সেই মহিলা এখন কোথায়? জানতে চাইল তাইতা।
দুষ্ট বাচ্চাটার ডাকিনী বিদ্যার সাথে নিয়ে আসায় কী এক রোগে মারা গেছে।
সেজন্যেই ওকে গ্রাম ছাড়া করেছিলে?
শুধু এ-কারণে নয়। আমাদের উপর আরও অনেক দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। সে। ওর আসার মৌসুমেই গ্রামের পানি নষ্ট হয়; যে জলাভূমি আমাদের দেশ, শুকিয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে। দুষ্ট বাচ্চাটারই কাজ ছিল এটা। ক্রোধে বিজবিজ করতে লাগল মহিলা। আমাদের উপর রোগ বয়ে এনেছে সে, বাচ্চাদের অন্ধ করেছে, অনেক অল্প বয়সী মেয়েকে বন্ধ্যা আর আমাদের পুরুষদের নপুংসক করেছে।
এই একটা মেয়ের কারণে? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
মহিলার উত্তর তরজমা করে দিল নাকোন্তো। সাধারণ বাচ্চা নয় সে। শয়তান, ডাইনী। আমাদের গোপন জায়গায় শত্রুদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে, আমাদের বিরুদ্ধে জিতিয়ে দিয়েছে ওদের। ঠিক যেভাবে এখন আমাদের উপর আক্রমণ চালাতে তোমাদের নিয়ে এসেছে।
প্রথম বারের মতো কথা বলে উঠল ফেন। তিক্ত রাগে ভরা ওর কণ্ঠস্বর।
মহিলা মিথ্যে বলছে, বলছে সে। এসব কিছুই করেনি সে। মহিলাকে সে ভালোবাসত, ওর মা ছিল সে, তাকে ও হত্যা করেনি। একই রকম বিষাক্ত সুরে এই কথার জবাব দিল মহিলা। তারপর পরস্পরের উদ্দেশে চিৎকার শুরু করে দিল।
কিছুক্ষণ কিঞ্চিত আগ্রহের সাথে ওদের কথা শুনল তাইতা, তারপর নাকোন্তোকে বলল, মহিলাকে ফের গ্রামে নিয়ে যাও। বাচ্চাটার পক্ষে সুবিধার নয় সে।
হেসে উঠল নাকোন্তা। পোশ পশু হিসাবে একটা সিংহের বাচ্চা পেয়েছেন আপনি, প্রবীন জন। আমরা সবাই ওকে ভয় পেতে শিখব।
ওরা চলে যাবার পর শান্ত হয়ে এলো ফেন।
এসো, ওকে আমন্ত্রণ জানাল তাইতা। কথাগুলো না বুঝলেও অর্থ ধরতে পারল সে। সাথে সাথে উঠে দাঁড়াল। তাই সরে যেতেই দৌড়ে এলো ওর পিছন পিছন। আবার ওর হাত ধরল। এই অকপট ভঙ্গিতে গভীরভাবে আন্দোলিত হলো তাইতা। স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করল মেয়েটা। কিছু না বুঝলেও ওর কথার জবাব দিল তাইতা। স্যাডল ব্যাগের কাছে এসে অস্ত্রপচারের সরঞ্জামের চামড়ার ব্যাগটা খুঁজে বের করল ও। মেরেনের উদ্দেশে কথা বলতে একটু কেবল থামল বাকি লোকজন আর ঘোড়াগুলো জলাভূমি থেকে এখানে নিয়ে আসতে পাঠাও নোম্ভেকে। নাকোন্তোকে আমাদের সাথে রাখো, কারণ এখানে সে-ই আমাদের চোখ আর জিভ।
এবার ফেনকে সাথে করে জলাভূমির কিনারে এসে নিচে নেমে আগাছার মাঝে এক চিলতে খোলা জায়গা খুঁজে বের করল। জল ভেঙে কোমর সমান গভীর জলে নেমে গেল ও। কুসুম গরম পানিতে হাঁটু গেড়ে বসল। কৌতূহলের সাথে কিনারা থেকে ওকে লক্ষ করছে ফেন। তাইতা মাথার উপর দিয়ে আঁজলা ভর্তি পানি ছুঁড়ে দিতেই প্রথমবারের মতো হাসিতে ভেঙে পড়ল মেয়েটা।
এসো, ডাকল তাইতা। কোনও দ্বিধা ছাড়াই পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। ওকে পেছন ফিরিয়ে দুহাঁটুর মাঝখানে বসাল তাইতা; তারপর ওর মাথায় জল ঢালতে লাগল। নোংরা আবর্জনার মুখোশ গলে যেতে শুরু করল, গড়িয়ে পড়তে লাগল ওর ঘাড় আর কাঁধের উপর দিয়ে। আস্তে আস্তে উকুনের কামড়ের দাগঅলা ফ্যাকাশে ত্বক দেখা দিল এখানে ওখানে। ওর চুলের ময়লা পরিষ্কার করতে যেতেই জমাট আঠা ওর সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়ার যোগাড় করল। খুলির চুল ধরে টানাটানি করতেই খিলখিল করে হেসে প্রতিবাদ জানাল ফেন।বেশ, ভালো। পরে এর ব্যবস্থা করা যাবে। ওকে দাঁড় করিয়ে পুকুরের তলা থেকে মুঠি ভর্তি বালি নিয়ে ওর সারা শরীর ডলতে শুরু করল তাইতা। পাঁজরে সুরসুরি দিতেই হেসে উঠল সে, অনিচ্ছাভরে সরে যাওয়ার প্রয়াস পেল; কিন্তু তাই ওকে টেনে ধরার পরও হাসতে লাগল। ওর মনোযোগ উপভোগ করছে। অবশেষে যখন উপরের ময়লা পরিষ্কার করে ফেলল, অস্ত্রপচারের বান্ডিল থেকে একটা ব্রোঞ্জের খুর বের করে ওর মাথা কামাতে লেগে গেল। যারপরনাই যত্নের সাথে জট বাঁধা চুল মুড়িয়ে দিতে লাগল ও।
নিরাসক্তভাবে ব্যাপারটা মেনে নিল সে। ক্ষুরের পোঁচে চামড়া কেটে গেল; রক্ত বেরুল। জট বাঁধা চুল ভোঁতা করে দেওয়ায় একটু পরপর ক্ষুরে ধার দিতে হচ্ছে। থোকা থোকা চুল খসে পড়ছে। আস্তে আস্তে উন্মুক্ত হলো ফ্যাকাশে খুলি। অবশেষে কাজটা শেষ হলে ক্ষুরটা একপাশে নামিয়ে রেখে মেয়েটাকে জরিপ করল ও। তোমার কান কী বিরাট! বলে উঠল ও। সরু ঘাড়ের তুলনায় ওর মাথাটা অনেক বড় মনে হচ্ছে। সে তুলনায় চোখজোড়া আরও বড়। বাচ্চা হাতির মতো দুপাশে খুলির সাথে লেপ্টে আছে কানজোড়া। যেকোনও কোণ থেকে দেখ, যেমন আলোতে, তোমাকে সব রকম সন্দেহ থেকে মুক্তি দিলেও এখনও সেই কুৎসিত পিচ্চিই আছে। ওর কণ্ঠে দরদটা টের পেল সে। কালো দাঁত বের করে আস্থার হাসি দিল। চোখের পাতায় অশ্রুর রেখা টের পেল তাইতা। নিজের কথা ভাবল। শেষ কবে চোখের পানি ফেলেছ, নির্বোধ বুড়ো! মেয়েটার দিক থেকে মুখ সরিয়ে নিল ও। ওর তেল আর ভেষজ লতার মিশ্রণ বিশেষ মলমের ফ্লস্কের দিকে হাত বাড়াল। সব রকম ছোটখাট কাটাছেঁড়া ও অন্যান্য ছোটখাট রোগের মহৌষধ। খুলির উপর মলম লাগিয়ে দিল ও। আদর পেয়ে চোখ বন্ধ করা বিড়াল বাচ্চার মতো চোখ বুজে ওর গায়ে হেলান দিয়ে শুয়ে পড়ল মেয়েটা। কাজ শেষ হলে পুকুর থেকে উঠে এলো ওরা। বসে রইল একসাথে। রোদ ও তপ্ত হাওয়ায় শরীর শুকোনোর পর একটা ব্রোঞ্জের ফোরসেপ বেছে নিল তাইতা, তারপর ওর দেহের প্রতি ইঞ্চিতে কাজ করল। ভেষজ মলম বেশির ভাগ উকুন ও অন্যান্য পোকা মেরে ফেললেও আরও অনেকগুলোকে ওর শরীর আঁকড়ে থাকতে দেখল। ওগুলো বেছে তুলে নিয়ে পিষে মারল। ফেনকে আমোদিত করে রক্তের ফোঁটায় বিস্ফোরিত হওয়ার সময় সন্তোষ জাগানো পপ আওয়াজ করছে। তাই শেষ উকুনটা বের করে আনলে ওর কাছ থেকে ফোরসেপটা নিল ফেন তারপর ওর শরীর থেকে তাইতার দেহে পাড়ি জমানো পোকাগুলোর ব্যবস্থা করতে লেগে গেল। তাইতার তুলনায় অনেক তীক্ষ্ণ ও ক্ষিপ্র। ওর রূপালি দাড়ি ও বগলতলায় জীবনের লক্ষণের খোঁজে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। তারপর আরও নিচে তল্লাশি চালাল সে। বুনো বলে ওর পেটের নিচে ওকে নির্বীজ করার সেই রূপালি ক্ষতে হাত বোলানোর সময় দ্বিধা প্রকাশ করল না। এই গ্লানির চিহ্নটাকে সব সময়ই অন্যদের চোখের আড়ালে রাখার চেষ্টা করে তাইতা। কেবল জীবিত লস্ত্রিসের চোখ ছাড়া। এখন আবার বেঁচে উঠেছে সে। কোনও রকম বিব্রত বোধ করছে না। তবু, ওর কাজটা নিষ্পাপ ও স্বাভাবিক হলেও হাতটা সরিয়ে দিল ও।
