তোমার কাঁধের পক্ষেও, সায় দিল তাইতা।
*
প্রবল অথচ ছোটখাট লড়াইটা যেন আরও চিমা হামলার সম্ভাবনা পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে বলে মনে হলো। পরের দিনগুলোতে ওদের উপস্থিতির আলামত চোখে পড়লেও কোনওটাই সাম্প্রতিক সময়ের ছিল না। এমনকি এইসব ইঙ্গিতগুলোও ক্রমশঃ কম ঘন হয়ে শেষে বন্ধ হয়ে গেল। চিমাদের এলাকা ছেড়ে জনবসতিহীন এলাকায় পা রাখল ওরা। নীল এখনও ক্ষীণতোয়া থাকলেও আশপাশের এলাকায় ভারি বৃষ্টিপাতের চিহ্ন রয়েছে। শিকারের পশুতে গিজগিজ করছে বন আর সাভানাহ। মাঠের ঘাস রসাল, প্রচুর। ততদিনে সৈনিকরা বাড়ির জন্যে মন খারাপ করতে শুরু করবে, মনমরা হয়ে থাকবে বলে ভয় করছিল তাইতা; ওরা প্রফুল্ল রয়ে গেল, ওদের প্রাণশক্তি তুঙ্গে।
ফেন আর শিলুক মেয়েরা মেয়েলি হাসি-ঠাট্টা ও চড়া আমোদে দিয়ে পুরুষদের আনন্দ যোগাচ্ছে। মেয়েদের ভেতর দুজন অন্তসত্তা হয়ে পড়েছে। ওরা কীভাবে এমন একটা সুখময় অবস্থায় এলো সেটা জানতে কৌতূহলী হয়ে উঠল ফেন। জিজ্ঞেস করলেই হাসিতে ভেঙে পড়তে লাগল ওরা। কৌতূহলী হয়ে ব্যাপারটা সম্পর্কে জানতে তাইতার কাছে এলো ফেন। ব্যাখ্যা সংক্ষিপ্ত ও অস্পষ্ট রেখে দিল ও। খানিকক্ষণ ও নিয়ে ভেবে তারপর ফেন বলল, শুনে তো মজার খেলা মনে হচ্ছে। কথাটা মেরেনের কাছে শিখেছে ও।
চেহারা গম্ভীর রাখার প্রয়াস পেল তাইতা, কিন্তু হাসি ঠেকাতে পারল না।
আমিও তাই শুনেছি, সায় দিল ও।
আমি বড় হলে খেলার জন্যে একটা বাচ্চা চাইব, ওকে বলল ফেন।
সন্দেহ নেই, পাবে তুমি।
আমরা দুজনে মিলে সেটা পেতে পারি। সেটা কি দারুণ খেলা হবে না, তাইতা?
নিশ্চয়ই, বেদনার সাথে সায় দিল তাইতা, এটি কোনওদিনই হবার নয়। কিন্তু তার আগে আমাদের হাতে আরও অনেক জরুরি কাজ আছে।
সেই অনেক আগে যখন ও ছিল তরুণ আর লস্ত্রিস বেঁচে ছিল তারপর থেকে নিজেকে এত ভালো অবস্থায় আর কখনও দেখেছে, এমনটা মনে করতে পারে না তাইতা। নিজেকে এখন অনেক ক্ষিপ্র, অনেক কমনীয় মনে হয়। আগের মতো এখন অল্পেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে না। ফেনের সঙ্গের কারণেই এটা হয়েছে বলে ধরে নিয়েছে।
ফেনের শিক্ষা এত দ্রুত এগোচ্ছে যে ওর মন চালু বা এর ক্ষমতার কাছাকাছি রাখতে অন্যান্য উপায় বের করতে বাধ্য হচ্ছে তাই। ওকে একটু ঢিলে হতে দিলেই মন সরে যাচ্ছে। এতদিনে শিলুক আর মিশরিয় ভাষার দুটোই বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেছে ও।
ওকে দক্ষ সাধকে পরিণত হতে ম্যগাইদের ভাষা তেনমাস শিখতেই হবে। অন্য কোনও ভাষা নিগূঢ় এই বিষয়টির সম্পূর্ণ শিক্ষা ধারণ করে না। তবে তেনমাস বেশ জটিল ও বহুমুখী ভাষা, অন্য মানবীয় ভাষার সাথে এর সম্পর্ক এত ক্ষীণ যে কেবল তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা ও মনোযোগের অধিকারীরাই দক্ষতা লাভের আশা করতে পারে।
এটা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ, ফেনের ভেতর থেকে সেরাটা বের এনেছে ও। প্রথমে ওর মনে হয়েছিল বুঝি পলিশ করা কাঁচের দেয়াল বেয়ে উঠতে বলা হচ্ছে ওকে, যেখানে হাত বা পা রাখার মতো জায়গাই নেই। অনেক খেটে খানিকটা উপরে ওঠে ও, তারপর আতঙ্কের চোটে হাত ফসকে পিছলে পড়ে যায়। আবার নিজেকে তুলে আনার চেষ্টা চালায়। প্রতিবার আগের চেয়ে অনেক হিংস্রভাবে। একবারের জন্যেও হতাশ হয়নি ও, এমনকি যখন মনে হচ্ছিল একেবারেই অগ্রগতিই হচ্ছে না, তখনও না। ওকে দায়িত্বের গুরুত্বের মুখোমুখি করে তুলছিল তাইতা, কেবল তাহলেই সামনে এগোতে তৈরি হতে পারবে ও।
এলো সেই মুহূর্ত, কিন্তু রাতে মাদুরের বিছনায় একা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করল তাইতা। তারপর কপালে হাত রেখে ও সম্মোহনী ঘুমে তলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত আস্তে আস্তে কথা বলে চলল। সম্পূর্ণ গ্রাহী হয়ে উঠলে ফেনের মনে তেনমাসের বীজ বপনের কাজ শুরু করতে পারল ও। শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে মিশরিয় ভাষা ব্যবহার না করে বরং সরাসরি তেনমাস ভাষাতেই কথা বলল ওর সাথে। ভাষার বীজ শক্ত অবস্থান পেতে অনেকগুলো নিশি আসরের প্রয়োজন হলো। প্রথমবার দাঁড়ানোর প্রয়াসরত শিশুর মতো অনিশ্চিত কয়েকটা পদক্ষেপ নিল ও, তারপর লুটিয়ে পড়ল। পরের বার আগের চেয়ে অনেক দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের সাথে উঠে দাঁড়াল ও। ওকে বেশি কষ্ট না দেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকলেও যুগপৎ ওকে আগে বাড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে গেল তাইতা। বেশি চাপ দিলে ফেন পিছিয়ে যেতে পারে, ওর চেতনা ভেঙে পড়তে পারে জানা থাকায় বাও বোর্ডে যথেষ্ট আনন্দময় সময় কাটানো বা সহজ কিন্তু চনমনে আলাপে চালানো, কিংবা বিরল গাছ কিংবা অন্যান্য ছোটখাট প্রাণীর খোঁজে বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়ানোর দিকে খেয়াল রাখল ও।
নদীর তলদেশে পছন্দসই নুড়ি পাথরের বিস্তার দেখলেই খচ্চরের পিঠ থেকে সোনা চালার পাত্র নামিয়ে একসাথে কাজে নেমে পড়ছে ওরা। তুলে আনা ঘোলা জল পাক খাওয়ায় তাইতা, ফেন ওর চোখ ও সাবলীল হাতে সুন্দর আধা-মূল্যবান পাথর বেছে নেয়। অনেক পাথরই পানির টানে অসাধরাণ সুন্দর আকার পেয়েছে। একটা ব্যাগ ভরে যাওয়ার পর মেরেনকে দেখাল ফেন। ওকে মানানসই অ্যাংকলেটসহ একটা বাজুবন্ধ বানিয়ে দিল সে। একদিন একটা শুকনো জলপ্রপাতের নিচে পাত্র থেকে বুড়ো আঙুলের প্রথম গিঁটের সমান আকৃতির একটা সোনার টুকরো খুঁজে পেল ও। রোদ লেগে ঝিকিয়ে উঠল ওটা, ওর চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল। আমাকে একটা অলঙ্কার বানিয়ে দাও, তাইতা, দাবি জানাল ও।
