তলোয়ার বের করে নিয়েছিল কয়েক জন সৈনিক, কিন্তু গাছপালার ভেতর থেকে ওদের বের করে আনতে ছুটে যাবার আগেই ঠেকাল তাইতা। আমরা অনুসরণ না করলে ওরা আমাদের অনুসরণ করবে, সেটাই ওরা চায়। ওদের আমরা আমাদের পছন্দ মতো একটা বধ্যভূমিতে নিয়ে যেতে পারব। কাটাপায়ের সাথে করুণ দর্শন খুলিগুলো কবর দিল ওরা, তারপর ফিরে এলো যারীবায়।
পরদিন সকাল সকাল কলাম গঠন করে ফের অন্তহীন যাত্রা শুরু করল। দুপুরে যাত্রা বিরতি দিয়ে বিশ্রাম নিল, ঘোড়াকে পানি খাওয়াল। তাইতার নির্দেশে গাছপালার ভেতর পিছলে ঢুকে পড়ল নাকোন্তো, বড়সড় একটা বৃত্তের আকারে চক্কর দিয়ে এলো। ছায়ার মতো পিছলে কলামের ব্যাক ট্রেইলে উঠে এলো ও। ঘোড়ার ট্র্যাকের উপর তিন সেট নালবিহীন ঘোড়ার পায়ের ছাপ স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। দলের সাথে যোগ দিতে আরেকটা বড় বৃত্তের আকারে চক্কর দিয়ে তাইতার কাছে রিপোর্ট করতে এলো ও। আপনার চোখ অনেক কড়া, প্রবীন পুরুষ। যেমন অনুমান করেছিলেন, তিনটা শেয়াল আমাদের পিছু নিয়েছে। দলের বাকিগুলোর বেশি দূরে থাকার কথা নয়।
সেদিন সন্ধ্যায় যারীবার আগুনের পাশে বসে পরের দিনের পরিকল্পনা খাড়া করল ওরা।
পরদিন সকালে বেশ দ্রুত চালে যাত্রা শুরু করল। আধা লীগ যাওয়ার পরপরই গতিকে দুলকি চালে তুলে আনতে নির্দেশ দিল মেরেন। দ্রুত নিজেদের ও চিমা স্কাউটদের মাঝখানের ফাঁক বাড়িয়ে তুলল, জানে পিছন পিছন আসছে ওরা। সামনে বাড়ার সময় ওরা যে এলাকার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল সেটাকে জরিপ করছিল মেরেন ও তাই। সুবিধাজনক জায়গার খোঁজ করছে। সামনে বনের ভেতর ছোট বিচ্ছিন্ন টিলা মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। কোণাকুণি ওটার দিকেই এগোল ওরা। পুবের ঢাল ঘুরে আসার পর একটা মসৃণ বেশ পর্যদস্ত হাতি চলাচলের পথের দেখা পেল। ওটা অনুসরণ করে মাথার উপরের পাহাড়ের শরীর বেশ খাড়া আবিষ্কার করল। ঘন হয়ে জন্মানো কিতার কাঁটাঝোপে ঢাকা। ভয়ঙ্কর কাটা আর গায়ে গায়ে জড়ানো ডালপালা দুর্ভেদ্য দেয়াল তৈরি করেছে। রাস্তার উল্টো দিকে জমিন সমান, প্রথম দেখায় উন্মুক্ত জঙ্গলটা অ্যাম্বুশের পক্ষে তেমন একটা আড়াল দিতে পারবে বলে মনে হলো না। তবে গাছপালার ভেতর আরও খানিকটা দূরে আসার পর একটা ওয়াদি দেখতে পেল তাইতা ও মেরেন, ঝড়ের পানির ধাক্কায় তৈরি একটা শুকনো নালা, ওদের কলাম ও ঘোড়া আড়াল করার পক্ষে যথেষ্ট গভীর ও প্রশস্ত। নালার মুখটা হাতির রাস্তা থেকে মাত্র চল্লিশ গজ দূরে, তীরের সহজ নিশানার ভেতর। চট করে আবার মূল কলামের সাথে যোগ দিল ওরা। অল্প সময়ের জন্যে হাতির রাস্তায় এগিয়ে আবার থামল মেরেন, ওর সেরা তিনজন তীরন্দাজকে রাস্তার ধারে গা ঢাকা দেওয়াল।
তিন চিমা স্কাউট আমাদের পিছু নিয়েছে। তোমাদের প্রত্যেকের ভাগে একটা করে, ওদের বলল ও। ওদের কাছে আসতে দেবে, সময় নিয়ে শিকার বেছে নেবে। ভুল করা চলবে না। দ্রুত, পরিষ্কার নিকেশ। ওদের পেছন আসতে থাকা বাকি চিমাদের সতর্ক করে দিতে কাউকে পালাতে দেওয়া যাবে না।
তিন তীরন্দাজকে রেখে হাতি সড়ক ধরে আগে বাড়ল ওরা। আধা লীগ এগোনোর পর রাস্তা ছেড়ে বড় একটা বৃত্তের আকারে পাহাড়ের ঢালের নিচের নালার দিকে এগিয়ে এলো। ওটায় নামাল ঘোড়াগুলো, তারপর স্যাডল ছাড়ল। ফেন ও শিলুক মেয়েরা পশুদের ধরে রাখল। সৈনিকরা হাঁক দিলেই সামনে নিয়ে যেতে তৈরি। ফেনের সাথে অপেক্ষায় রইল তাইতা। কিন্তু সময় হলে মেরেনের কাছে হাজির হতে মাত্র এক মুহূর্ত সময় লাগবে ওর।
ধনুকে তীর পরাল লোকেরা, তারপর ওয়াদির ঠিক মুখের নিচে লাইন বেঁধে দাঁড়াল, হাতির রাস্তার দিকে মুখ। মেরেনের নির্দেশে পা আর ধনুক ধরা হাতকে বিশ্রাম দিতে ও লড়াইয়ের জন্যে নিজেদের প্রস্তুত করতে চোখের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসল ওরা। কেবল মেরেন ও তার ক্যাপ্টেনরা রাস্তার দিকে নজর রাখছে, কিন্তু মাথার ছায়া আড়াল করতে ঘাস বা ঝোঁপের জটলার আড়ালে অবস্থান নিয়েছে ওরা।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না ওদের, রাস্তা ধরে হাজির হলো তিন চিমা স্কাউট। ঘোড়ার সাথে তাল মেলাতে অনেক জোরে ছুটতে হয়েছে ওদের। ঘামে চকচক করছে ওদের শরীর, হাপরের মতো ওঠানামা করছে বুক, হাঁটু অবধি ধূলোয় মাখামাখি হয়ে আছে পা। সতর্ক করার ভঙ্গিতে একটা হাত ওঠাল মেরেন। নড়ল না কেউ। বেশ দ্রুত দুলকি চালে অ্যাম্বুশের জায়গাটা পার হয়ে গেল স্কাউটরা, রাস্তা ধরে অদৃশ্য হয়ে গেল বনের ভেতর। একটু স্বস্তি বোধ করল মেরেন। খানিক পরে স্কাউটদের ব্যবস্থা করার জন্যে ওর রেখে আসা তিন সৈনিক বন থেকে পিছলে বের হয়ে ওয়াদিতে লাফিয়ে নামল। জিজ্ঞাসু চোখে ওদের দিকে তাকাল মেরেন। দাঁত বের করে হেসে নিজের টিউনিকে টাটকা রক্তের ছিটা দেখাল ওকে। স্কাউটদের ব্যবস্থা করা গেছে। এবার চিমাদের মূল দলের আগমনের অপেক্ষায় স্থির হয়ে বসল ওরা।
অল্প সময় পর ডান পাশের জঙ্গল থেকে ধূসর লরির কাঁচকোচ সতর্ক আওয়াজ কী-ওয়ে! কী-ওয়ে! শোনা গেল। তারপর পাহাড়ের মাথা থেকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল একটা বেবুন। নিজের লোকদের সঙ্কেত দিতে একটা হাত তুলল মেরেন। ধনুকে তীর পরাল ওরা।
