জবাব দেওয়ার আগে চাচাত ভাইয়ের সাথে পরামর্শ করল নাকোন্তা। পুব দিকে বেশ কয়েক দিনের পথে একটা পাহাড়ী এলাকা আছে। ওখানে ঘাস মিষ্টি, সন্ধ্যায় পাহাড় থেকে শীতল হাওয়া ভেসে আসে। গরমকালে ওখানে গরু-ছাগল চরাতে অভ্যস্ত ছিলাম আমরা, বলল সে।
আমাদের পথ দেখাও, বলল তাইতা।
পর দিন বেশ সকাল সকাল রওয়ানা হলো ওরা। উইন্ডস্মোকের পিঠে সওয়ার হওয়ার পর হাত বাড়িয়ে ফেনের বাহু ধরে ওকে পেছনে তুলে নিল তাইতা। ওর মুখের অভিব্যক্তি থেকে বুঝতে পাল, অভিজ্ঞতাটুকু ভীত করে তুলেছে ওকে, তবে দুহাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরল সে; ওর পীঠে মুখ দাবিয়ে আঁটুলির মতো আঁকড়ে থাকল। ওকে সান্ত্বনা দেওয়ার ঢঙে কথা বলল তাইতা। এক লীগের মতো দূরত্ব অতিক্রম করার পর শক্ত বাঁধন শিথিল করে উঁচু অবস্থান থেকে চারপাশে তাকাতে লাগল সে। আরও এক লীগ পার হওয়ার পর আনন্দ ও কৌতূহলে বকবক শুরু করে দিল। তাইতা সাথে সাথে জবাব না দিলে ওর পিঠে ছোট মুঠি দিয়ে কিল মারছে, নাম ধরে ডাকছে ওকে, তাইতা! তাইতা, তারপর ইঙ্গিতে ওর মনোযোগ আকর্ষণ করা জিনিসটা দেখাচ্ছে।
গাছ, জবাব দিচ্ছে ও, বা পাখি, কিংবা ঘোড়া, বা বড় পাখি।
বড় পাখি, পুনরাবৃত্তি করছে সে। চট করে শিখে নিচ্ছে, ওর শ্রবণশক্তি প্রখর। একবার দুবারের চেষ্টাতেই যেকোনও শব্দ তুলে নিতে পারছে। নিখুঁতভাবে উচ্চারণ করছে। একবার শেখার পর আর ভুলছে না। তৃতীয় দিন নাগাদ বিভিন্ন শব্দ দিয়ে সহজ বাক্য তৈরি শিখে গেল সে, বড় পাখি উড়ছে, বড় পাখি জোরে ওড়ে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। অনেক চালাক তুমি, ফেন, ওকে বলেছে তাইতা। মনে হচ্ছে যেন এককালে অনেক ভালো করে ভুলে যাওয়া জানা কিছু ফের মনে করতে শুরু করেছ। এখন দ্রুত মনে পড়ছে, তাই না?
মনোযোগ দিয়ে শুনছে সে, তারপর এরইমধ্যে শেখা শব্দগুলো বেছে নিয়ে ঝঙ্কারের মতো উচ্চারণ করছে আবার: হ্যাঁ, হ্যাঁ, চালাক ফেন। দ্রুত আসছে, দ্রুত। তারপর মেয়ারের পিছন পিছন আসতে থাকা ঘোড়ার বাচ্চা ওয়ার্লউইন্ডের দিকে তাকাচ্ছে: ছোট ঘোড়া জোরে আসছে!
ঘোড়ার বাচ্চাটা মুগ্ধ করে রেখেছে ওকে। ওয়ার্লউইন্ড নামটা কঠিন ঠেকেছে ওর কাছে, তাই ছোট ঘোড়া ডাকছে। শিবির খাটাতে স্যাডল ছাড়ার পরপরই চেঁচিয়ে উঠল সে, এসো। ছোট ঘোড়া। বাচ্চাটা যেন তাইতার মতো ওর সঙ্গও উপভোগ করতে শুরু করেছে। কাছে এসে গলায় হাত প্যাচানোর সুযোগ করে দিল ওকে। ফেন ওকে এমনভাবে কাছে টেনে নিল যেন মায়ের জঠরে জোড়া লাগা যমজ। লোকজনকে অন্য ঘোড়াগুলোকে ধুরা শস্য খাওয়াতে দেখল ও। তো কিছু শস্য চুরি করে খাওয়ানোর প্রয়াস পেল ওটাকে। কিন্তু ঘোড়াটা প্রত্যাখ্যান করায় ক্ষেপে গেল। পচা ঘোড়া! ভৎর্সনা করল ও। পচা ঘোট ঘোড়া!
অচিরেই সবার নাম জেনে ফেলল সে। সবার অগে মেরেনের নাম, ওকে রিবন দিয়েছে, সব সময় বিশেষ প্রশ্রয় দিচ্ছে। অন্যরা ওর মনোযোগ লাভ করতে প্রতিযোগিতা করছে। ওদের সামান্য বরাদ্দ থেকেই ওর জন্যে এটা ওটা বাঁচিয়ে রাখছে, কুচকাওয়াজের গানের কথাও শিখিয়েছে: ও বেশ কিছু অশ্লীল কোরাস গাওয়ার পর এতে বাদ সেধেছে তাই। ওকে ছোটখাট উপহার দিয়েছে ওরা। উজ্জ্বল পাখা, সজারুর কাঁটা আর পার হয়ে আসা শুকনো নদীর তলদেশে উঠে আসা রঙিন নুড়ি পাথর।
কিন্তু কলামের অগ্রগতি খুব ধীর। মানুষ বা পশু কোনওটাই পুরো দিন চলতে পারছে না। দেরি করে শুরু করছে ওরা, আগে ভাগে থামছে। ঘনঘন বিরতি দিচ্ছে। আরও তিনজন সৈনিক প্রাণ হারিয়েছে জলাভূমির রোগে, বাকিদের বলতে গেলে কবর খোঁড়ারও শক্তি নেই। ঘোড়াগুলোর ভেতর উইন্ডস্মোক আর ওর বাচ্চাটাই সবচেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। মেয়ারের পেছনের বর্শার আঘাত পুরোপুরি সেরে গেছে, যাত্রার প্রবল ধকল সত্ত্বেও তার দুধ বহাল তবিয়তে আছে, এখনও ওয়ার্লউইন্ডকে খাওয়াতে পারছে।
একদিন বিকেলে শিবির খাটাল ওরা, দিগন্ত তখন ধূলি আর তাপ তরঙ্গে ঘোলাটে হয়ে গেছে। কিন্তু ভোরে দেখা গেল রাতের ঠাণ্ডা বাতাস সব পরিষ্কার করে দিয়েছে, দূরে পাহাড়ের নীল নিচু রেখা দেখতে পেল ওরা। ওরা সেদিকে এগিয়ে যেতে শুরু করতেই পাহাড়গুলো ক্রমশঃ উঁচু হয়ে উঠতে শুরু করল, আমন্ত্রণ জানাতে লাগল বিস্তৃত দৃশ্য। জলাভূমি ছেড়ে আসার অষ্টম দিন একটা বিরাট ম্যাসিফের পাদদেশে পৌঁছাল ওরা। ঢালগুলো হালকাভাবে গাছে ছাওয়া, অসংখ্য রেভাইনে ভরা, ওগুলো বেয়ে গড়িয়ে নেমে এসেছে ঝর্না ও প্রবল জলপ্রপাত। একটা জলধারা অনুসরণ করে অনেক কষ্টে উপরে উঠতে লাগল ওরা, অবশেষে একটা বিস্তৃত মালভূমিতে উঠে এলো।
এখানে বাতাস অনেক টাটকা, শীতল। স্বস্তি ও আনন্দের সাথে ফুসফুস ভরে শ্বাস নিল ওরা, চারপাশে নজর চালাল। ঘাসের সমতলে চমৎকার গাছপালার বন চোখে পড়ল। তৃণভূমিতে অসংখ্য অ্যান্টিলোপ ও ডোরা কাটা বুনো পশু চরে বেড়াচ্ছে। জনমনিষ্যির চিহ্ন নেই কোথাও। অজানা, হাতছানি দেওয়া বুনো প্রান্তর।
প্রবহমান বাতাস, সূর্যের অবস্থান, প্রবহমান জলের নৈকট্য ও ঘোড়ার জন্যে চারণভূমি সবদিক বিবেচনা করে শিবিরের জন্যে জায়গা বাছাই করল তাইতা। খুঁটি ও ছাদের জন্যে ঘাস কেটে আরামদায়ক ঘর বানাল ওরা। তীক্ষ্ণ ডগা ও মোটা খুঁটি দিয়ে বসতির চারপাশে সীমানা প্রাচীর-যারীবা-তৈরি করল ওরা, ওটার একপ্রান্তকে ঘোড়া ও খচ্চরের জন্যে আলাদা খোঁয়াড়ে পরিণত করল। রোজ সন্ধ্যায় চারণভূমিতে নিয়ে আসে ওদের, তারপর রাতে খুনে বাঘ ও বর্বর মানুষের হাত থেকে বাঁচাতে আটকে রাখে ওখানে।
