এটা ডাইনীর ছায়া দেখেছ তুমি। তার গন্ধই নাকে লেগেছে।
ডাইনীটা কে?
শিগশিগই বলব তোমাকে, তবে এখন আমাদের শিবিরে ফিরতে হচ্ছে। আরও জরুরি কাজ আছে আমাদের হাতে।
*
ডাইনী ওদের সন্ধান পেয়ে গেছে। তাইতা বুঝতে পারছে এই সুন্দর জায়গায় দীর্ঘদিন থাকার জন্যে প্রলুব্ধ করা হয়েছে ওকে। ওর জীবনী শক্তি তরঙ্গের মতো তৈরি হয়েছে, টের পেয়ে গেছে ডাইনীটা, তারপর গন্ধ শুঁকে বের করে ফেলেছে। ওদের অবশ্যই সরে পড়তে হবে, এবং খুব দ্রুত।
সৌভাগ্যক্রমে লোকজন এখন তৈরি, পুরোপুরি সেরে উঠেছে ওরা। ওদের প্রাণশক্তি এখন তুঙ্গে রয়েছে। শক্তিশালী হয়ে উঠেছে ঘোড়াগুলো। ধুরার থলেগুলো ভরে ফেলা হলো। তলোয়ারে ধার দেওয়া হয়েছে। সমস্ত সরঞ্জাম মেরামত করা হয়েছে। ডাইনী ওদের খোঁজ পেয়ে থাকলে তাইতাও তার খোঁজ পেয়েছে। তাই এখন জানে কোন দিকে তার আস্তানা।
লোকজনকে সংগঠিত করল মেরেন। জলাভূমির উসুল করা মাশুল বেশ চড়া ছিল। প্রায় দেড় বছর আগে তিরানব্বই জন অফিসার আর লোক কেবুইয়ের দুর্গ থেকে পথে নেমেছিল। এখন আহ্বানে সাড়া দিতে অবিশিষ্ট রয়েছে ছত্রিশ জন। ঘোড়া আর খচ্চরের দল ওদের চেয়ে ভালো দেখিয়েছে। প্যাক মিউলের উপহারসহ আদি পালের তিনশো ঘোড়ার ভেতর একশো অষ্টাশিটি টিকে গেছে।
কলামটা শিবির ছেড়ে আসার সময় পেছনে তাকাল না কেউ। শিবিরের পাশ দিয়ে এগিয়ে সমতলে এসে তারপর নদীর দিকে ফিরতি পথ ধরল। এখন আর তাইতার পেছনে উইন্ডস্মোকের পিঠে বসছে না ফেন। ঘোড়া হাঁকানোয় দক্ষতা প্রদর্শনের পর নিজের মালিকানায় ঘোড়া দাবি করেছিল সে। ওর জন্যে একই রকম স্বাস্থ্যের একটা সুঠাম বে গেল্ডিং বেছে দিয়েছে তাই।
ওটা পেয়ে খুশি হয়ে উঠেছিল ফেন। ওকে হাঁস ডাকব, ঘোষণা করেছে।
অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়েছে তাই। হাঁস কেন?
হাঁস আমার পছন্দ। আমাকে হাঁসের কথা মনে করিয়ে দেয় ওটা। খুশির সাথে ব্যাখ্যা করেছে ও। তাইতা ধরে নিয়েছে বাড়তি তর্ক ছাড়াই নামটা মেনে নেওয়াই ভালো হবে।
পাহাড়ের পাদদেশে আসার পর পথ যথেষ্ট প্রশস্ত হলে সামনে বেড়ে তাইতার পাশাপাশি এগোতে লাগল ও; যাতে ওরা কথা বলতে পারে। পরস্পরের সাথে লেগে যাবার উপক্রম হচ্ছে ওদের হাঁটু। আমাকে পানির সেই ডাইনীর গল্প বলবে। বলেছিলে। এটাই সবচেয়ে ভালো সময়।
হ্যাঁ, ঠিক। ডাইনীটা অনেক বয়স্কা এক মহিলা। সময়ের সূচনা থেকেই বেঁচে আছে। অনেক ক্ষমতাশালী, জঘন্য সব কাজ করে।
কীরকম জঘন্য কাজ?
সদ্যজাত শিশুদের খায়। শিউরে উঠল ফেন। জ্ঞানী লোকদের লোভ দেখিয়ে নিজের আস্তানায় টেনে নিয়ে তাদের আত্মা গিলে খায়। তারপর শরীরের খোলসটা ফেলে দেয়।
এমন কিছু সম্ভব হতে পারে জীবনেও ভাবিনি।
আরও খারাপ কথা বলা বাকি আছে, ফেন। ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীর মাতা মহান নদীর প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে সে, যে নদীর পানি সবাইকে জীবন, পানি ও খাবার দেয়।
কথাটা ভাবল ফেন। লু-দের ধারণা ছিল আমিই নদীকে মেরেছি। আমাকে গ্রাম থেকে বের করে দিয়েছিল ওরা যাতে বনের ভেতর উপোস মারা যাই, কিংবা যাতে বুনো পশুর পেটে যাই।
ওরা নিষ্ঠুর, অজ্ঞ মানুষ, সায় দিল তাইতা।
তুমি আর মেরেন ওদের শেষ করায় আমি খুশি, সাধারণভাবে বলল ও। তারপর কিছুক্ষণ চুপ রইল। কী কারণে ডাইনী নদীটাকে মেরে ফেলতে চাইবে?
ফারাও-এর ক্ষমতা নষ্ট করে তাঁর সাম্রাজ্যের লোকদের দাস বানাতে চায় সে।
ফারাও কী, দাস বানানো মানে কী? ব্যাখ্যা করল তাইতা। ওকে গম্ভীর দেখাল। তাহলে তো আসলেই খারাপ সে। সে থাকে কোথায়?
অনেক দক্ষিণে এক দেশের এক বিরাট হ্রদের পাশের আগ্নেয়গিরিতে, বলে সামনের দিকে ইঙ্গিত করল ও।
সেখানেই যাচ্ছি আমরা?
হ্যাঁ। ওকে ঠেকানোর চেষ্টা করব আমরা, পানি যাতে ফের প্রবাহিত হয় সেই ব্যবস্থা করব।
অত দূর থেকে আমরা যেখানে দেখলাম, সেই পুকুরে এলো কীভাবে?
ওকে দেখিনি আমরা। ওট ছিল ছায়া।
ভুরু কুঁচকে ছোট্ট নাক কোঁচকাল ফেন, কথাটা বোঝার চেষ্টা করছে। বুঝলাম না।
গার্ডলের উপর রাখা চামড়ার থলের দিকে হাত বাড়াল তাইতা, তারপর ওটা থেকে প্রদর্শনীর জন্যে নিয়ে আসা পদ্ম ফুলের একটা বা বের করল। ওকে দিল ওটা। এই বাল্বটা তো চেন।
একটু ক্ষণের জন্যে ওটা দেখল সে। অবশ্যই। অমন অনেক যোগাড় করেছি আমরা।
এটার ভেতর অনেকগুলো পল্লা আছে, একটার ভেতর আরেকটা। মাঝখানে আছে ছোট শাঁস। মাথা দোলাল ফেন। বলে চলল তাইতা। আমাদের সারা দুনিয়াও এভাবে তৈরি। আমরা হলাম কেন্দ্রের শাঁস। আমাদের ঘিরে অস্তিত্বের অনেক স্তর রয়েছে যা আমরা দেখি না বা বুঝতে পারি না-যদি আমাদের সেই ক্ষমতা না থাকে। আমার কথা বুঝতে পারছ?
সাবধানে ফের মাথা দোলাল ও, তারপর আন্তরিক কণ্ঠে সায় দিয়ে বলল, না, বুঝিনি, তাইতা।
ঘুমানোর সময় স্বপ্ন দেখ না, ফেন?
হ্যাঁ, দেখি তো! উৎসাহের সাথে বলল ফেন। অনেক সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন! আমাকে তা অনেক খুশি ও প্রাণবন্ত করে তোলে। অনেক সময় স্বপ্নে পাখির মতো উড়ে বেড়াই। অচেনা সুন্দর সব জায়গায় যাই। তারপরই হাসির জায়গা দখল করে নিল ভীতিকর অভিব্যক্তি। কিন্তু অনেক সময় এমন স্বপ্ন দেখি আমাকে যা ভয় পাইয়ে দেয়, বা দুঃখ দেয়।
