আহত বাম কাঁধ শক্ত করে ধরে চিৎকার করে উঠল মেরেন। সবকটাকে মেরে ফেল, আবার! এবার নিশ্চিত করো ব্যাপারটা।
বন্ধুরা কসাইয়ের তাকে ঝুলছিল, কথাটা মনে করে সানন্দে কাজে লেগে গেল সৈনিকরা। কোপ মরছে, ঘাই দিচ্ছে। কিতার কেঁপে কয়েক জন চিমাকে গাঢাকা দিয়ে থাকতে দেখল ওরা। টেনে হিঁচড়ে বের করে সবকটাকে জবাই করল, তখন শুয়োরের মতো চিৎকার করছিল ওরা।
ওদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হবার পরেই কেবল লোকজনকে লাশের ভেতর আবার কাজে লাগাতে তীর সংগ্রহ করার অনুমতি দিল মেরেন। একমাত্র ওই আহত হয়েছে। কোমর পর্যন্ত নগ্ন হয়ে গাছের গায়ে হেলান দিয়ে বসল ও, ওর কাঁধ পরীক্ষা করল তাইতা। রক্ত ঝরছে না। কিন্তু গাঢ় একটা দাগ ছড়িয়ে পড়ছে। সন্তোষের সাথে ঘোঁৎ করে শব্দ করল তাইতা। কোনও হাড়গোড় ভাঙেনি। ছয় কি সাত দিনের মধ্যেই তোমার মতো বুড়ো কুকুর একেবারে তরতজা হয়ে উঠবে। একটা মলম দিয়ে কাঁধটা পরিষ্কার করে তারপর আরামদায়কভাবে বাহু ঝোলাত লিনেনের একটা স্লিং বেঁধে দিল। এবার মেরেনের পাশে বসল ওঃ ক্যাপ্টেনরা মৃত চিমাদের লাশ থেকে সংগ্রহ করা মালপত্র পরীক্ষার জন্যে এনে ওদের সামনে নামিয়ে রাখতে লাগল। খোদাই করা কাঠের উকুন বাছার চিরুণী, আনাড়ী হাতে বানানো হাতির দাঁতের ট্রিনকেট, জল-কধু, আর পাতায় মোড়ানো গাছের বাকলের দড়ি দিয়ে বাঁধা ঝলসানো মাংসের কিছু প্যাকেট, ওগুলোর কিছু এখনও হাড়ের সাথে লেগে আছে। পরীক্ষা করল তাইতা। মানুষের। প্রায় নিশ্চিতভাবেই আমাদের কমরেডদের অবশিষ্টাংশ। সম্মানের সাথে কবর দাও।
এরপর চিমা অস্ত্রের দিকে মনোযোগ দিল ওরা। বেশিরভাগই পাথর বা আগ্নেয় শিলার মাথাঅলা মুগুর আর বর্শা। ছুরির ফলাগুলো পাথরের কাটা অংশ, শুকনো চামড়ার ফিতেয় মোড়ানো হাতল। আবর্জনা! নিয়ে যাবার মতো নয়, বলল মেরেন।
মাথা দুলিয়ে সায় দিল তাইতা। সব আগুনে ফেলে দাও।
অবশেষে নিশ্চিতভাবে চিমাদের তৈরি নয় এমন সব অস্ত্র ও অলঙ্কার পরখ করল ওরা। কয়েকটা স্পষ্টতই অ্যাম্বুশে নিহত চার শিকারীর কাছ থেকে নেওয়া-ব্রোঞ্জের অস্ত্র ও বাঁকানো তীর, চামড়ার হেলমেট ও প্যাড লাগানো জারকিন, লিনেন টিউনিক ও টাকোয়েযের তাবিজ আর নীলকান্তমণি পাথর। তবে কৌতূহল জাগানোর মতো অন্য জিনিসও ছিল: জারজীর্ণ পুরোনো চামড়ার হেলমেট, অনেক দশক ধরেই এই জিনিস মিশরিয়রা ব্যবহার করে না। তারপর রয়েছে সেই তলোয়ারটা যেটার কারণে আরেকটু হলেই মরতে বসেছিল মেরেন। ওটার ফলা ক্ষয়ে গেছে, কিনারা কর্কশ গ্রানিট বা অন্য কোনও পাথরে সাথে ঘঁষে শানাতে গিয়ে প্রায় ধ্বংস হওয়ার যোগাড়। তবে, হাতলটা বেশ ভালোভাবে কাজের রয়েছে, রূপার আস্তরণ দেওয়া। খালি সিটিং রয়েছে যেগুলো থেকে মূল্যবান পাথর খুঁড়ে বের করে নেওয়া হয়েছে বা পড়ে গেছে। খোদাই করা হিরিওগ্রাফিক প্রায় মুছে গেছে। আলোর মুখে ধরে এপাশ ওপাশ নাচাল ওটা তাইতা, কিন্তু পড়তে পারল না। ফেনকে ডাকল ও। তোমার তীক্ষ্ণ তরুণ চোখ কাজে লাগাও।
ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে খোদাই কর্মে নজর বোলাল ফেন, থেমে থেমে পড়ল। আমি লত্তি, লত্তির ছেলে। লাল পথের দশ হাজার সঙ্গীর সেরা, স্বর্গীয় ফারাও মামোজের সেনাপতি ও কমান্ডার। তিনি চিরজীবী হোন!
লত্তি! জোরে বলে উঠল তাইতা। খুব ভালো করে চিনতাম ওকে। ইথিওপিয়া থেকে নীল মাতার উৎস খুঁজে বের করার জন্যে রানি লস্ত্রিসের পাঠানো অভিযানে লর্ড আকেরের অধীনে সহঅধিনায়ক ছিল। চমৎকার সৈনিক। মনে হচ্ছে, সে আর তার লোকজন অন্তত এ-পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিল।
তবে কি লর্ড আকের ও বাকি সবাই এখানেই মারা গেছে, নাকি চিমারা খেয়ে নিয়েছে? ভাবনা প্রকাশ করল মেরেন।
না। হাথরের ছয় আঙুলঅলা ক্ষুদে যাজক টিপটিপের কথামতো আকের আগ্নেয়গিরি ও বৃহৎ হ্রদ দেখেছিল। তাছাড়া রানি লসি এক হাজার লোক দিয়েছিল তার অধীনে। ওদের সবাইকে চিমারা খেয়ে ফেলবে বলে আমার মনে হয় না। বলল তাইতা। আমার বিশ্বাস, আমাদের লোকদের মতো লত্তির অধীনেও একটা ছোট ডিটাচমেন্টকে বাগে পেয়েছিল ওরা। কিন্তু চিমারা কি গোটা একটা মিশরিয় বাহিনীকে ধ্বংস করে দিয়েছে? মনে হয় না। আলোচনা অব্যাহত থাকার সময় আড়চোখে ফেনের অভিব্যক্তি জরিপ করছিল তাইতা। যখনই রানি লস্ত্রিসের নাম উচ্চারণ করছিল, ভুরু কুঁচকে উঠছিল ওর। যেন অনেক দূরের কোনও স্মৃতি মনে করার চেষ্টা করছে, পলাতক স্মৃতি। ওর মনের গভীরে কোথাও তুলে রাখা। কোনও একদিন সম্পূর্ণই ফিরে আসবে ওর কাছে, ওর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, ভাবল তাইতা, কিন্তু মেরেনের উদ্দেশে জোরে বলল, লত্তির নিয়তি সম্পর্কে আসল সত্যি হয়তো কোনওদিনই জানা হবে না আমাদের, তবে ওর তলোয়ারটা আমার কাছে লর্ড আকেরের অনেক আগে চলে যাওয়া দক্ষিণের পথে আমরা যে ঠিকভাবে অগ্রসর হচ্ছি তার প্রমাণ তুলে ধরছে। ইতিমধ্যে অনেক সময় নষ্ট করেছি এখানে। উঠে দাঁড়াল ও। কত দ্রুত রওয়ানা দেওয়া যাবে?
সবাই তৈরি, বলল মেরেন। পড়াশোনা থেকে সবে রেহাই পাওয়া ছেলেদের মতোই উৎফুল্ল ওরা, ছায়ায় বসে শিলুক মেয়েদের সাথে ঠাট্টা করছে, ওদের খাবার পরিবেশন করছে ওরা, ধুরা বিয়রের জার তুলে দিচ্ছে হাতে। ওরা কত উদগ্রীব হয়ে আছে দেখুন। উচ্চ রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী বেশ্যার সাথে রাত কাটানোর চাইতে মনোবল চাঙা করতে দারুণ একটা লড়াই অনেক বেশি উপকারী। জোরে হেসে উঠতে গিয়েও থেমে হাত তুলে আহত কাঁধ ডলতে শুরু করল সে। লোকজন তৈরি, কিন্তু দিন প্রায় শেষের পথে। অল্প একটু বিশ্রাম ঘোড়াগুলোর পক্ষে উপকারী হবে।
