রাতে ওর পাশে শুয়ে থাকার সময় ফেনের দুঃস্বপ্নে কথা শুনছে তাইতা। কিন্তু ওকে সেগুলো থেকে বের করে আনার চেষ্টা করেনি। বরং ওকে শান্ত করতে, ওকে আবার অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনতে নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ, ফেন, আমি জানি। ঘুমের ভেতর অস্তিত্বের এই স্তর ছেড়ে পরের স্তরে চলে যাও তুমি। বোঝার ভাব নিয়ে হাসল ও। খেই ধরল তাইতা। বেশির ভাগ মানুষ স্বপ্ন দেখলেও তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। অনেকেরই সূক্ষ্ম শাসের ভেতর দিয়ে দেখার বিশেষ ক্ষমতা থাকে। যেখানে আমরা বন্দি হয়ে আছি। অনেকের, যেমন মোহন্ত ও ম্যাগাইদের। অনেক দূর থেকে সব কিছু দেখার জন্যে এমনকি আত্মার রূপ নিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর ক্ষমতা থাকে।
তোমার আছে, তাইতা? হেঁয়ালির হাসি দিল তাইতা। ফেন জোরে বলে উঠল, নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর আর অদ্ভুত। আমিও যদি পারতাম, যা খুশি লাগত।
একদিন হয়তো পারবে। বুঝতেই পারছ, ফেন, পুকুরে ডাইনীর ছায়া দেখেছ তুমি, যার মানে তোমার সেই ক্ষমতা আছে। আমাদের কেবল তোমাকে সেই ক্ষমতা কাজে লাগানো শেখাতে হবে।
তার মানে আমাদের উপর গোয়েন্দাগিরি করতে এসেছিল ডাইনীটা? আসলেই ওখানে ছিল সে?
তার আত্মা ছিল। আমাদের উপর নজর রাখছে।
ওকে ভয় লাগছে আমার।
সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তবে ওর কাছে আত্মসমর্পণ করা চলবে না। আমাদের, তোমার আর আমার, নিজস্ব শক্তিতে মোকাবিলা করতে হবে তার। অবশ্যই তার বিরোধিতা করে অশুভ মায়া নষ্ট করে দিতে হবে। সেটা যদি পারি, ওকে ধ্বংস করে দেব আমরা, তার জন্যে এই পৃথিবীই হবে ভালো জায়গা।
আমি সাহায্য করব তোমাকে, দৃঢ় কণ্ঠে বলল ফেন। কিন্তু আগে তারকাঁদা শিখিয়ে দিতে হবে তোমাকে।
এ পর্যন্ত তোমার অগ্রগতি অলৌকিক, অকপট সমীহের সাথে ফেনের দিকে তাকাল তাইতা। অন্য জীবনে এক কালে যে রানি ছিল ইতিমধ্যে তার মতো মন ও আত্মা গড়ে তুলতে শুরু করেছে ও। আরও শেখার জন্যে তৈরি তুমি, ওকে বলল তাইতা। এখুনি শুরু করব আমরা।
*
রোজ ঘোড়ার পিঠে পাশাপাশি এগোনো শুরু করার সাথে সাথে শুরু হয় ওর মাদীক্ষা। যাত্রার দীর্ঘ দিন জুড়ে অব্যাহত থাকে। ফেনের মনে একজন ম্যাগাইয়ের কর্তব্য প্রোথিত করে দেওয়াই ওর প্রাথমিক লক্ষ্য। তাকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেই ক্ষমতার সযত্ন ও দায়িত্বশীল প্রয়োগের ভেতর দিয়ে এই কর্তব্য পালন করতে হয়। একে কখনওই হালকাভাবে বা অবহেলার সাথে বা স্বার্থপর তুচ্ছ মতলব হাসিলের কাজে ব্যবহার করতে পারবে না তারা।
এই পবিত্র দায়িত্ব বুঝে ও আনুষ্ঠানিকভাবে ওর সথে শপথ বাক্য উচ্চারণ করে সেটা স্বীকার করার পর জাদুকরী শিল্পের সাধারণ ধরণ নিয়ে আলোচনায় নামল ওরা। প্রথমে ফেনের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতার উপর বেশি জোর খাটাতে গেল না তাইতা। এমন একটা গতি স্থির করার চেষ্টা করল যাতে সে তাল মেলাতে পারে। কিন্তু উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন ছিল না ওর। মেয়েটা অক্লান্ত, ওর প্রতিজ্ঞা অটল।
প্রথমে ওকে আড়াল সৃষ্টির মায়া বিস্তারের কায়দা শেখাল তাইতা যা ওকে অন্যদের চোখের আড়ালে নিয়ে যাবে। রোজ দিনের শেষে ওরা অস্থায়ী প্রাচীরের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঢোকার পর এর চর্চা করতে লাগল ও। তাইতার পাশে চুপ করে বসে ওর সহায়তায় আড়াল সৃষ্টির চর্চা শুরু করে। মনোযোগ দেওয়ার জন্যে অনেকগুলো রাতের প্রয়োজন হলো, তবে শেষ পর্যন্ত সফল হলো ও। নিজেকে সে পুরোপুরি আড়াল করার পর চেঁচিয়ে মেরেনকে ডাকল তাইতা। ফেনকে দেখেছ? ওর সাথে কথা বলতে চাইছিলাম।
এপাশ ওপাশ তাকাল মেরেন। কোনও বিরতি ছাড়াই ফেনের উপর দিয়ে ঘুরে এলো ওর দৃষ্টি। একটু আগেও এখানে ছিল সে। নিশ্চয়ই বাইরে ঝোপে টোপে গেছে। ওকে খুঁজতে যাব?
থাক লাগবে না, তেমন গুরুত্বপুর্ণ কিছু না। চলে গেল মেরেন, বিজয়ীর মতো হেসে উঠল ফেন।
পাঁই করে ঘুরল মেরেন, বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। ওই তো সে! আপনার পাশেই বসে আছে! হেসে ফেলল তারপর। চালাক মেয়ে, ফেন! অনেক চেষ্টা করেও পারিনি আমি।
ফেন ভৌত দেহ আড়াল করার কায়দা শেখার পর ওকে মন ও আভা আড়াল করার সবক দিতে পারল ও। এটা আরও কঠিন। প্রথমেই ডাইনীটা যে ওদের উপর নজর রাখছে না নিশ্চিত হতে হলো ওকে: পুরোপুরি দক্ষতা অর্জন না করা পর্যন্ত চেষ্টা চালানোর সময় যেকোনও বৈরী অপশক্তির কাছে নাজুক অবস্থায় থাকবে ও। দীক্ষা দান শুরু করার আগে চারপাশের ইথারে অনুসন্ধান চালাতে হলো তাইতাকে। নিজের প্রতিরক্ষা জোরাল রাখতে হলো।
প্রতিটি জীবন্ত বস্তুকে ঘিরে রাখা আভার বিষয়টি উপলব্ধি করাই ছিল ফেনের প্রথম কাজ। এটা দেখতে পাচ্ছিল না সে, অন্তর্চক্ষু উন্মোচিত না হওয়া পর্যন্ত কোনওদিন দেখবেও না। ওকে দুর্গম যাত্রা পথে সরস্বতীর মন্দিরে নিয়ে যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তাইতা। তার আগে ব্যাপারটা ওর কাছে ব্যাখ্যা করতে হলো। আভার ধারণা বোঝার পর ফেনের কাছে অন্তর্চক্ষু ও সেটাকে কাজে লাগানোর মোহন্তের ক্ষমতার ব্যাপারটা খুলে বলতে পারল তাই।
তোমার অন্তর্চক্ষু আছে, তাইতা?
হ্যাঁ, তবে ডাইনীরও আছে, জবাব দিল ও।
আমার আভা দেখতে কেমন? অসাধারণ মেয়েলী অহঙ্কারের সাথে জানতে চাইল ফেন।
