তাইতা ইয়োসের বিকল করে দেওয়া প্রভাব ঝেড়ে না ফেলা পর্যন্ত প্রতিরক্ষা বলয়ের ভেতর একসাথে বসে রইল ওরা। ওকে দেওয়া ফেনের সমর্থনে রীতিমতো বিস্ময় বোধ করছে তাই। ওর ছোট কোমল হাত জোড়া থেকে নিজের বুড়ো গ্রন্থিল হাতে বয়ে চলা শক্তির ধারা অনুভব করতে পারছ ও। ওরা একের বেশি জীবন ভাগাভাগি করেছে, এক সাথে মাৰ্বল ও গ্রানিট পাথরের দেয়ালের ভেতর আত্মার একটা দুর্গ গড়ে তুলেছে।
দ্রুত ঘনিয়ে এলো আঁধার। পুকুরের উপর বাদুরের ঝক ডানা ঝাপ্টে বেড়াতে লাগল, জলের উপর থেকে উঠে আসা পোকামাকড়ের উপর পাক খেয়ে খেয়ে নেমে আসছে। নদীর উল্টো তীরে একটা হায়েনা শোকাকুল আর্তচিৎকার ছাড়ল। ফেনের হাত ধরে রেখেই ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করল তাইতা, তারপর পথ দেখিয়ে যারীবার পথে এগিয়ে গেল।
ওদের স্বাগত জানাল মেরেন। আপনাদের খোঁজে একটা তদন্ত দল পাঠাতে যাচ্ছিলাম, আমোদিত কণ্ঠে বলে উঠল সে।
পরে ক্যাম্পফায়ারের পাশে মেরেন আর ওর কর্মকর্তাদের নিয়ে বসল তাই। ওরাও আমোদিত হয়ে আছে। চৌহদ্দীর দূর প্রান্তের লোকজনেরও হাসিঠাট্টা ও শোরগোলের আওয়াজ পাচ্ছে ও। কয়েকবার ওদের সতর্ক করে শান্ত হতে বলবার কথা ভাবল তাইতা, কিন্তু শেষে ওদের মতোই থাকতে দিল। ওরাও ইয়োসের তীক্ষ্ণ গানের তালে তাল মেলাচ্ছে, তবে এমনিতেই যেখানে যেতে হবে সেখানে খুশি মনেই যেতে দেব ওদের। যতক্ষণ সামলে রাখতে পারছে, ওদের আবার পথে। ফিরিয়ে আনার মতো যথেষ্ট সময় নিয়ে এগোবে।
৪. দক্ষিণের আরও গভীরে
প্রতিদিন দক্ষিণের আরও গভীরে যাচ্ছে ওরা, মেরেন ও তার বাহিনীর প্রতিজ্ঞা একবারের জন্যে টলেনি। এক দিন সন্ধ্যায় যারীবা বানানোর সময় মেরেনকে একপাশে এনে তাইতা জিজ্ঞেস করল, তোমার লোকদের মেজাজ মর্জির কী অর্থ করছ তুমি? মনে হচ্ছে সহ্যের শেষ সীমায় চলে এসেছে ওরা। আসৌন ও ওদের দেশে ফিরতে উত্তরে ঘুরে যাবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে আছে। আমাদের হয়তো শিগগিরই একটা বিদ্রোহের মোকবিলা করতে হতে পারে।
ওরা আমার লোক, ওদের ভালো করেই চেনা আছে আমার। মনে হচ্ছে আপনি ওদের চিনতে পারেননি, ম্যাগাস। ওদের মাথায় বেপরোয়া একগাছি চুল বা ফুসফুসে একটা নিঃশ্বাসও নেই। আমার মতোই কাজের জন্যে ক্ষেপে আছে।
আমাকে ক্ষমা করবে, মেরেন। তোমাকে সন্দেহ করতে পারি আমি? বিড়বিড় করে বলল তাইতা, কিন্তু মেরেনের কণ্ঠে ইয়োসের কণ্ঠের প্রতিধনি বের হয়ে আসতে শুনেছে ও। সবার উপরে আমাকে গম্ভীর চেহারা আর তিরীক্ষি মেজাজ মোকাবিলা করতে হচ্ছে না তাতেই আমি খুশি। এইদিক দিয়ে আমার ঝামেলা কমিয়ে দিয়েছে ইয়োস, আপন মনে বলল তাইতা।
এই সময় শিবির থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ছুটে এলো ফেন, চিৎকার করছে, ম্যাগাস! তাইতা! জলদি এসো! লি-তো-লিতির বাচ্চাটা পেট ফেটে বের হয়ে আসছে, ওকে আর ভেতরে ঢোকাতে পারছি না!
সেক্ষেত্রে আমি আসছি বেচারাকে তোমার কবল থেকে বাঁচাতে। দুরদার করে উঠে দাঁড়াল তাইতা, ফেনের সাথে দ্রুত শিবিরের দিকে পা বাড়াল। শিলুক মেয়েটার পাশে বসে সান্ত্বনা দেওয়ার সময় মসৃণভাবে ঘটল প্রসবের ব্যাপারটা। লি-তো-লিতি চিৎকার করে উঠলেই চমকে উঠছে সে। প্রতিটি খিঁচুনির মাঝখানে শুয়ে থাকা মেয়েটা হাঁপাতে হাঁপাতে ঘামে ভিজে যাচ্ছে, ফেন বলছে, দেখে তো এখন আর অত মজার খেলা মনে হচ্ছে না। আমাদের এ নিয়ে মাথা ঘামানোর দরকার আছে বলে মনে হয় না।
মাঝরাতের আগে একটা বাদামী রঙ ছেলে জন্ম দিল লি-তো-লিতি, মাথায় এক ঝাক কোঁকড়া কালো চুল। তাইতার কাছে এই নতুন শিশুর আগমন অনেকটা এই তিক্ত পথে অন্য তরুণ প্রাণের ক্ষতিপূরণের মতো লাগল। বাবার সাথে উল্লাস করল ওরা।
এটা ভালো লক্ষণ, পরস্পরকে বলতে লাগল লোকেরা। দেবতারা আমাদের দিকে চেয়ে হেসেছেন। এখন থেকে আমাদের অভিযান ভালোর দিকে যাবে।
নাকোন্তোর পরামর্শ চাইল তাইতা। তোমাদের রেওয়াজ কী? আবার রওয়ানা দেওয়ার আগে মেয়েটিকে কয়দিন বিশ্রাম নিতে হবে?
আমরা গরুর পাল নতুন চারণ ভূমিতে নেওয়ার সময় আমার প্রথম বউয়ের বাচ্চা হয়েছিল। পানি ভাঙে যখন তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। রাস্তার পাশে কাজটা শেষ করার জন্যে ওকে মায়ের সাথে রেখে যাই আমি। রাত নামার আগেই আবার আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল ওরা, ভালো হয়েছিল, কারণ আশপাশে সিংহ ঘুরঘুর করছিল।
তোমাদের মেয়েরা বেশ কঠিন, মন্তব্য করল তাইতা।
কিছুটা বিস্মিত দেখাল নাকোন্তোকে।ওরা শিলুক, বলল সে।
তাতেই ব্যাখ্যা মেলে, সায় দিল তাইতা।
পরদিন সকালে বাচ্চাকে কোমরে ঝুলিয়ে নিল লি-তো-লিতি, ফলে ঘোড়া থেকে না নেমেই দুধ খেতে পারবে বাচ্চাটা। কলাম রওয়ানা দেওয়ার সময় স্বামীর ঘোড়ার পেছন উঠে বসল সে।
পর্যাপ্ত জলপুষ্ট ঘেসো এলাকা দিয়ে অব্যাহত রইল ওদের যাত্রা। পশুদের পা ও খুরের নিচে কোমল ঠেকছে বালিময় জমিন। নিজস্ব মলম দিয়ে টুকটাক ক্ষত বা রোগের চিকিৎসা করছে তাইতা। বেশ চমৎকার আছে ওরা। বুনো অ্যান্টিলোপ ও মোষের অন্তহীন পাল রয়েছে চারপাশে। ফলে মাংসের ঘাটতি হচ্ছে না। এমন মসৃণ নিয়মে দিনগুলো পেরিয়ে যেতে লাগল যে ওরা সবাই তাতে মিশে গেল যেন। একের পর লীগ পেছনে পড়ে যাচ্ছে, আর সামনে খুলে যাচ্ছে বিশাল দূরত্ব।
