নদীর তীরে উর্বর ও সমৃদ্ধ জমিন পরিষ্কার করে লাঙল দিয়েছে ওরা। চরে বেড়ানো পশুদের দূরে সরিয়ে রাখতে ওটাকে ঘিরে আরেকটা কাঁটা ঝোঁপের বেড়া তৈরি করেছে। একটা একটা করে বস্তা থেকে ধুরা বীজ বের করে আভা দেখে শক্তিশালীগুলো রেখে দিচ্ছে তাইতা; দুর্বল, রোগাক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্তগুলো ফেলে দিয়ে চাষ দেওয়া জমিনে রোপন করেছে। নদী থেকে পানি তুলে জমিতে সেঁচ দিতে একটা শাদুফ বানিয়েছে তাইতা। কয়েক দিনের মধ্যেই মাটি ভেদ করে প্রথম সবুজ চাড়া মাথা চাড়া দিল। পরের কয়েক মাসের ভেতর শস্য পাকবে। ক্ষেত পাহারা দিতে একজন রক্ষী নির্ধারিত করে দিল মেরেন। ঘোড়া ও যেকোনও বুনো জানোয়ার তাড়াতে ঢোল বাজায় সৈনিকরা। যারীবা ঘিরে প্রতিরক্ষা আগুন তৈরি করল ওরা। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা করল। রোজ সকালে গোড়া ও খচ্চরগুলো একসাথে বেঁধে চারণভূমির রসাল ঘাসে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানে ঘাস খেয়ে দ্রুত চাঙা হয়ে উঠল ওরা।
মালভূমিতে শিকারের অভাব নেই। রোজ শিকারীদের একটা দল নিয়ে বের হয়ে যায় মেরেন, অ্যান্টিলোপ ও অন্যান্য বুনো প্রাণীর মাংসে ব্যাগ ভর্তি করে ফিরে আসে। আগাছা দিয়ে মাছ ধরার ফাঁদ বুনেছে ওরা। নদীর পুকুরের মুখে ওগুলো পেতে রেখেছে। অসংখ্য মাছ ধরা পড়ছে ফাঁদে। রোজ রাতেই হরিণের মাংস আর টাটকা মাগুর মাছ দিয়ে ভোজপর্ব সারছে ওরা। মাংসের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুধা দেখিয়ে ওদের রীতিমতো বিস্মিত করে দিয়েছে ফেন।
এখানকার মালভূমির বেশির ভাগ গাছপালা, গুল্মের সাথে আগে থেকেই পরিচয় আছে তাইতার। ইথিওপিয়ার উঁচু এলাকায় থাকার সময় এগুলোর সাথে ওর পরিচয়। সংগ্রহকারী দলকে পুষ্টিকর গাছগাছালি চিনিয়ে দিয়েছে ও। ওরই নির্দেশনায় নদীর তীর বরাবর জন্মানো বুনো পুদিনা পাতা যোগাড় করেছে ওরা। বিপুলভাবে জন্মানো ইউফোরবিয়াসেয়াসের শেকড়ও খুঁড়ে বের করেছে। ওগুলো সেদ্ধ করে পুষ্টিকর পরিজে পরিণত করেছে; প্রয়োজনীয় খাবার হিসারে ধুরার স্থান দখল করেছে।
ভোরের শীতল, মিষ্টি হাওয়ায় বনে চলে যায় তাইতা ও ফেন; ঝুড়ি ভর্তি ভেষজ গুণসমৃদ্ধ পাতা ও বেরি, শেকড় ও ভেজা টাটকা বাকলের টুকরো আনবে বলে। গরম অস্বস্তিকর হয়ে উঠলে শিবিরে ফিরে এসে সংগৃহীত রসদের খানিকটা সেদ্ধ কিংবা রোদে শুকিয়ে নেয়। আর অন্যান্য উপকরণ বেটে গুড়ো বা মণ্ডে পরিণত করে। ওদের তৈরি আরকে মানুষ ও পশুর রোগের চিকিৎসা করে তাই।
একটা বিশেষ কাটা ঝোঁপের সেদ্ধ করা বাকলের নির্যাস খুবই তেতো, জিভ অবশ করে দেয়, চোখ জ্বালা ধরায়, দম আটকে দেয়। যাদের ভেতর এখনও জলাভূমির রোগের আলামত রয়ে গেছে তাদের উপর ওটা পরিমিত প্রয়োগ করল তাইতা। ওরা সেটা গিলতে গিয়ে বিষম খাওয়ার সময় পাশে দাঁড়িয়ে উৎসাহ যোগাল ফেন। ভালো, শাবাকো। চালাক শাবাকো। কেউই ওর তোষামোদ ঠেকাতে পারল না। তেতো ওষুধ মুখে নিয়ে গিলে ফেলল। দ্রুত সম্পূর্ণ সেরে উঠল সবাই।
বাকলের গুঁড়ো ও ছোট মামুলি গুল্মের বীজে থেকে শক্তিশালী এক ধরনের জোলাপ তৈরি করল তাইতা। সবাই ধরে নিয়েছিল নাকোন্তোর পেট পাথরের মতো কষা হয়ে গেছে; সেও ফলাফলে খুশি হয়ে উঠল। ওটার ডোজ নিতে রোজ তাইতার কাছে আসছে সে। শেষ পর্যন্ত রোজ এক দফা ওষুধ খাওয়ার নিয়ম বেঁধে দিতে বাধ্য হলো তাই।
ফেনের খিদে সত্ত্বেও হাড় জিরজিরেই রয়েছে ও। ওর পেট শক্ত, চোপসানো। সেদ্ধ বাকলের আরেকটা আরক তৈরি করল তাইতা, ওকে সাহায্য করল ফেন। ওকে ওটা খেতে সাধলে একটা চুমক দিল সে। তারপরই সটকে পড়ল। ছুটে পালাচ্ছিল জোরে, কিন্তু ওর এমন আচরণের প্রস্তুত ছিল তাইতা। দুই দিনেরও বেশি স্থায়ী হলে পরবর্তী ইচ্ছাশক্তির লড়াই। ফল নিয়ে বাজি ধরল সবাই। শেষে তাইতাই জিতল। কোনও রকম মস্তাত্ত্বিক প্রয়াস ছাড়াই শেষে পুরো ডোজ খেল ফেন। ওর বেলায় অমন কিছু করতে চায়নি তাই। ওর বদ মেজাজ অব্যাহত ছিল পরদিনও, যতক্ষণ না ওকে অবাক করে ওর পেট থেকে প্রায় ওর মাথার সমান কিলবিলে শাদা আন্ত্রিক কৃমির একটা দলা বের হয়ে এলো। এই সাফল্যে দারুণভাবে গর্বিত বোধ করল সে। প্রথমে তাইতা, তারপর সবার কাছে স্বীকার গেল। ওরা সবাই জুৎসইভাবে মুগ্ধ হলো, প্রকাশ্যে সায় দিয়ে বলল যে ফেন আসলেই চালাক, সাহসী মেয়ে। কয়েক দিনের ভেতর ওর পেট অনেক সুখকর বাঁক পেল। ওর হাত-পা ভরাট হয়ে উঠতে শুরু করল। দেখার মতো হয়ে উঠল ওর শারীরিক বিকাশ। ওর কয়েক মাসের বৃদ্ধি পেতে সাধারণ মেয়েদের বেলায় হয়তো কয়েক বছর লাগবে। তাইতার মনে হচ্ছে, মেয়েটা বেড়ে উঠছে, ওর চোখের সামনে যুবতীতে পরিণত হচ্ছে।
ও সাধারণ শিশু নয়, আপনমনে ব্যাখ্যা করল ও। দেবী ও রানির অবতার। এব্যাপারে কখনও এতটুকু সন্দেহ মনে জাগলেই ওকে কেবল অন্তর্চক্ষু খুলে ওর আভার দিকে তাকালেই হয়। ওই আভার চমক স্বর্গীয়।
তোমার সুন্দর হাসি ঘোড়াকে চমকে দেবে, ওকে বলল তাইতা, চওড়া হেসে এক কালের কালো দাঁত দেখাল ফেন। ওর দাঁত লবনের মতো শাদা ও নিখুঁত। সবুজ রঙের গাছের ডাল বেছে ওটার আঁশ চিবুনোর কায়দা শিখিয়েছে দিয়েছ তাইতা; একটা ঝোঁপ চিনিয়ে দিয়ে দাঁত মাজা ও নিঃশ্বাস সুবাসিত করার বুদ্ধি বাতলে দিয়েছে। স্বাদটা ওর পছন্দ হয়েছে, দৈনিক রেওয়াজ থেকে কখনও পিছিয়ে যায়নি।
