তখনও ওর উপর ঝাল ঝাড়ছিল তাইতা, এমন সময় ঝড়ের বেগে বেসিনের উপর দিয়ে ছুটে গেল উইন্ডস্মোক, ওর পিঠে উত্তেজনায় চিৎকার করছে ফেন। ওদের ঠিক পেছনেই ওয়ার্লউইন্ড। তাইতার সামনে এসে থামল ওটা। পিছলে ওটার পিঠ থেকে নেমে ওর দিকে ছুটে এলো ফেন। ওহ, তাইতা, আমাদের দেখেছ? দারুণ না? আমাকে নিয়ে তোমার গর্ব হচ্ছে না?
চোখ গরম করে ওর দিকে তাকাল তাইতা। এমন বিপজ্জজনক ও হদ্দ বোকামি আর করবে না, জীবনেও না। থতমত খেয়ে গেল সে। কাঁধ ঝুলে পড়ল, অশ্রু জমে উঠল চোখে। আড়ষ্টভাবে পিছু হটল তাইতা। তবে ভালোই হাঁকিয়েছ। তোমার জন্যে আমার গর্ব হচ্ছে।
ম্যাগাস বলতে চাইছেন তোমাকে ঠিক সৈনিকের মতো লাগছে, কিন্তু আমরা সবাই তোমার নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন্তিত ছিলাম, খুলে বলল মেরেন। কিন্তু আমাদের চিন্তার কোনও কারণ নেই। চট করে খুশি হয়ে উঠল ফেন। হাতের পিঠে চোখের পানি মুছল।
সত্যিই কি তাই বুঝিয়েছ, তাইতা? জানতে চাইল সে।
মনে হয়, গম্ভীরভাবে জবাব দিল ও।
সেদিন সন্ধ্যায় মাদুরে পায়ের উপর পা তুলে বসে আছে কেন। তেলের কুপির আলোয় গম্ভীর চোখে তাকাচ্ছে তাইতার দিকে। বুকের উপর হাত ভাঁজ করে শুয়ে আছে তাইতা, ওর দাড়ির গুচ্ছ বের হয়ে আছে। ঘুমের চেষ্টা করছে সে। তুমি কোনও দিন আমাকে ছেড়ে চলে যাবে না, সব সময় আমার সাথে থাকবে, তাই না, তাইতা?
হ্যাঁ, হাসল ও। আমি সব সময় তোমার সাথে থাকব।
খুব খুশি হলাম, সামনে ঝুঁকে ওর রূপালি দাড়িতে মুখ দাবাল ও। কী নরম, বলল ফিসফিস করে, মেঘের মতো। তারপর দিনের উত্তেজনা দখল করে নিল ওকে। ওর বুকে শরীর মেলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ও।
খানিকক্ষণ শুয়ে রইল তাইতা, ওর শ্বাসপ্রশ্বাসের শব্দ শুনতে লাগল। এত সুখ বেশি দিন টিকতে পারে না। বড় বেশি তীব্র।
*
পরদিন বেশ সকাল সকাল উঠে পড়ল ওরা। ধুরা পরিজ ও মেয়ারের দুধ দিয়ে নাশতা সেরে শুল্মের খোঁজে বনে চলে এলো। সংগ্রহের ঝুড়ি ভরে ওঠার পর ওকে ওদের প্রিয় পুকুরের দিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল তাইতা। উঁচু পাড়ে একসাথে বসে রইল। নিচে পুকুরের জলে ওদের ছায়া পড়ছে।
নিজের দিকে তাকাও, ফেন, বলল তাইতা। দেখ, কত সুন্দর হয়ে উঠেছ। কোনও রকম আগ্রহ ছাড়াই নিচের দিকে তাকাল ফেন। সাথে সাথে ওর দিকে পাল্টা তাকিয়ে থাকা চেহারা দেখে আকৃষ্ট হলো। হাঁটু গেড়ে সোজা হয়ে বসে নদীর দিকে ঝুঁকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। শেষে ফিসফিস করে বলে উঠল, আমার কোনজোড়া অনেক বড়, না?
তোমার কান ঠিক ফুলের পাপড়ির মতো, জবাব দিল তাইতা।
আমার একটা দাঁত বাঁকা।
খুবই সামান্য, তাতে বরং তোমার হাসি আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
আমার নাক?
এত নিখুঁত নাক আমি আর দেখিনি।
সত্যি?
সত্যি!
ওর দিকে ফিরে হাসল ও। তাই বলল, তোমার হাসি বন আলোকিত করে তুলেছে।
ওকে জড়িয়ে দরল সে, উষ্ণ দেহ; কিন্তু সহসা গালের উপর শীতল হাওয়ার স্পর্শ পেল তাইতা, যদিও ওদের মাথার উপর ঝুলে থাকা গাছের পাতা একটুও নড়েনি। শিউরে উঠল ও, কানের পর্দায় মৃদু তড়পাতে শুরু করেছে নাড়ী। ওরা আর এখন একা নয়।
ফেনকে রক্ষা করার ভঙ্গিতে বুকে চেপে ধরল ও। ওর কাঁধের উপর দিয়ে পুকুরের জলের দিকে তাকাল।
পানির তলের ঠিক নিচে একটা আলোড়ন দেখা যাচ্ছে, যেন গভীরে রাক্ষুসে মাগুর মাছ পাক খাচ্ছে। কিন্তু ওর কানের পর্দায় নাড়ীর স্পন্দন জোরাল হয়ে উঠেছে, ও বুঝতে পারছে ওটা মাছ নয়। ভালো করে তাকাল ও, নদীর গভীর অবর্তে শাপলা পাতার মতো তরঙ্গায়িত মনে হওয়া একটা আবছা ছায়া দেখতে পেল। ধীরে ধীরে জমাট বেঁধে মানুষের চেহারা নিল ছায়াটা। আলখেল্লা পরা অবয়বের অস্পষ্ট ছায়া: আলখেল্লার বিশাল টুপির নিচে ঢাকা পড়ে গেছে মাথাটা। ভাঁজের আড়ালে চোখ চালানোর প্রয়াস পেলো ও। কিন্তু ওখানে ছায়া ছাড়া কিছুই নেই।
ওর আড়ষ্ট ভাব টের পেয়ে ওর মুখের দিকে তাকাল ফেন। তারপর ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে চোখ ফেরাল। পুকুরের গভীরে দৃষ্টি চালাল ও। সভয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল: কী যেন আছে ওখানে। ও কথা বলার সময়ই উবে গেল ছায়াটা। পুকুরের উপরিতল ফের প্রশান্ত হয়ে উঠল। কী ছিল ওটা, তাইতা? জানতে চাইল ফেন।
কী দেখেছো তুমি?
পুকুরের পানির নিচে কে যেন।
একটুও অবাক হলো না তাইতা, কারণ মেয়েটার এই ক্ষমতা থাকার কথা আগাগোড়া জানা ছিল ওর। এই প্রথম তার প্রমাণ রাখছে ও।
পরিষ্কার দেখেছ? ওর মনে আগেই কোনও একটা ধারণা দিতে চাইল না।
দেখলাম পানির নিচে কে যেন, সম্পূর্ণ কালো পোশাক পরা…কিন্তু মুখ ছিল না ওটার। পুরো দৃশ্যটাই দেখেছে ও, ভগ্নাংশ নয়। সাথে করে নিয়ে আসা মানসিক শক্তি খুবই জোরাল। মেরেনের সাথে যেভাবে কাজ করতে পেরেছে, সেভাবে এর সাথেও কাজ করতে পারবে। ক্ষমতা আরও বাড়ানোর ব্যাপারে ওকে সাহায্য করতে পারবে। ওর ইচ্ছাশক্তিকে বশ মানাতে পারবে।
ওটা দেখে তোমার কী মনে হয়েছে?
শীতলতা, ফিসফিস করে বলল সে।
কোনও গন্ধ পেয়েছো?
বিড়ালের-না, সাপের গন্ধ: ঠিক নিশ্চিত নই, তবে জানি গন্ধটা খারাপ। ওকে আঁকড়ে ধরল সে। কে ওটা?
ডাইনীর গন্ধ পেয়েছো তুমি। ওর কাছে কিছুই লুকোবে না। ওর দেহ শিশুর, কিন্তু সেখানে ধারণ করছে শক্তিশালী প্রতিরোধ সম্পন্ন নারীর আত্মা ও মন। ওকে আড়াল দিয়ে রাখার প্রয়োজন নেই। বিশেষ ক্ষমতা ছাড়াও অন্য জীবনে সঞ্চিত শক্তি ও অভিজ্ঞার ভাণ্ডার রয়েছে ওর। ওকে কেবল ওর মনের সেই মজবুত ঘরটির চাবির সন্ধান করতে সাহায্য করতে হবে ওকে, যেখানে এইসব অমূল্য রত্ন জমা আছে।
