবাত। মেরেন বলে চলল, আর ইনি হচ্ছেন ম্যাগাস গালালার তাইতা। রাবাতের চেহারায় সত্যিকারের সমীহের ছাপ পড়ল, আবার স্যালুট করল সে। ওর আভা থেকে তাইতা লক্ষ করল সীমিত বুদ্ধির লোক রাবাত, তবে কোনও রকম খুঁত ছাড়াই সৎ।
আপনার খ্যাতি আপনাকে ছাড়িয়ে গেছে, ম্যাগাস। দয়া করে আপনাদের আমাদের শিবিরে নিয়ে যাবার অনুমতি দিন, ওখানে আমাদের সম্মানিত অতিথি হবেন আপনারা।
ছোট মেয়ে বলে ফেনকে উপেক্ষা করে গেছে রাবাত, কিন্তু এই উন্নাসিকতার ব্যাপারে সজাগ ছিল ও। রাবাতকে আমার পছন্দ হয়নি, শিলুক ভাষায় তাইতাকে বলল ও।লোকটা বেয়াড়া।
হাসল তাইতা। নিজের বিশেষ অবস্থানে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। এদিক দিয়ে ওকে লস্ত্রিসের কথা মনে করিয়ে দেয় সে; যখন মিশরের সার্বভৌম রানি ছিল সে। ও আসলে কঠিন সৈনিক ছাড়া আর কিছু না, ওকে সান্ত্বনা দিল ও। তোমার বিবেচনার পাত্র। এতে খুশিতে ওর চেহারা সহজ হয়ে এলো।
আপনার নির্দেশ কী, ম্যাগাস? জানতে চাইল রাবাত।
এক বিরাট রসদের কাফেলা নিয়ে এগিয়ে আসছে আমাদের দলের বাকি অংশ, সমতলের ধূলি মেঘের দিকে ইঙ্গিত করল তাইতা। তোমার কোনও লোককে পাঠাও ওদের কাছে। সাথে সাথে একজন লোক পাঠিয়ে দিল রাবাত। তারপর ওদের পথ দেখিয়ে খাড়া, পাথুরে পথ ধরে পাসের চূড়ার দিকে নিয়ে চলল।
তোমার কমান্ডার কর্নেল আহ-আখতোন কোথায়? রাবাতের পাশাপাশি ওঠার সময় জানতে চাইল তাইতা।
নদী ধরে আসার পথে জলভূমির অসুখে মারা গেছেন।
সে তো সাত বছর আগের কথা? জানতে চাইল তাইতা।
নাহ, ম্যাগাস। নয় বছর দুই মাস, ওকে শুধরে দিল রাবাত। আমাদের প্রাণপ্রিয় মিশর থেকে নির্বাসনের কাল।
তাইতা বুঝতে পারল কারনাক ছেড়ে এখানে আসতে প্রয়োজনীয় সময়টুকু হিসাবে ধরতে ভুলে গেছে ও। কর্নেল আহ-আখলতানের জায়গায় এখন কে নেতৃত্ব দিচ্ছে? জানতে চাইল ও।
কর্নেল তিনাত আনকুত।
কে সে?
ফারাওর নির্দেশ মোতাবেক তিনি সেনাবাহিনীকে নদী বরাবর দক্ষিণে নিয়ে যাচ্ছেন। আমাকে এখানে মাত্র বিশজন পুরুষ আর কয়েক জন মেয়ের সাথে রেখে গেছেন তিনি, এদের একেবারে ছোট বাচ্চা রয়েছে যারা অভিযানের সময় জন্ম। নিয়েছে বা যাদের এখন সামনে বাড়ার শক্তি নেই, এত দুর্বল।
