তোমাকে বাগ মানানো কঠিন, কণ্ঠে সমীহ ও অনুমোদনের সুর ফুটিয়ে তুলল তাইতা। তোমার মনটা যোদ্ধার, এককালে দেবী ছিলে সেই দৃঢ়তা আছে এখনও। এবার আরও দ্রুত শান্ত হয়ে গেল সে। টিউনিকের নিচে তাইতাকে কামড়ে দিল বিদায়ী উকুনের দল। উপেক্ষা করে কথা বলে চলল ও।
তোমার সম্পর্কে বলতে দাও, ফেন। এককালে আমার হেফাযতে ছিলে তুমি, যেমনটা আবার হয়েছ। আজও আমি বুঝতে পারি না কেমন করে তিনি তোমার মতো এমন অসাধারণ একটা জিনিস জন্ম দিয়েছিলেন। তুমি বলার বাইরে সুন্দরী ছিলে, ফেন। মাছি, উকুন আর নোংরার নিচে, আমি জানি এখনও তাই আছো। ধীরে ধীরে দরদভরা বিস্তারে ছেলেবেলার কাহিনী বলার সময় ওর প্রতিরোধ শিথিল হয়ে এলো। ওর বেশ কয়েকটা মজার কথা বা ঘটনার কথা রোমন্থন করল ও। ফের চোখ পিটপিট করতে শুরু করল সে। তাই বাঁধন শিথিল করলেও এবার পালানোর চেষ্টা না করে ওর কোলে শান্ত হয়ে বসে পড়ল। অবশেষে তাই যখন উঠে দাঁড়াল সূর্যটা মধ্য গগনে উঠে এসেছে। গম্ভীর চেহারায় ওর দিকে তাকাল ফেন। ওর হাত ধরার জন্যে হাত বাড়াল তাইতা। সরে গেল না ও।
আমার সাথে চলো এখন। তোমার খিদে না লেগে থাকলেও আমার লেগেছে। গ্রামের পথ ধরল ও। ওর পাশে পাশে দ্রুত পায়ে এগোল মেয়েটা।
গ্রাম থেকে বেশ তফাতে একটা সাময়িক শিবির গেড়েছে মেরেন: রোদে পড়ে থাকা লু-দের লাশগুলো অচিরেই পচতে শুরু করবে। এলাকা অসহনীয় হয়ে যাবে। শিবিরের দিকে এগিয়ে যেতেই মেরেন এসে যোগ দিল। আপনাকে দেখে খুশি হলাম, ম্যাগাস, চিৎকার করে বলল সে। ভেবেছিলাম পাগলীটা বুঝি আপনাকে শেষ করে দিয়েছে। তাইতার পেছনে লুকিয়ে আছে ফেন, মেরেন ওদের কাছে এগিয়ে আসতেই ওর একটা পা আঁকড়ে ধরল সে। হোরাসের বিক্ষত চোখের দোহাই, মেয়েটার গায়ে কী গন্ধ রে বাবা। এখান থেকেও গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
গলা নামাও, হুকুম দিল তাইতা। ওকে নিয়ে মাথা ঘামিও না। ওর দিকে এভাবে তাকিয়ো না, তাহলে আমার কঠিন পরিশ্রম নিমেষে নষ্ট করে দেবে। আমাদের আগে আগে গিয়ে শিবির ও তোমার লোকদের বলে দাও কেউ যেন ওর দিকে না তাকায় বা ওকে ভয় পাইয়ে না দেয়।
এবার তবে একটা বুনো ছুকরিকে পোশ মানাতে হবে আমাদের? অনুতাপের ভঙ্গিতে মাথা নাড়ল মেরেন।
ওহ, না! আমাদের সামনের কাজটাকে খাট করে দেখছ তুমি, ওকে আশ্বস্ত করল তাইতা।
*
শিবিরের ঠিক মাঝখানে বিরাট সসেজ গাছের নিচে ছায়ায় বসেছে তাইতা ও ফেন। একজন লোক খাবার নিয়ে এলো। প্রথমে ধুরা পিঠা পরখ করে দেখল ফেন, কিন্তু প্রথম গ্রাস মুখে নেওয়ার পর গোগ্রাসে খেল। তারপর ঠাণ্ডা হাঁসের বুকের মাংসের দিকে নজর দিল। এত দ্রুত সেগুলো মুখে পুরতে লাগল যে দম আটকে যাবার দশা হলো।
বুঝতে পারছি ফারাওর সাথে খেতে বসার জন্যে তৈরি হওয়ার আগে সবক দিতে হবে তোমাকে, কালো দাঁতে হাঁসের হাড় চিবুতে দেখে মন্তব্য করল তাইতা। শীর্ণ পেটটাকে যখন খেতে খেতে প্রায় ফাটানোর উপক্রম করেছে, নাকোন্তোকে ডাকল তাইতা। বাকি সবার মতোই ভদ্র দূরত্ব থেকে এতক্ষণ লক্ষ করছিল সে, এবার ওদের সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসল। তাইতার কাছে ঘেঁষে এলো ফেন। নতুন করে সন্দিহান চোখে বিশালদেহী মানুষটাকে দেখছে।
বাচ্চাটাকে নাম জিজ্ঞেস করো। আমি নিশ্চিত, সে লু ভাষা জানে, এই ভাষায়ই কথা বলে সে। নির্দেশ দিল তাইতা, ওকে কয়েকটা কথা বলল নাকোন্তো। বোঝা গেল কথাগুলো বুঝতে পেরেছে সে, কিন্তু কঠিন জেদ আর একরোখাভাবে চেপে থাকল তার মুখটা। আরও খানিকক্ষণ ওকে উত্তর দিতে প্রভাবিত করার প্রয়াস পেল ও। কিন্তু মচকাল না ফেন।
কোনও বন্দি লু মহিলাকে নিয়ে এসো, নাকোন্তোকে বলল তাইতা। অল্প সময়ের জন্যে ওদের ছেড়ে চলে গেল সে। ফিরে এলো যখন, তার সাথে গ্রামের এক বিলাপরতা বয়স্কা মহিলা।
জিজ্ঞেস করো, এই মেয়েটাকে চেনে কিনা, বলল তাইতা।
কান্না থামিয়ে মহিলাকে কথা বলতে বাধ্য করতে ধমকের সুরে কথা বলতে হলো নাকোন্তাকে। তবে অবশেষে লম্বা চওড়া একটা বিবৃতি ঝাড়ল সে। ওকে সে চেনে, তরজমা করল নাকোন্তো। বলছে ও একটা একটা ডাইনী। ওকে ওরা গ্রাম ছাড়া করেছিল, কিন্তু বনের খুব কাছে থাকে সে, গোত্রের উপর ডাকিনীবিদ্যা নিয়ে এসেছে সে। ওদের ধারণা সেই ওদের লোকজন মেরে ফেলতেই আপনাকে পাঠিয়েছে।
তার মানে বাচ্চাটা ওদের গোত্রের নয়? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
বয়স্কা মহিলার জবাবটা ছিল প্রবল অস্বীকৃতি। না, অচেনা মানুষ সে। আগাছায় বানানো একটা ছোট নৌকার ভেতর ওকে পায় ওদের এক মেয়ে। মিশরিয় গ্রামীণ নারীরা বাচ্চা রাখার জন্যে প্যাপিরাসে যে ধরনের দোলনা বোনে সেগুলোর বর্ণনা দিল নাকোন্তা। শয়তানটাকে গ্রামে নিয়ে আসে সে, ওর নাম রাখে খোনা মানযি, মানে, জল থেকে এসেছে যে। ওই মহিলা নিঃসন্তান ছিল বলে স্বামী তালাক দিয়েছিল তাকে। এই অচেনা চিড়িয়াটাকে আপন করে নেয় সে। মেয়েটার বিশ্রী চুল সুন্দর করে বেঁধে দিয়েছিল। ওকে সূর্য আর পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষা করতে মাছের মতো শাদা শরীর ছাই-কাদায় লেপে দিয়েছে; যেমনটা রেওয়াজ ও মানানসই। ওকে খাইয়েছে, যত্ন নিয়েছে। পরিষ্কার বিতৃষ্ণার সাথে ফেনের দিকে তাকাল বয়স্কা মহিলা।
