ব্যাপারটা আড়াল করতে পারলেও ফেন মেরেনের বানানো অলঙ্কার পরার পর এক ধরনের ঈর্ষার খোঁচা বোধ করল তাইতা। এই বয়সে? নিজের অবস্থার কথা ভেবে হাসল ও। যেন প্রেমের জন্যে ব্যাকুল রাজহাঁস। তবে ফেনকে নিয়ে নিজের কাজের দিকে পূর্ণ মনোযোগ ও সৃজনশীল মেধা খাটাল ও। সোনার টুকরোটা ঝোলাতে লত্তির তলোয়ারের হাতলের রূপা থেকে একটা সরু চেইন ও একটা সেটিং বানিয়ে দিল ও। কাজটা শেষ হলে ওটা যে পরবে তাকে রক্ষার জন্যে প্রতিরক্ষার জাদু পড়ে ওর গলায় ঝুলিয়ে দিল। নদীর পুকুরে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকানোর পর চোখজোড়া জলে ভরে উঠল ওর। অনেক সুন্দর, ফিসফিস করে বলল ও। গায়ে বেশ উষ্ণ ঠেকছে, যেন জীবন্ত কিছু। ওর অনুভূত উষ্ণতা আসলে ওটাকে তাইতার দেওয়া ক্ষমতার বিচ্ছুরণ মাত্র। ফেনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসে পরিণত হলো ওটা, ও ওটার নাম রাখল তাইতার তাবিজ।
যতই দক্ষিণে এগিয়ে যাচ্ছে, অভিযাত্রী দলের মেজাজ মর্জি ততই চনমনে ও হালকা হচ্ছে। হঠাৎ করেই তাইতার মনে এর ভেতর একটা কিছু অস্বাভাবিকতা রয়েছে বলে সন্দেহ জাগল। এটা ঠিক ওরা বিশাল জলাভূমিতে হারিয়ে যাওয়ার বা চিমাদের দেশে থাকার সময়ের মতো বিপজ্জনক নেই পথটা, কিন্তু দেশ থেকে অনেক দূরে এসে পড়েছে ওরা, রাস্তার শেষ নেই, আর অবস্থাও কষ্টকর। ওদের আশাবাদী আর হালকা মেজাজে থাকার কোনও কারণ নেই।
দিনের অপসৃয়মান আলোয় ফেনকে পাশে নিয়ে একটা নদীর পুকুরের পাশে বসেছিল ও। মাটির ফলকে তাইতার আঁকা তেনমাসের প্রাথমিক প্রতাঁকের একটা এয়ী জরিপ করছিল ফেন। ওগুলোর প্রত্যেকটা শক্তির একটা শব্দ প্রকাশ ধরে। ওগুলো একসাথে এত সক্রিয় ও সজীব হয়ে ওঠে যে কেবল সতর্কতার সাথে প্রস্তুত করা মনের পক্ষেই গ্রহণ করা সম্ভব হয়। ওর বেশ কাছে বসেছে তাইতা, একত্রিত করার ধাক্কায় কোনও বিপর্যয় দেখা দিলে যাতে রক্ষা করতে পারে ওকে। পুকুরের ওধারে জলের উপর উড়ে বেড়াচ্ছে বিরাট লালচে বাদামী বুকের একটা মাছরাঙা। ঝাঁপ দিল ওটা, কিন্তু ফলকের দিকে ফেনের মনোযোগ এতটাই নিবিষ্ট যে পাখিটার পানির উপরিতল স্পর্শ করার সময় পানি ঝলকে ওঠার শব্দে মাথা তুলে তাকাল না ও। ডানা ঝাপ্টে ফের আকাশে উঠে গেল ওটা, দীর্ঘ কলো ঠোঁটে একটা ছোট রূপালি মাছ আটকা পড়েছে।
নিজের অনুভূতি আরও নিবিড়ভাবে পরখ করার প্রয়াস পেলো তাইতা। নিজের প্রফুল্ল অবস্থার পেছনে একটা কারণই আন্দাজ করতে পারছে: পাশে বসে থাকা বাচ্চটার প্রতি ওর ভালোবাসা এবং ওকে নিয়ে আনন্দ। অন্যদিকে দুজনের পক্ষেই ভীত হওয়ার বেশ ভালো কারণ রয়েছে ওর। ফারাও এবং দেশ বাঁচানোর গোপন দায়িত্ব পেয়েছে ও। পরিষ্কার কোনও পরিকল্পনা ছাড়াই এক শক্তিশালী অশুভ শক্তির মোকাবিলায় এগিয়ে যাচ্ছে। নিঃসঙ্গ এক খরগোশ বেরিয়েছে খুনে চিতাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। সব সম্ভাবনাই ওর বিরুদ্ধে। প্রায় নিশ্চিতভাবে পরিণতি হবে মারাত্মক। তাহলে কেন পরিণতির কথা না ভেবেই এভাবে কাজ করে চলেছে ও?
এবার এমনকি এই সহজ যুক্তি অনুসরণ করতেও কষ্ট হচ্ছে বলে সজাগ হয়ে উঠল ও। যেন ইচ্ছে করেই বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে ওর পথে। এসব ভাবনা ছেড়ে আবার আত্মতুষ্টির ভালো থাকার ভাবনায় ফিরে যাবার জোরাল অনুভূতি হতে লাগল, কোনও রকম সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিকল্পনা ছাড়াই অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার, বাধা এলে সেটা পেরুনোর জন্যে নিজের ক্ষমতার উপর আস্থা রাখতে প্ররোচিত হতে লাগল। মনের বিপজ্জনক ও বেপরোয়া অবস্থা এটা, ভবল ও, তারপর হেসে উঠল, যেন কৌতুক ছিল।
ফেনের মনোযোগে বাধা সৃষ্টি করেছে ও, চোখ তুলে তাকিয়ে ভুরু কোঁচকাল ও। কী ব্যাপার, তাইতা? জিজ্ঞেস করল। তুমি বলেছিলে প্রতীকগুলো যৌক্তিক সহগ মেলানোর চেষ্টা চালানোর সময় মনোযোগ নষ্ট করা বিপজ্জনক।
ওর কথাগুলো ঝট করে মাথা তুলে তাকাতে বাধ্য করল তাইতাকে। বুঝতে পারল, কী বিশ্রী ভুল করেছে ও। ঠিক বলেছ। ক্ষমা করবে। আবার কোলে রাখা মাটির ফলকের দিকে তাকাল ও। সমস্যা নিয়ে ভাববার প্রয়াস পেল তাইতা, কিন্তু আবছা, গুরুত্বহীন রয়ে গেল সেটা। জোরে কামড় দিল ঠোঁটে, রক্তের স্বাদ পেল জিভে। তীব্র ব্যথা ওকে শান্ত করল। প্রয়াসসাধ্যভাবে মনোযোগ একত্র করতে পারল ও।
একটা কিছু মনে করতেই হবে ওকে। নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করলেও সেটা ছায়াই রয়ে গেল। আবার চেষ্টা করল ও। কিন্তু আগেই মিলিয়ে গেল তা। ওর পাশে আবার নড়ে উঠল ফেন। দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর চোখ তুলে তাকিয়ে কাদার ফলকটা একপাশে নামিয়ে রাখল। মনোযোগ দিতে পারছি না। তোমার অস্থিরতা টের পাচ্ছি। একটা কিছু বাধা দিচ্ছে তোমাকে। আন্তরিক সবুজ চোখ মেলে ওর দিকে তাকাল ও, তারপর ফিসফিস করে বলল, এবার বুঝেছি, পুকুরের ডাইনীটা। চট করে গলা থেকে সোনার টুকরোটা খুলে হাতের মুঠিতে নিল ও। দুই হাতে ধরে বাড়িয়ে দিল সামনে। লক্ট্রিসের মাদুলিটা হাতে জড়িয়ে ধরল তাই। এবার দুজনে হাত ধরে প্রতিরক্ষার বৃত্ত তৈরি করল। প্রায় অলক্ষে অচেনা প্রভাবের মিলিয়ে যাওয়া টের পেল ও। ওকে খুঁচিয়ে চলা কথাগুলো এক লাফে ফিরে এলো মনে। দিমিতারের সতর্কবাণী মনে করার চেষ্টা করছিল ও। এরই মধ্যে নিজের অশুভ প্রভাবে আক্রান্ত করে ফেলেছে আপনাকে। জাদু ও প্রলোভনে আপনাকে ভেঙে দিতে শুরু করেছে। আপনার বিচারবুদ্ধি ঘোলা করে দেবে সে। অচিরেই সে আদৌ অশুভ কিনা তাতেই আপনার মনে সন্দেহ জাগবে। আপনার কাছে তাকে বেশ ভালো ঠেকবে, ভদ্র ও জীবিত যেকারও মতোই অভিজাত ও গুণী। অচিরেই মনে হবে আমিই খারাপ যে আপনার মনটাকে তার বিরুদ্ধে বিষাক্ত করে তুলেছে। সেটা যখন ঘটবে, আমাদের সে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে ও; আমি ধ্বংস হয়ে যাব। আপনি স্বাধীনভাবে, স্বেচ্ছায় তার কাছে আত্মসমর্পণ করবেন। আমাদের দুজনের বিরুদ্ধেই জয়ী হবে সে।
