সম্ভবত এটাই একমাত্র ভাষা এমনকি ডাইনীও যা বুঝতে পারবে না, যদিও আমার তাতে সন্দেহ আছে, মন্তব্য করল ও। অন্তত তোমার পক্ষে বেশ ভালো অনুশীলন এটা।
সারা দিন চলার পর চিমা এলাকার বেশ গভীরে চলে এসেছে ওরা, এখানে লম্বা লম্বা মেহগনি গাছের বনে যারীবা তৈরি করল। ওটার চারপাশে রসাল পাতার লম্বা লম্বা ঘাসের চারণভূমি। ঘোড়াগুলো পছন্দ করল। আগে থেকেই ওখানে অ্যান্টিলোপের দল চরে বেড়াচ্ছিল। এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ওই দলের উপর কখনও শিকারীর আক্রমণ হয়নি, কারণ ওগুলো এতটাই পোশ মানানো ও গায়ে পড়া ছিল শিকারীদের অনায়াসে তীর ছোঁড়ার মতো কাছাকাছি দূরত্বে পৌঁছে যেতে দিল।
মেরেন ঘোষণা করল, পর দিন ওরা বিশ্রাম নেবে। বেশ ভোরে চারটে শিকারী দল পাঠাল ও। তাইতা ও ফেন যখন ওদের রেওয়াজ মাফিক সংগ্রহ অভিযানে বের হলো, ওদের সাথে শোফার ও আরও দুজন সৈনিক দেওয়ার জন্যে জোর দিল মেরেন। হাওয়ায় এমন কিছু আছে আমাকে যা অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে, এছাড়া আর কোনও ব্যাখ্যা দিল না সে।
ফেনকে একান্তে কাছে রাখতেই পছন্দ করে তাইতা, কিন্তু মেরেন বাতাসে কুলক্ষণ টের পেলে তার সাথে তর্ক চলে না এটাও বেশ ভালোই জানে। মনস্তাত্ত্বিক না হলেও সে যোদ্ধা, ঝামেলার গন্ধ পায়। শেষ বিকেলে শিবিরে ফিরে এলো ওরা, মেরেনের পাঠানো শিকারী দলের ভেতর মাত্র তিনটা দলকে ফিরে আসতে দেখল। প্রথমে তেমন একটা কিছু মনে করল না এই ভেবে যে, হয়তো শেষ দলটা যেকোনও মুহূর্তে ফিরে আসবে। কিন্তু সূর্যাস্তের এক ঘণ্টা পর নিখোঁজ শিকারীদের একজনের একটা ঘোড়া দৌড়ে শিবিরে ঢুকল। ঘামে সপসপ করছে ওটার শরীর, কাঁধে চোট পেয়েছে। সব সৈনিককে অস্ত্র তুলে নিতে বলল মেরেন, ঘোড়ার জন্যে বাড়তি পাহারার ব্যবস্থা নিল। নিখোঁজ শিকারীদের শিবিরে ফিরে আসতে সাহায্য করতে বনফায়ার জ্বলানোর নির্দেশ দিল।
ভোরের প্রথম ঝলকের সাথে সাথে আহত ঘোড়াকে ব্যাক ট্র্যাক করার মতো যথেষ্ট আলো ফোঁটার পর একটা সশস্ত্র অনুসন্ধানী দল নিয়ে বেরিয়ে গেল শাবাকো ও হিলতো। ফেনকে মেরেনের হেফাযতে রেখে নাকোন্তোকে নিয়ে ওদের সাথে যোগ দিল তাইতা। কয়েক লীগ এগোেনোর পরই রূপালি পাতার গাছপালার নিচে পৌঁছে ভয়ঙ্কর দৃশ্যের মুখোমুখি হলো ওরা।
ট্র্যাক করার দক্ষতা ও চিমাদের অভ্যাস সম্পর্কিত বিদ্যায় ঠিক কী ঘটেছে বুঝে গেল নাকোন্তো। গাছপালার মাঝে গাঢাকা দিয়েছিল একটা বড়সড় দল, শিকারীদের জন্যে ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করছিল ওরা। একজনের ফেলে যাওয়া
একটা হাতির দাঁতের ব্রেসলেট তুলে নিল নাকোন্তো। এটা চিমাদের বানানো। দেখুন কত কাঁচা হাতের কাজ-একটা বাচ্চা শিলুকও এরচেয়ে ভালো জিনিস বানাতে পারবে। তাইতাকে বলল ও। গাছের কাণ্ডের চিহ্নের দিকে ইঙ্গিত করল, চিমাদের কেউ ওটা বেয়ে উঠেছিল। বিশ্বাসঘাতক শেয়ালগুলো এভাবেই লড়াই করতে পছন্দ করে, চোরের মতো চালাকি করে, সাহসের সাথে নয়।
গাছের ঝুলন্ত ডালের নিচ দিয়ে যাবার সময় চার মিশরিয়র উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চিমা। একই সময়ে আড়াল থেকে লাফ দিয়ে বের হয়ে আসে তার সঙ্গীরা, আঘাত করে ঘোড়ার গায়ে। ঘোড়ার পিঠ থেকে আমাদের লোকদের টেনে নামায় চিমা শেয়ালগুলো, সম্ভবত প্রাণ বাঁচাতে অস্ত্রও বের করতে পারেনি ওরা। লড়াইয়ের চিহ্নগুলোর দিকে ইঙ্গিত করল নাকোন্তো। এখানে ওদের বর্শা দিয়ে মেরেছে-ঘাসের উপর রক্ত দেখতে পাচ্ছেন। গাছের বাকলের বেণী পাকানো রশি ব্যবহার করে লাশগুলো সবেচয়ে কাছের রূপালি পাতার গাছের নিচু ডালে উল্টো করে ঝুলিয়েছে চিমারা, তারপর অ্যান্টিলোপের মতো চামড়া খসিয়ে নিয়েছে।
সব সময় আগে কলজে আর নাড়িভূঁড়ি খায় ওরা, ব্যাখ্যা করল নাকোন্তো। কয়লার আগুনে পোড়ানোর আগে এখানেই পেটের ময়লা পুঁতেছে ওরা।
তারপর লাশগুলোকে চার টুকরো করে ভাড়ের সাথে গাছের বাকলের দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়েছে। এখনও গাছের ডালে ঝুলছে গোড়ালির সংযোগ স্থলে কেটে নেওয়া পাগুলো। মাথা আর হাত আগুনে ছুঁড়ে দিয়েছে ওরা, পুড়ে যাওয়ার পর হাতের তালু চুষে খেয়ে আঙুলের হাড় থেকে মাংস টেনে নিয়েছে। আঙুল বাকা করে সেদ্ধ মগজ বের করতে বাড়ি মেরে খুলি ভেঙে তারপর গালের মাংস চেঁছে নিয়েছে, টেনে বের করে নিয়েছে জিভ, চিমাদের মজাদার খাবার। চারপাশে ভাঙা খুলি ও ছোট ছোট হাড়ের টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মরা ঘোড়া নিয়ে মাথা ঘামাতে যায়নি ওরা। সম্ভবত এত মাংস সামাল দেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। তারপর হত্যা করা সৈনিকদের অন্যান্য অবশেষ, যেমন কাপড়চোপড়, শরীরের অন্যান্য অংশ, অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে চলে গেছে। দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পশ্চিমে।
ওদের শিকার করতে বেরুব আমরা? রাগের সাথে জানতে চাইল শাবাকো, রক্তের নেশায় লাল হয়ে আছে চোখজোড়া। কিন্তু এক মুহূর্ত ভেবে মাথা নাড়ল তাইতা। ওরা তিরিশ থেকে চল্লিশ জন, আমরা মাত্র ছয়জন। পুরো একটা দিনে এগিয়ে আছে ওরা, আমরা ওদের ধাওয়া করবে বলেই ধরে নেবে। আমাদের কঠিন এলাকায় টেনে নিয়ে গিয়ে অ্যাম্বুশে ফেলবে শেষে। বনের চারপাশে নজর বোলাল ও। নির্ঘাত আমাদের উপর নজর রাখতে তোক রেখে গেছে। এই মুহূর্তে সম্ভবত আমাদের দিকেই নজর রাখছে ওরা।
