তৃতীয় দিন নোয়ুকে বিদায় জানাল ওরা। বিদায়ের জন্যে তৈরি হচ্ছিল যখন, পাঁচজন সৈনিক মেরেনের কাছে এলো প্রতিনিধি হিসাবে। প্রত্যেকের সাথে একজন করে শিলুক মেয়ে; সঙ্গীর মাথা ছাড়িয়ে গেছে।
এই মেয়েদের সাথে নিয়ে যেতে চাই আমরা, ঘোষণা করল দলের মুখপাত্র শোফার।
তোমাদের ইচ্ছা ওরা বুঝতে পেরেছে? প্রস্তাবটা নিয়ে ভাববার সময় পেতে জিজ্ঞেস করল মেরেন।
নাকোন্তো ওদের বুঝিয়ে বলেছে, ওদেরও ইচ্ছে আছে।
ওদের বাবা আর ভাইদের কী মত? আমরা চাই না যুদ্ধ বেধে যাক।
ওদের সবাইকে একটা করে ব্রোঞ্জের ড্যাগার দিয়েছি আমরা, ওরা খুশি হয়েছে।
মেয়েরা ঘোড়া হাঁকাতে পারে?
না, তবে বেশ দ্রুত শিখে নিতে পারবে।
চামড়ার হেলমেট খুলে কোঁকড়া চুলে হাত চালাল মেরেন। তারপর পরামর্শের জন্যে তাইতার দিকে তাকাল। কাঁধ ঝাঁকাল তাইতা, তবে ওর চোখজোড়া ঝিকিয়ে উঠল। ওদের হয়তো অন্ততপক্ষে রান্না করা বা আমাদের কাপড়চোপড় ধোয়া শেখানো যেতে পারে, পরামর্শ দিল ও।
কেউ ঝামেলা বাধালে বা ঝগড়া বাধলে বা ওদের নিয়ে মারামারি লাগলে, ওদের যার যার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেব আমি, সে আমরা যত দূরেই যাই না কেন, শান্ত কণ্ঠে শোফারকে বলল মেরেন।ওদের সামলে রাখবে, ব্যস।
এগিয়ে চলল কলামটা। সেদিন সন্ধ্যায় ওরা যখন সেনা ছাউনীতে পৌঁছাল, রেওয়াজ মাফিক তাইতার কাছে রিপোর্ট করতে ছুটে এলো নাকোন্তো। কিছুক্ষণ ওর পাশে বসে থাকাই এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। আজ বেশ ভালোই এগিয়েছি আমরা, বলল সে। আরও এতগুলো দিন চলার পর… হাতের সবকটা আঙুল দেখাল ও। …আমার দেশের লোকদের ছেড়ে যাব আমরা, চিমাদের দেশে পৌঁছাব।
ওরা কারা? শিলুকদের ভাই?
ওরা আমাদের শত্রু। লম্বায় খাট, আমাদের মতো সুন্দর না।
ওরা আমাদের যেতে দেবে?
স্বেচ্ছায় নয়, প্রবীন পুরুষ, নেকড়ের মতো বলল নাকোন্তো। যুদ্ধ হবেই। অনেক বছর কোনও চিমাকে মারার সুযোগ হয়নি আমার। মামুলি ভাবনা হিসাবে যোগ করল সে। চিমারা মানুষখেকো।
*
উঁচু মালভূমি ছেড়ে আসার পর টানা চারদিন এগিয়ে তারপর পঞ্চম দিনে বিশ্রাম অনেওয়ার একটা রেওয়াজ খাড়া করেছে তাইতা ও মেরেন। সেদিন ক্ষতিগ্রস্ত সরঞ্জাম মেরামত করে ওরা, মানুষ ও পশুর দলকে বিশ্রাম দেয়, রসদের ঘাটতি পূরণের জন্যে শিকারী ও সংগ্রহকারী দলকে পাঠায়। নো ও তার স্ত্রীদের ছেড়ে আসার সতের দিন পরে শিলুকদের শেষ ক্যাটল পোস্ট অতিক্রম করে এলো ওরা। এমন একটা এলাকায় প্রবেশ করল যেখানে অ্যান্টিলোপের বিশাল সব পাল ছাড়া আর কোনও কিছুর বাস নেই বলেই মনে হলো। বেশিরভাগই এমন প্রজাতির যেমনটা এর আগে ওরা আর দেখেনি। গাছপালার নতুন সব প্রজাতিরও দেখা পেল ওরা। খুশি হয়ে উঠল তাইতা ও ফেন। তাইতার মতোই দক্ষ বৃক্ষ বিশারদে পরিণত হয়েছে ও। গবাদি পশু বা মানুষের সন্ধান করল ওরা, কিন্তু কারও ছায়া চোখে পড়ল না।
এটাই চিমাদের এলাকা, নাকোন্তো জানাল তাইতাকে।
জায়গাটা ভালো করে চেনো?
না, তবে চিমাদের ভালো করেই চিনি। গাঢাকা দিয়ে থাকে ওরা, বিশ্বাসঘাতক। গরুছাগল পোষে না, এটাই ওদের বর্বর হওয়ার আসল লক্ষণ। শিকারের মংস খায়। সবার চেয়ে স্বজাতীদের বেশি পছন্দ করে। ওদের রান্নার আগুনে গিয়ে পড়তে না চাইলে অনেক সাবধানে থাকতে হবে আমাদের।
নাকোন্তোর সতর্কবাণী মাথায় রেখে রোজ সন্ধ্যায় যারীবা তৈরির সময় বিশেষ মনোয়োগ দিতে লাগল মেরেন। ঘোড়া ও খচ্চরের দলকে ঘাস খেতে ছেড়ে দেওয়ার সময় বাড়তি পাহারার ব্যবস্থা করছে। চিমা এলাকার আরও ভেতরে যাওয়ার সাথে সাথে ওদের উপস্থিতির নানান আলামত সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠল ওরা। গাছের ফাঁপা কাণ্ড পেল, কেটে দুর্ফাক করে ধোয়া দিয়ে বের করে নেওয়া হয়েছে ভেতরের মোমাছি। তারপর একটা ছাপরার জটলার কাছে এলো ওরা, বেশ কিছুদিন মানুষের আবাস ছিল এখানে। অতি সাম্প্রতিক উৎসের চিহ্ন হচ্ছে নদীর কাদাময় তীরে একটা দলের পায়ের ছাপের সারি, এক সারিতে নদী পার হয়েছে তিরিশজনের দলটা। মাত্র কয়েক দিনের পুরোনো।
নতুন শিলুক স্ত্রীরা কেউই ফেনের চেয়ে বেশি বড় হবে না; গোড়া থেকেই ওকে দেখে মুগ্ধ হয়েছিল ওরা। নিজেদের ভেতর ওর চুলের রঙ ও চোখ নিয়ে আলোচনা করছে, ওর প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করছে, কিন্তু দূরত্ব বজায় রাখছে। শেষে ওদের সাথে বন্ধুত্বসুলভ ব্যবহার করে আগে বাড়ল ফেন, ফলে অচিরেই ওকে ওদের সাঙ্কেতিক ভাষায় কথাবার্তা বলতে দেখা গেল। ফেনের চুলের টেক্সচার অনুভব করল ওরা, মেয়েলি রসিকতায় তীক্ষ্ণ কণ্ঠে হাসতে শুরু করল, রোজ সন্ধ্যায় নগ্ন হয়ে অগভীর পুকুরে গোসল করতে লাগল। পরামর্শের জন্যে নাকোন্তোর কাছে আবেদন জানাল ফেন। ঠিক মিশরিয় ভাষার মতোই ঝটপট শিলুক ভাষা রপ্ত করে নিল ও। এক অর্থে এখনও ছেলেমানুষ রয়ে গেছে ও, মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করার জন্যে সমবয়সী সঙ্গী পাওয়ায় খুশি হলো তাই। অবশ্য, সে যাতে অন্য মেয়েদের সাথে খুব বেশি দূরে চলে যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করল। কাছে কাছে রাখছে ওকে যাতে বাতাসে অস্বাভাবিক শীতলতার প্রথম আলামতেই বা অচেনা উপস্থিতির অন্য কোনও লক্ষণ টের পাওয়া মাত্র ওর কাছে ছুটে যেতে পারে। শত্রুদের চোখে পড়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে সে আর তাই শিলুক ভাষায় কথা বলতে শুরু করে।
