ভাষার উপর ওর দখল ভয়ানক থেকে দুর্বল পর্যায়ে উঠে এসে তারপর ভালো এবং শেষে নিখুঁত হয়ে উঠেছে। শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়েছে, মনের ভাব প্রকাশে এখন সঠিক শব্দ চয়ন করতে পারছে, বা কোনও একটা বিষয়ের নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারছে। অচিরেই তাইতার সাথে শব্দের খেলায় মেতে উঠতে পারল ও। ছন্দ তৈরি, হেঁয়ালি করা আর অনুপ্রাসে আমোদিত করে তুলল তাইতাকে।
শেখার জন্যে ফেনের তৃষ্ণা অশেষ। মন অন্য কিছুতে ব্যস্ত না থাকলে একঘেয়ে, কঠিন হয়ে পড়ে সে। তাইতার দেওয়া কোনও কাজ বোঝার চেষ্টায় থাকার সময় মিষ্টি ও সহজে সামালযোগ্য থাকে। প্রায় রোজই ওর জন্যে নতুন চ্যালেঞ্জের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে তাইতাকে।
নদীর তীরের কাদা দিয়ে লেখার ফলক বানিয়েছে ও। ওকে হিয়েরোগ্রাফিক লিপি শেখানো শুরু করেছে। ওদের কুঁড়ের দরজার বাইরে শক্ত মাটির একটা বাও বোর্ড বসিয়েছে ও। ঘুটি হিসাবে রঙিন পাথর বেছে নিয়েছে। কয়েক দিন পরে মূল নীতিমালা শিখে নিল সে। অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে সাতের নিয়ম, তারপর দুর্গ সংহত করার কৌশল শেখাল। মেরেনকে যেদিন চরম লজ্জায় ফেলে দর্শকদের খুশি করে তিন দানের দুটোতে সরাসরি হারাল, মনে রাখার মতো একটা দিন ছিল সেটা।
সল্টওর্ট ঝোঁপের ছাই দিয়ে শিকারীদের আনা পশুর চর্বিকে সাবানে পরিণত করল তাইতা। তার উদার ব্যবহারে ফেনের শরীর থেকে রঙ ও অন্যান্য নামহীন পদার্থের অবশিষ্ট নাছোড়বান্দা দাগও উঠে গেল: যেসব রঙে ওর পালক মা রাঙিয়েছিল ওকে।
তাইতার নিজস্ব মলম আর নিরলস প্রয়াসে ওর মাথার চুলের শেষ উকুনগুলোও উৎখাত হলো। এক ধরনের ক্রিমের মতো নির্মল চেহারা নিল ওর ত্বক, রোদ লাগা জায়গাগুলো জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো। বেড়ে উঠল ওর মাথার চুল। অবশেষে কান ঢাকা পড়ল; চকচকে আভাময় মুকুটে পরিণত হলো। ওর চোখজোড়া এখনও সবুজ ও ডাগড় ডাগড় থাকলেও এখন আর অন্যান্য সূক্ষ্ম বৈশিষ্টকে চাপা দিচ্ছে না, বরং সম্পূরক হয়ে বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাইতার নিষ্পলক চোখের সামনে অন্য জীবনে যেমন ছিল তেমনি অসাধারণ সুন্দরী হয়ে উঠল ও।
যখনই ওর দিকে চোখ ফেরায় বা রাতে ওর পাশের মাদুরে ঘুমানোর সময় মৃদু শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দ কান পেতে শোনে, ভবিষ্যতের গর্ভে কী আছে ভেবে ওর সব আনন্দ ভয়ের কাছে মাথা নত করে। সূক্ষ্মভাবে ও সজাগ যে, অল্প কয়েক বছরের ভেতরই নারীতে পরিণত হবে সে, এবং ওর প্রবৃত্তি এমন কিছু দাবি করে বসবে যা দেওয়ার ক্ষমতা ওর নেই। তখন অন্য কোথাও খোঁজ করতে প্ররোচিত হবে সে, এমন একজন পুরুষের যে ওর সীমাহীন নারীসুলভ চাহিদা পূরণ করতে পারবে। ওর জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো অন্যের বাহুডোরে ধরা দিতে দেখতে হবে ওকে, হারানো প্রেমের তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।
ভবিষ্যতই নিজের ব্যবস্থা নেবে। আজ ওকে কাছে পেয়েছি। তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হবে, আপন মনে বলে ও। নিজের শঙ্কাটুকু দূরে ঠেলে দেয়।
চারপাশের সবাই ওর অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও সে সম্পর্কে মোটেই সজাগ নয় ফেন। নির্বিকার কমনীয়তা ও বন্ধুত্ব দিয়ে ওদের অতিপ্রশংসার জবাব দেয় ও, তবে মুক্ত প্রাণ রয়ে যায়। তাইতার জন্যে ওর সব দুর্বলতা তুলে রেখেছে।
*
উইন্ডস্মোকও ফেনের মায়ায় ধরা দেওয়া আরেকটা প্রাণী মাত্র। তাইতা ৩রসায়ন বা ধ্যানে মগ্ন থাকলে ওর খোঁজে চারণভূমিতে চলে আসে ফেন। ওর পিঠে ওঠার জন্যে ওকে ওর কেশর ব্যবহার করার সুযোগ দেয় মেয়ারটা, তারপর ঘোড়া হাঁকানোর সবক দেয়। প্রথমে শিথিল হাঁটার চেয়ে বেশি জোরে ছোটে না সে। ফেনের তাগিদ সত্ত্বেও সওয়ারির ভারসাম্য ঠিক আছে কিনা, সে ঠিক মতো বসেছে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দুলকি চালে ছোটে না। অল্প কয়েক সপ্তাহর ভেতরই ফেনকে সহজ কদমে ছোটার কায়দার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল সে। শরীরের পাশে ছোট ছোট পায়ের খোঁচা অগ্রাহ্য করে গেল। ওর চড়া গলার তাগিদ আর হৈ ছোট! আবেদন উপেক্ষা করল। তারপর এক বিকেলে, ওদের কুঁড়ের দরজায় বসে ঝিমোচ্ছিল তাইতা, ঘোড়ার যারীবার দিকে এগিয়ে গেল ফেন, ধূসর মেয়ারের পিঠে চেপে বসল ও। যারীবার গেটে ওটার কাঁধের পেছনে পায়ের আঙুলে খোঁচা মারল ফেন। মসৃণ, লম্বা পায়ে দুলকি চালে ছুটতে শুরু করল উইন্ডস্মোক। ওরা সাভানাহ ঘাসের বাগানে এসে পৌঁছার পর ফের মেয়রকে তাগিদ দিল ফেন। দুলকি চালে চলার গতি বাড়াল ওটা। ওটার ঠিক কেশরের পেছনেই বসেছে ফেন, শরীরের ভর বেশ সামনের দিকে, দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে রয়েছে, উইন্ডস্মোকের প্রতটি পদক্ষেপের সাথে তাল মেলাচ্ছে। তারপর, জানোয়ারটার সহযোগিতার আশায় কেশরের একটা গুচ্ছ মুঠি করে ধরে চিৎকার করে উঠল ফেন, চলো, প্রিয়া আমার, দূরে চলে যাই। সাথে সাথে ওর শরীরের নিচে প্রায় পুরো গতি আর ক্ষমতা ছেড়ে দিল উইন্ডস্মোক। অনায়াসে ওকে অনুসরণ করল ওয়ার্লউইন্ড। উৎফুল্ল মনে পার হয়ে এলো ওরা খোলা ঘেসো জমির বেসিন।
লোকজনের চিৎকারে জেগে উঠল তাইতা। দৌড়া, উইন্ডস্মোক, দৌড়া! হাঁকাও, ফেন, হাঁকাও!
ঠিক সময় মতোই গেটে চলে এলো ও, দূরে ত্রয়ীকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখল সময় মতোই। কার উপর প্রথম রাগ ঝাড়বে বুঝতে পারল না।
ঠিক এই মুহূর্তটাকেই চিৎকার করার জন্যে বেছে নিল মেরেন। সেথের বাতাসের বিকট শব্দের দোহাই, সৈনিকের মতোই ছুটছে ও! ফলে নিজেকেই ওর রাগের লক্ষ্যে পরিণত করল।
