সন্ত্রস্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকার সময় কাত হলো মেয়েটার মাথা। অন্তর্চক্ষু খুলল তাইতা। ওর চারপাশে লাফ দিয়ে উঠল আভা। জীবন্ত আলোর সূক্ষ্ম একটা জোব্বা আবৃত করল ওকে। ঠিক স্বপ্নে যেমন দেখেছিল। কাদার ভুতুড়ে প্রলেপের নিচে নোংরা অসহায় মেয়েটা ফেন। ওর কাছে ফিরেছে ও। যেমন কথা দিয়েছিল। ওকে এমন একটা অনুভূতি ভাসিয়ে নিল যেমনটা ওর দীর্ঘ জীবনে একবারও ঘটেনি। ওর মৃত্যুর সময় ওকে গ্রাস করে নেওয়া শোকের প্রাবল্য অতিক্রম করে গেল তা, যার ফলে ওর অন্য জীবনে অবসান ঘটেছিল। ওর নাড়িভূঁড়ি বের করে লিনেন ব্যান্ডেজে মুড়ে পাথুরে শবাধারে রেখে দিয়েছিল যখন।
এখন এতগুলো নিঃসঙ্গ মলিন বছর আগে ঠিক যেমনটা ওর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল ঠিক সেই বয়সে আবার জীবিত করে তোলা হয়েছে ওকে। এই একটি মাত্র আনন্দের প্রতাঁকের ভেতর দিয়ে সমস্ত দুঃখ আর বিষাদের অবসান ঘটেছে। ওর দেহের প্রতিটি তন্ত্রী, পেশি ও স্নায়ু অনুরণিত হচ্ছে সেই খুশিতে।
এতে চারপাশে গড়ে তোলা আড়ালের পর্দায় ব্যাঘাত ঘটল। সাথে সাথে টের পেয়ে গেল বাচ্চাটা। ঘুরে ওর দিকে তাকাল সে, ওর রক্তলাল চোখ ভুতুড়ে মুখোশের কারণে বিশাল দেখাচ্ছে। ওর উপস্থিতি টের পেলেও ওকে দেখতে পাচ্ছে না। মেয়েটার ক্ষমতা আছে বুঝতে পারল ও। এখনও ওর মানসিক ক্ষমতা পূর্ণতা পায়নি, কিন্তু তাইতা জানে ওর মায়াভরা শিক্ষায় এক সময় ওর সমকক্ষ হয়ে উঠবে সে। উদীয়মান সূর্য মেয়েটার চোখে একটা রশ্মি পাঠাল। ফলে গাঢ় সবুজ হয়ে ফুটে উঠল চোখজোড়ার আসল ঔজ্জ্বল্য। ফেনের সবুজ।
ওদের দিকে ছুটে আসছিল মেরেন। কঠিন মাটিতে জোরাল শব্দ তুলছে ওর পা। ফেনের সামনে একটাই পালানোর পথ রয়েছে: মাংস ঝলসানোর তাক আর কাঠের তূপের মাঝখানের সংকীর্ণ জায়গাটা। সোজা তাইতার বাহুতে এসে ধরা দিল ও। দুহাতে ওকে জড়িয়ে ধরতেই প্রবল ভয় আর বিস্ময়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে উঠল ও। আসেগেইটা ফেলে দিল হাত থেকে। নিজেকে ছুটিয়ে নিতে যুঝতে গিয়ে ওর চোখে মুখে আঁচড়ে কামড়ে দিলেও বুকের সাথে ওকে ঠেসে ধরে থাকল তাইতা। ওর আঙুলের নখগুলো তীক্ষ্ণ, ভাঙা। নখের নিচে কালো কাদা আটকে আছে। তাইতার শরীর আর কপালে রক্তাক্ত আঁচড় কাটল ওগুলো। এক হাতে ওকে ধরে রেখে এক এক করে হাত দুটো ধরে শরীরের সাথে চাপ দিল। মেয়েটা এখন অসহায় হয়ে পড়ায় মুখটা সামনে নিয়ে ভালো করে চোখের দিকে তাকাল। ওর উপর নিয়ন্ত্রণ সৃষ্টি করল। নিমেষে ও কী করছে বুঝে গেল ফেন। ওর সাথে মিলতে সামনে ঠেলা দিল। কিন্তু সময় মতোই ওর মনের ভাব বুঝে গেল তাইতা, ঝট করে মাথা পেছনে সরিয়ে নিল ও। ওর নাকের ডগা থেকে এক আঙুল সমান দূরত্বে কপাত করে বন্ধ হলো ওর মুখ।
আমার দুচোখের আলো, এখনও বুড়ো এই নাকটার দরকার আছে আমার। তোমার খিদে লেগে থাকলে আরও স্বাদু খাবারের ব্যবস্থা করব আমি, হেসে বলল তাইতা।
ঠিক এই সময় ঝড়ের বেগে অকুস্থলে হাজির হলো মেরেন। ওর চোখে মুখে আতঙ্ক আর সতর্কতার ভাব। ম্যাগাস! চিৎকার করে উঠল সে। নোংরা বিষাক্ত জিনিসটাকে আপনার কাছে ঘেঁষতে দেবেন না। এরই মধ্যে একজনকে মারার চেষ্টা করেছে সে। এখন আপনাকে মারাত্মকভাবে আহত করে বসতে পারে। ওদের দিকে ছুটে এলো সে। ওকে ধরতে দিন। জলাভূমিতে নিয়ে সবচেয়ে কাছের পুকুরে ডুবিয়ে মারি।
পিছিয়ে যাও, মেরেন! গলা না চড়িয়েই বলল তাইতা। ওকে স্পর্শ করবে না।
নিজেকে সামলে নিল মেরেন। কিন্তু, ম্যাগাস, সে তো-
তেমন কিছুই সে করবে না। যাও, মেরেন। আমাদের একা থাকতে দাও। আমরা একে অন্যকে ভালোবাসি। এইমাত্র ওকে সেটা বুঝিয়েছি আমি।
তারপরও দ্বিধায় ভুগল মেরেন।
যাও, বললাম না। এখুনি।
চলে গেল মেরেন।
ফেনের চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে হাসল তাইতা। ফেন, তোমার জন্যে অনেক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছি আমি। শক্তির কণ্ঠ ব্যবহার করছে ও। কিন্তু প্রবলভাবে ওকে প্রতিহত করল সে। থুতু ফেলল, ওর লালার বুদ্বুদ মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে পড়তে লাগল চিবুক থেকে।
আমাদের প্রথম পরিচয়ের সময় তুমি এত শক্তিশালী ছিলে না। রাগি আর বিদ্রোহী ছিলে বটে, কিন্তু এখনকার মতো এত শক্তিশালী নও। শব্দ করে হাসল তাইতা, চোখ পিটপিট করল ফেন। এমন শব্দ কখনও কোনও লু-র মুখ থেকে বের হয়নি। ওর চোখের সবুজ গভীরতায় পলকের জন্যে কৌতূহলের একটা ঝিলিক খেলে গেল। তারপর ওর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকাল মেয়েটা।
তখন কত সুন্দর ছিলে তুমি, কিন্তু এখন নিজের দিকে তাকাও তো একবার। ওর কণ্ঠে এখনও সম্মোহনী শক্তি বইছে। তুমি শূন্য থেকে আসা একটা দৃশ্য। কথাটাকে আদরের মতো বোঝাতে চাইল ও। তোমার চুল নোংরা হয়ে গেছে। চুলে হাত বোলাল ও, কিন্তু সরে যাবার চেষ্টা করল ফেন। পুরু কাদা আর বাবলা গাছের আঠার নিচে চুলের আসল রঙ আন্দাজ করা সহজ না। কিন্তু কণ্ঠস্বর শান্ত রাখল ও, উকুনের একটা স্রোত জটা থেকে বের হয়ে ওর হাত বেয়ে উঠে আসতে শুরু করলেও আশ্বাস জাগানিয়াই রইল ওর হাসি।
অহুরা মাযদা আর সত্যির কসম, তোমার গায়ে মেরুবেড়ালের চেয়েও বেশি দুর্গন্ধ, ওকে বলল তাইতা। তোমার আসল চামড়া পর্যন্ত পৌঁছতে অন্তত এক মাস ডলাডলি করতে হবে। মুক্ত হওয়ার জন্যে কিলবিল করতে লাগল সে। এবার তোমার গায়ের ময়লা আমার গায়ে তুলে দিচ্ছ। তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর দেখা যাবে আমার অবস্থা তোমার চেয়ে খুব ভালো নেই। মেরেন আর ওর সৈনিকদের থেকে দূরে গিয়ে শিবির করতে হবে আমাদের। এমনকি সৈনিকরাও আমাদের দুজনের গন্ধ একসাথে সহ্য করতে পারবে না। কথা বলে চলল ও কথার অর্থ তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে বলার সুর ও প্রভাব আস্তে আস্তে ওকে প্রভাবিত করল। তাই টের পেল শিথিল হয়ে আসছে মেয়েটা, সবুজ চোখের বৈরী আভা মিলিয়ে যেতে শুরু করেছে। প্রায় নিন্দ্রালু ঢঙে পিটপিট করছে চোখের পাতা। হাতের বাঁধন শিথিল করল ও। সাথে সাথে আঁকি দিয়ে নিজেকে জাগিয়ে তুলল সে। আবার বৈরীভাবে জ্বলে উঠল। মেয়েটা আবার নতুন করে যুঝতে শুরু করায় বাঁধন শক্ত করতে বাধ্য হলো তাই।
