চিমাদের মূল দলের সামনের সারিটা হাতি সড়কের বাঁক ঘুরে দুলকি চালে এগিয়ে এলো। কাছাকাছি আসার পর তীক্ষ্ণ চোখে জরিপ করল মেরেন: বাঁকা পা, গাট্টাগোট্টা লোকগুলোর পরনে কেবল ট্যান করা পশুর ছালের নেংটি ছাড়া কিছু নেই। এমনকি গোটা দলটা দৃষ্টিসীমায় আসার পরেও মাথা গোনা কঠিন হয়ে দাঁড়াল, নিবিড় ফর্মেশনে দ্রুত ছুটছে ওরা।
অন্তত একশো জন তো হবেই, বেশিও হতে পারে। ভালোই খেলা জমবে এবার। নিশ্চিত করে বলতে পারি, প্রত্যাশার সাথে বলল মেরেন। মুগুর আর পাথরের বর্শার মতো নানা ধরনের অস্ত্র রয়েছে চিমাদের কাছে। ওদের কাঁধে ঝোলানো ধনুকগুলো ছোট, আদিম। মেরেন আন্দাজ করল তিরিশ কদমের বেশি দূর থেকে মানুষ মারার মতো টান থাকবে না ওগুলোর। কাঁধে মিশরিয় তলোয়ার ঝুলিয়ে চলতে থাকা সর্দারের দিকে নজর গেল ওর। তার পেছনের লোকটার মাথায় চামড়ার হেলমেট, কিন্তু বেশ আদিম নকশার। ব্যাপারটা বিভ্রান্তিকর, কিন্তু এখন ওসব নিয়ে ভাববার সময় নেই। নিশানা বোঝার জন্যে রাস্তায় বসিয়ে রেখে আসা শাদা পাথরটার কাছে পৌঁছল চিমা ফর্মেশনের সামনের অংশ। এখন গোটা বামদিকের অংশ মিশরিয় তীরন্দাজদের জন্যে উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে।
ডানে বামে তাকাল মেরেন। ওর লোকজনের চোখ ওর ওপর স্থির হয়ে আছে। অকস্মাৎ ডান হাত নামিয়ে আনল ও। নিমেষে সোজা হয়ে গেল তীরন্দাজরা। একসাথে ছিলা টানটান করল। নিশানা স্থির করতে মুহূর্তের বিরতি দিল, তারপরই আকাশের পটভূমিতে অনেক উঁচুতে ছুঁড়ে দিল নিঃশব্দ তীরের মেঘ। প্রথমটা লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার আগেই দ্বিতীয় মেঘটা উড়ে গেল আকাশের দিকে। এত কোমলভাবে নেমে এলো তীরগুলো, চিমারা এমনকি উপরের দিকে তাকালও না। তারপর ঝিলের জলে পড়া বৃষ্টির পানির মতো শব্দে ওদের মাঝে লুটিয়ে পড়তে লাগল। ওদের কপালে কী ঘটছে চিমারা বুঝতে পেরেছে বলে মনে হলো না। একজন তার পাঁজরের হাড়ের মাঝখানে খাড়া হয়ে থাকা তীরের ফলার দিকে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তরপর হাঁটু ভাঁজ হয়ে গেল তার। হুড়মুড় করে জমিনে লুটিয়ে পড়ল সে। আরেকজন গালায় বেঁধা তীর বের করার প্রয়াসে ছোট একটা বৃত্তের আকারে পাক খেয়ে চলেছে। অন্যদের বেশিরভাগই, এমনকি যারা মারণ আঘাত লাভ করেছে, আঘাত পেয়েছে বলে টের পেয়েছ বলে মনে হলো না।
তৃতীয় দফা তীরের বৃষ্টি এসে পড়ার সময়ও যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা আতঙ্কে আর্তচিৎকার ছেড়ে গর্জন করতে করতে দিগ্বিদিক ছুটতে লাগল, যেন ঈগলের আক্রমণের ফলে ছুটছে এক দল গিনি-মুরগী। সোজা ওয়াদির দিকে ছুটে এলো কেউ কেউ, ওদের নিশানা করল তীরন্দাজরা। অল্প দূরত্বে একটা তীরও ফস্কালো না: ভারি শব্দে জীবন্ত দেহের গভীরে গেঁথে গেল। কোনওটা মূল লক্ষ্যবস্তুর ঠিক ধড় ভেদ করে তারপর পেছনের লোকটাকে আহত করতে উড়ে গেল। যারা পাহাড় বেয়ে উঠে পালানোর চেষ্টা করছিল, তারা সোজা কিতার কাঁটাঝোঁপের বেড়ার উপর গিয়ে পড়ল। চলার উপরই থমকে গেল ওরা, আবার তীর বৃষ্টির ভেতর ফিরিয়ে আনল ওদের।
ঘোড়া নিয়ে এসো! চিৎকার করে উঠল মেরেন। ফেন ও অন্য মেয়েরা গলার দড়ি ধরে টেনে নিয়ে এলো ওগুলো। উইন্ডস্মোকের পিঠে উঠে বসল তাইতা, ওদিকে মেরেন ও আরও লোকজন ধনুক পিঠে তুলে নিয়ে ঘোড়ায় চাপল।
সামনে বাড়ো! চিৎকার করে নির্দেশ দিল মেরেন। ওদের কাছে নিয়ে যাও তলোয়ারের ফলা। নালার পাশ বেয়ে সমতলে উঠে গেল অশ্বারোহীরা। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চিমাদের বিশৃঙ্খল দলটার দিকে ধেয়ে গেল। ওদের আসতে দেখে ঢাল বেয়ে পালানোর চেষ্টা করল ওরা। কাঁটা ঝোঁপ আর চকচকে তলোয়ারের ব্রোঞ্জের বৃত্তের মাঝখানে আটকা পড়ে গেছে। হাঁটু ভেঙে পড়ে গেল ওরা, হাত দিয়ে মাথা আড়াল করল। ওদের আঘাত করতে রেকাবে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল ঘোড়সওয়াররা। অন্যরা জালে আটকা মাছের মতো কাঁটাঝোঁপের ভেতর তড়পাচ্ছে। কাঠ চেরাই করার মতো ওদের কচুকাটা করল সৈনিকরা। যখন বীভৎস কাজ শেষ করল ওরা, পাহাড়ের ঢাল ও নিচের জমিন লাশে ঢেকে গেছে। কয়েকজন চিমা গোঙাচ্ছে, বা বিলাপ বরছে, কিন্তু বেশিরভাগই স্থির পড়ে রয়েছে।
ঘোড়া থেকে নামমা! নির্দেশ দিল মেরেন। কাজটা শেষ করো।
মাঠের উপর দিয়ে দ্রুত এগোল সৈনিকরা। প্রাণের চিহ্ন দেখলেই আঘাত করছে চিমাদের। কাঁধে ব্রোঞ্জের তলোয়ার ঝোলানো লোকটাকে খুঁজে বের করল মেরেন। তিনটা তীরের ফলা বের হয়ে আছে তার বুক থেকে। তলোয়ারটা উদ্ধার করতে তার সামনে এসে উবু হলো মেরেন, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে চিৎকার করে উঠল তাইতা, মেরেন! তোমার পেছনে! কণ্ঠের শক্তিকে কাজ লাগাল ও। জমে গেল মেরেন। লাফ দিয়ে একপাশে সরে গেল। এতক্ষণ ওর পাশে পড়ে থাকা চিমা মড়ার ভান করছিল। মেরেন অসতর্ক হওয়ার অপেক্ষা করেছে, তারপর লাফিয়ে উঠে ভারি পাথরের মাথাঅলা মুগুর হাঁকিয়েছে। অল্পের জন্যে মেরেনের মাথা ফস্কে গেছে ওটা, কিন্তু বাম কাঁধে ঘষা লেগেছে। পাঁই করে ঘুরে কাছে চলে এলো মেরেন, অস্ত্রের পরবর্তী আঘাতটা ঠেকাল। পরক্ষণে চিমার শরীরে ঢুকিয়ে দিল নিজের তলোয়ারের ডগা, স্টারনাম থেকে মেরুদণ্ড পর্যন্ত এফোড়ওফোঁড় হয়ে গেল। ক্ষতস্থানটাকে আরও বড় করে তুলতে কব্জিতে একটা মোচড় দিয়ে তলোয়ার ঘোরাল ও। ওটা এক টানে বের করে আনার সময় সাথে সাথে ছলকে বের হয়ে এলো হৃৎপিণ্ডের রক্ত।
