কাঁপতে থাকা সোনালি আলো, এমন কখনও দেখিনি বা দেখার আশাও করি না। উজ্জ্বল হয়ে উঠল ফেনের চেহারা। বলে চলল তাইতা, এখানেই আমাদের সমস্যা। ওটাকে এভাবে জ্বলতে দিলে নিমেষে বুঝে ফেলবে ডাইনী, বুঝবে ওর পক্ষে তুমি কত মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারো।
কথাটা ভাবল ও। তুমি বললে, ডাইনী আমাদের উপর নজর রাখছে। তাহলে সেকি আগেই আমার আভা চিনে ফেলেনি? ওর কাছ থেকে তা লুকোনোর সময় ফুরিয়ে যায়নি?
অনেক দূর থেকে নজর রেখে এমনকি কোনও মোহন্তের পক্ষেও একটা আভা চিনে ফেলা সম্ভব নয়। শুধু বস্তুকে সরাসরি দেখেই সেটা সম্ভব। পুকুরের জলে ডাইনীকে একটা অপচ্ছায়া হিসাবে দেখেছি আমরা, আমাদেরও সে ওভাবেই দেখেছে। আমাদের দৈহিক সত্তা সম্পর্কে ধারণা করে থাকতে পারে সে, আমাদের কথাবার্তাও শুনতে পারে-এমনকি আমরা যেমন পেয়েছি তেমনি সেও আমাদের গন্ধ পেয়ে থাকতে পারে কিন্তু তোমার আভা দেখার কথা নয়।
তোমার বেলায়? তুমি আড়াল করে রেখেছিলে?
মোহন্ত হিসাবে-আমি বা ডাইনী-কেউই আভা বিলাই না।
আমায় আভা লুকোনোর কায়দা শিখিয়ে দাও, মিনতি করল ফেন।
সায় দিয়ে মাথা কাত করল তাইতা। শেখাব, তবে খুব সাবধানে থাকতে হবে আমাদের। সে আমাদের উপর নজর রাখছে না বা আড়িপেতে কথা শুনছে না, এব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে আমাকে।
কাজটা সহজ ছিল না। ওর প্রয়াস কতটা সফল হচ্ছে বোঝার জন্যে তাইতার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে ওকে। ওর সর্বোচ্চ প্রয়াসে আভা প্রথমে ফিকে হয়ে এলেও অচিরেই আগের মতো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। পরম অধ্যাবসায়ে কাজ চালিয়ে গেল ওরা; এবং আস্তে আস্তে ফেনের অসামান্য প্রয়াস ও তাইতার পরামর্শে মিটিমিটি ভাবটা তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে ম্লান হয়ে এলো। কিন্তু ইচ্ছামতো সেটাকে মেরেন বা অন্য কোনও সৈনিকের আভার চেয়ে নিচের মাত্রায় আনতে ও দীর্ঘ সময়ের জন্যে ঔজ্জ্বল্যের এই পর্যায়ে ধরে রাখতে কয়েক সপ্তাহ লেগে গেল।
মালভূমির শিবির ছেড়ে আসার নয় দিন পর নদীর ধারে পৌঁছুল ওরা। এপার থেকে ওপার প্রায় এক লীগ হলেও নীলের জল ওরা যেখানে ধুরা শস্য রোপন করেছিল সেখানকার পাহাড়ী জলধারার চেয়ে তেমন জোরে বইছে না। শুকনো বালি আর কাদার চরের বিশাল বিস্তারে ক্ষীণ ধারা প্রায় মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। তবে ওদের প্রয়োজন মেটানোর জন্যে এটাই যথেষ্ট ছিল। দক্ষিণে বাঁক নিল ওরা, তারপর পুব পার বরাবর আগে বাড়ল, রোজ অনেক লীগ দূরত্ব অতিক্রম করছে। হাতির দল ভূগর্ভস্থ পরিষ্কার পানির নাগাল পেতে নদীর তলদেশে গভীর গর্ত খুঁড়ে রেখেছে। মানুষ ও পশু ওখান থেকে পানি খেল।
রোজ এই প্রাচীন ধূসর পশুর বিশাল পালের মুখোমুখি হচ্ছে ওরা, গর্ত থেকে পানি খাচ্ছে, খুঁড়ে করে প্রচুর পানি তুলে ফাঁক হয়ে থাকা গোলাপি গলায় ঢালছে, কিন্তু সেনা দলের আগমনে দল বেঁধে নদীর তীর ধরে কান দোলাতে দোলাতে ছুটে চলে যাচ্ছে, বনের ভেতর ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে হাঁক ছাড়ছে। পুরুষগুলোর অনেকেই বিরাট বিরাট শাদা দাঁত বহন করছে। অনেক চেষ্টায় শিকারীদের ওদের হত্যা করা থেকে বিরত রেখে ওগুলোকে অক্ষত চলে দিতে পারল মেরেন। এখন শিলুক গোত্রের অন্যদেরও গরুছাগল চরাতে দেখতে পাচ্ছে ওরা। আবেগে ভেসে গেল নো। প্রবীন সম্মানিত জন, এরা আমার আপন গ্রামের লোক। ওদের কাছে আমার পরিবারের খবর আছে, তাইতাকে বলল সে। দুই মৌসুম আগে আমার এক স্ত্রীকে কুমীর খেয়ে নিয়েছে, তবে অন্য তিনজন ভালো আছে, অনেক বাচ্চা হয়েছে ওদের। তাই জানে, গত সাত বছর কেবুইতে ছিল নোম্ভ, তাই বাচ্চা জন্মানোর কথা শুনে অবাক হলো ও। স্ত্রীদের ভাইদের হাতে রেখে গিয়েছিলাম, তিক্ত কণ্ঠে বলল নোস্তু।
মনে হচ্ছে ওদের ভালোই যত্ন নিয়েছে ওরা, শুষ্ক কণ্ঠে মন্তব্য করল তাইতা।
খুশি মনে বলে চলল নোস্তু, আমার বড় মেয়েটা প্রথম লাল চাঁদের দেখা পেয়েছে, বাচ্চা জন্ম দেওয়ার বয়সে পৌঁছে গেছে ও। ওরা বলছে, বিয়ের উপযুক্ত হয়ে উঠেছে ও, অল্প বয়সী ছেলেরা অনেক গবাদি পশু যৌতুক দিতে রাজি হয়েছে। ওদের সাথে ফিরে যেতে হচ্ছে আমাকে। আমার আত্মীয় ওরা। গ্রামে ফিরে ওর বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। গরুছাগলের ব্যবস্থা করতে হবে।
তোমার বিদায়ে আমার খারাপ লাগবে, ওকে বলল তাইতা। তোমার কী অবস্থা নাকোতো? তুমিও কি আমাদের ফেলে চলে যাবে?
না, প্রবীন পুরুষ। আপনার ওষুধে আমার কোষ্ঠকাঠিন্য দূর হয়ে যাচ্ছে। তাছাড়া, আপনার সাথে থাকলে ভালো খাবার যেমন মিলবে তেমনি মজার লড়াইও লড়া যাবে। অনেক স্ত্রী আর ওদের শোরগোল করে চলা ছেলেমেয়ের চেয়ে আমার বরং সেটাই পছন্দ। ওই সব বাধা ছাড়াই বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আপনার সাথেই থাকব।
নোন্তুর গ্রামের পাশে তিন দিনের জন্য শিবির করল ওরা। গরুছাগলের খোয়াড়ের চারপাশে বৃত্তাকারে তৈরি চমৎকারভাবে চাল বসানো বেশ কয়েক শো কোণাচে কুঁড়ের একটা সমাহার। রোজ রাতে ওখানে গবাদি পশু তুলে রাখে ওরা। এখানে রাখালরা গরুর দুধ দোয়ায়, তারপর প্রত্যেকটা পশুর গলার কাছের মহা ধমনী থেকে রক্ত সংগ্রহ করে। এটাই ওদের একমাত্র খাবার বলে মনে হলো। পুরুষ, এমনকি নারীরাও বেশ লম্বা, তবে ছিপছিপে; চলাফেরা মোহনীয়। গোত্রীয় টাটু থাকলেও অল্প বয়সী মেয়েরা বিবাহযোগ্যা ও দেখতে বেশ সুন্দর। শিবিরের চারপাশে ঘিরে বসে খোলামেলাভাবে সৈনিকদের সাথে হাসাহাসি করে ওরা।
