কথাটা মনে হয় আরেকবার বলতে পারি, পরস্পরকে ভালো করেই চিনি আমরা। মেয়েটা ওকে পরিষ্কার করার পর ভেবেচিন্তে বলল তাইতা।
তাইতা! নিজের বুক ছুঁয়ে বলল ও। গম্ভীরভাবে ওর দিকে তাকিয়ে রইল মেয়েটা। তাইতা। ভঙ্গিটা পুনরাবৃত্তি করল ও।
বুঝতে পারল মেয়েটা। তাইতা! আঙুল দিয়ে ওর বুকে খোঁচা দিল। তারপর নিজের ক্ষীণ বুকে চাপড় দিল।খোনা মানযি! বলল সে।
না! বাদ সাধল তাই।ফেন!
ফেন? অনিশ্চিতভাবে পুনরাবৃত্তি করল সে। ফেন? নিখুঁত উচ্চারণ। যেন মিশরিয় ভাষায় কথা বলতেই জন্ম হয়েছে ওর। এক মুহূর্ত ভেবে হেসে সায় দিল। ফেন!
বাক-হার! বুদ্ধিমতী, ফেন!
বাক-হার, অনুগতের মতো পুনরাবৃত্তি করল সে। বুদ্ধিমতী, ফেন। ওর হঁচড়েপাকামো আবার বিস্মিত, প্রফুল্ল করে তুলল ওকে।
*
ওরা শিবিরে ফেরার পর মেরেন ও অন্য পুরুষরা অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল ফেনের দিকে, যদিও তেমনটা না করারই নির্দেশ ছিল ওদের উপর।
মিষ্টি আইসিস, এ যে দেখছি আমাদেরই একজন, বলে উঠল মেরেন।
মোটেই বর্বর না, যদিও তেমনই আচরণ করছে। ও মিশরিয়। স্যাডল ব্যাগ হাতড়াতে গিয়ে একটা বাড়তি টিউনিক খুঁজে পেয়ে তাইতার কাছে নিয়ে এলো ওটা।
পরিষ্কারই বলা চলে, ব্যাখ্যা করল সে। ওর পরিচয় লুকোতে কাজ দেবে।
পোশাকটার দিকে এমনভাবে তাকাল ফেন, যেন সাপের মতো বিষাক্ত। নগ্নতায় অভ্যস্ত বলে তাইতা ওটা ওর মাথার উপরে ধরতেই পালানোর চেষ্টা করল। টিউনিকটা বেশ লম্বা, স্কুল প্রায় গোড়ালিতে নেমে এলো। কিন্তু চারপাশে জড়ো হয়ে জোর গলায় অনুমোদন আর তারিফ করল লোকজন। খানিকটা খুশি হয়ে উঠল মেয়েটা।
মনে প্রাণে নারী, হেসে বলল তাইতা।
সত্যিই নারী, সায় দিল মেরেন, তারপর স্যাডল-ব্যাগের কাছে ফিরে গেল। একটা রঙিন সুন্দর রিবন বের করে নিয়ে এলো ওর কাছে। নারী-প্রেমিক মেরেন সব সময় সাথে এমনি মামুলি কিছু জিনিস রাখে। চলার পথে পরিচয় হওয়া বিপরীত লিঙ্গের সাথে সাময়িক সম্পর্ক পাতার বেলায় বেশ কাজ দেয়। টিউনিকের ঝুল যাতে মাটিতে গাড়াগাড়ি না খায় সেজন্যে একটা রিবন দিয়ে ওর কোমরে বো বেঁধে দিল ও। ঘাড় কাত করে এর প্রভাব দেখতে লাগল ফেন।
ওর গর্বের ভাবটা একবার দেখ, হাসল ওরা। মেয়েটা খুব বিশ্রী, এটাই সবচেয়ে দুঃখের বিষয়।
সেটা বদলে যাবে, কথা দিল তাইতা। মেয়েটা আগের জন্মে কত সুন্দর ছিল, ভাবল।
*
পরদিন মাঝসকালের দিকে মৃত লু-দের লাশগুলো পচে ফুলে উঠল। এমনকি বেশ দূর থেকেও পচা দুর্গন্ধ এত প্রকট হয়ে উঠল যে তাঁবু সরিয়ে নিতে বাধ্য হলো ওরা। শিবির গোটানোর আগে রেখে আসা লোকজন আর ঘোড়া ফিরিয়ে আনতে নোন্তুকে আবার প্যাপিরাসের বনে পাঠাল তাইতা। তারপর মেরেনকে নিয়ে বন্দি লু নারীদের দেখতে গেল। গ্রামের কেন্দ্রে এখনও পাহারায় রয়েছে ওরা, দড়িতে বাঁধা, নগ্ন কাহিল অবস্থায় জোড়াসড়ো।
আমাদের সাথে ওদের নেওয়া যাবে না, যুক্তি দেখাল মেরেন। ওদের দিয়ে আমাদের আর কাজ নেই। এমনই জানোয়ার ওরা যে, এমনকি পুরুষদের আনন্দ দেওয়ার কাজেও লাগবে না। ওদের শেষ করে ফেলতে হবে। আমাকে সাহায্য করার জন্যে লোকজন ডাকব? বেশি সময় লাগবে না। খাপের তরবারি শিথিল করে নিল সে।
ছেড়ে দাও ওদের, নির্দেশ দিল তাইতা।
বিহ্বল দেখাল মেরেনকে। সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না, ম্যাগাস। আমাদের ঘোড়া চুরি আর উত্যক্ত করতে জলাভূমি থেকে ভাইবেরাদারদের ডেকে আনবে না, তার কোনও নিশ্চিয়তা নেই।
ছেড়ে দাও, আবার বলল তাইতা।
ওদের কব্জি ও গোড়ালির বাঁধন কেটে দেওয়ার পরও পালানোর চেষ্টা করল না মেয়েরা। ভীষণ হুমকি ও মারাত্মক একটা ভাষণ ঝাড়তে হলো নাকোন্তোকে, তারপর বর্শা হাঁকিয়ে তেড়ে গেল ওদের দিকে, মুখে যুদ্ধের হুঙ্কার ছাড়ল, তারপর যার যার বাচ্চা কোলে নিয়ে বিলাপ ছেড়ে বনের দিকে পালাল ওরা।
ঘোড়া বোঝাই করে জলাভূমির কিনারা ধরে আরও দুই লীগ সামনে বাড়ল ওরা, তারপর ছায়াময় গাছের একটা বনে শিবির করল আবার। অন্ধকার ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে উড়ে আসা পোকামাকড়ের দল নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার শুরু করল।
একদিন পরে অবশিষ্ট ঘোড়া ও জীবিতদের জলাভুমি থেকে বের করে আনল নোম্ভ। দায়িত্বে ছিল শাবাকো, তাইতা ও মেরেনের কাছে রিপোর্ট করতে এলো সে। ভালো খবর নেই তার কাছে: ওরা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর আরও পাঁচজন সৈনিকের মৃত্যু ঘটেছে। শাবাকোসহ বাকি সবাই অসুস্থ, দুর্বল; বিনা সাহায্যে ঘোড়ায় চাপতে পারবে না কেউ। জানোয়ারগুলোর অবস্থাও এরচেয়ে ভালো না। জলাভূমির ঘাস ও জলজ উদ্ভিদ তেমন একটা পুষ্টি যোগায়নি। বদ্ধ পানি থেকে পেটে পরজীবী তুলে নিয়েছে কয়েকটা। শাদা কৃমির দলা আর বটফ্লাই শুটকীট পায়খানা করছে।
পোকামাকড় ভরা এই জায়গায় থাকলে আরও মানুষ ও পশু হারানোর ভয় করছি আমি, উদ্বিগ্ন বোধ করল তাইতা। ঘাস টক, পচা গন্ধঅলা, এসব খেয়ে ঘোড়ার স্বাস্থ্য ভালো হবে না। আমাদের ধুরার মওজুদও প্রায় শেষের পথে। মানুষের জন্যেই যথেষ্ট হবে না, পশুর কথা তো আরও পরে। সুস্থ-সবল হয়ে উঠতে আরও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ লাগবে আমাদের। নাকোন্তোকে কাছে ডাকল ও, জিজ্ঞেস করল, আশপাশে এর চেয়ে উঁচু জায়গা আছে?
