আমি নিশ্চিত নই, তবে আমার ধারণা সে লু-দের কেউ নয়। অন্য রকম। এমনকি মিশরিয়ও হতে পারে।
আমার তাতে সন্দেহ আছে, ম্যাগাস। মেয়েটা বর্বর। নগ্ন, রঙচঙা।
ধরো ওকে, ধমকে বলল তাইতা।
এই সুর মেরেনের পরিচিত। ঝটপট তল্লাশির দায়িত্ব নিল ও। ধীরে, সাবধানে এগিয়ে গেল লোকগুলো, পেটে বর্শার ঘাই খাওয়ার ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। ওরা অর্ধেক গ্রাম তল্লাশি শেষ করার পর জঙ্গলের মাথার উপর ভোরের আলোয় ভরে উঠল। তাই অস্থির, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। একটা কিছু খুঁচিয়ে চলেছে ওকে। স্মৃতির ভাণ্ডারে কোনও উঁদুরের মতো। একটা কিছু মনে করতেই হবে।
ভোরের হাওয়া দক্ষিণে বাঁক নিচ্ছে, ঝলসানোর তাক থেকে আধপচা মাছের গন্ধ বয়ে আনছে। গন্ধ এড়াতে সরে গেল ও। সাথে সাথে ভিড় করে এলো কাঙ্ক্ষিত স্মৃতি।
আর কোথায় চাঁদ মাছের খোঁজ করবে? অন্য মাছের মধ্যে লুকোনো অবস্থায় আমাকে পাবে তুমি। ফেনের কণ্ঠস্বর ছিল ওটা, দেবীর পাথুরে মূর্তির মুখ দিয়ে কথা বলছিল। তবে কি ওরা যে বাচ্চাকে ধাওয়া করছে সে সৃষ্টি চক্রে আটকা পড়া কোনও আত্মা? অনেক দিন আগে বেঁচে ছিল এমন কারও অবতার?
আমাকে ফিরে আসার কথা দিয়েছিল ও, জোরে বলল ও। এটা সম্ভব-নাকি আমার নিজের আকাঙ্ক্ষাই আমাকে প্রতারিত করছে? এবং নিজেই নিজের প্রশ্নের জবাব দিল: এমন কিছু ব্যাপার আছে যা মানুষের সবচেয়ে অসম্ভব কল্পনাকেও হার মানায়। অসম্ভব বলে কিছু নেই।
কেউ ওদের লক্ষ করছে না নিশ্চিত হতে চট করে চারপাশে তাকাল তাই। তারপর সহজ পায়ে গ্রামের কিনারায় চলে এলো। মাংস ঝলসানোর তাকগুলোর মাঝে ঘুরে বেড়াতে লাগল। দৃষ্টিসীমার বাইরে আসামাত্র বদলে গেল ওর চেহারার অভিব্যাক্তি। শিকারের খোঁজে বাতাসে গন্ধ শোঁকা কুকুরের মতো দাঁড়াল ও। স্নায়ু উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। খুব কাছেই আছে ও, বলতে গেলে ওর উপস্থিতি অনুভব করা যাচ্ছে। ওর আসেগেইর আঘাত ঠেকাতে ছড়িটা তৈরি রেখে সামনে এগোল ও। কয়েক কদম পরপরই হাঁটু ভেঙে বসে ঠাসাঠাসি করে মাছ গেঁথে রাখা তাকগুলোর নিচ দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। ক্ষণে ক্ষণে লাকড়ির বান্ডিল আর ধোঁয়ার মেঘ বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে ওর দৃষ্টিপথে। মেয়েটা আড়ালে লুকিয়ে নেই নিশ্চিত হতে প্রতিটি কাঠের তূপ ঘিরে চক্কর দিতে হচ্ছে। ফলে ওর আগ্রগতি ধীর হয়ে গেল। ইতিমধ্যে প্রথম সূর্যের রশ্মি গ্রামকে ভাসিয়ে দিতে শুরু করেছে। তারপর, যেই আরেকটা কাঠের তূপ ঘিরে নিঃশব্দে চক্কর খাবে, সামনে ক্ষীণ একটা নড়াচাড়ার আওয়াজ পেল। কোণ থেকে উঁকি দিল ও। কেউ নেই ওখানে। মাটির দিকে তাকাতেই ধূসর ছাইয়ের উপর ছোট্ট ছোট্ট নগ্ন পায়ের ছাপ দেখতে পেল। ওকে তাড়া করা হচ্ছে, জানে মেয়েটা, ওর ঠিক সামনে থেকে আগে বাড়ছে, এক স্তূপ থেকে নিমেষে আরেক তূপে লুকাচ্ছে।
মেয়েটার চিহ্নও নেই। এখানে নেই সে, কাল্পনিক সঙ্গীর উদ্দেশে বলল তাইতা, তারপর ফের গ্রামের পথ ধরল। শব্দ করে হাঁটছে ও, হাতের ছড়ি দিয়ে তাকে আঘাত হানছে, তারপর একটা প্রশস্ত বৃত্তের আকারে ঘুরল ও, দ্রুত, নিঃশব্দে এগোচ্ছে।
শেষবার যেখানে মেয়েটার পায়ের ছাপ দেখেছিল সেখানে পৌঁছল ও। তারপর একটা কাঠের তূপের পেছনে বসে মেয়েটার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। সামান্য নড়াচড়া বা শব্দ শোনার জন্যে কান খাড়া করে রেখেছে। এখন ওকে না দেখে মেয়েটা ভীত হয়ে উঠবে। ফের অবস্থান বদলাবে। চারপাশে গাঢাকা দেওয়ার জাদু ছড়িয়ে দিল ও। তারপর পর্দার আড়াল থেকে মেয়েটার দিকে হাত বাড়াল। ইথারে অনুসন্ধান চালাচ্ছে।
আহ! মেয়েটাকে খুঁজে পেতেই বিড়বিড় করে বলল ও। খুব কাছেই আছে, তবে নড়ছে না। ওর ভীতি ও অনিশ্চয়তা টের পেল তাইতা: ওর অবস্থান জানে না সে। একটা কাঠের তূপের নিচে লুকাতে দেখল ওকে। সমস্ত শক্তি এবার ওর ওপর নিবদ্ধ করল তাইতা। মেয়েটাকে নিজের দিকে প্রলুব্ধ করতে অনুভূতি পাঠাচ্ছে।
ম্যাগাস? আপনি কোথায়? গ্রামের দিক থেকে ডাক ছাড়ল মেরেন। জবাব না পেয়ে কণ্ঠে তাগিদ ফুটে উঠল তার। ম্যাগাস, আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন? তাইতা যেখানে অপেক্ষা করছিল সেদিকে পা বাড়াল সে।
ঠিক আছে, ওকে নীরবে উৎসাহ যোগাল তাইতা। আসতে থাকো। ওকে নড়তে বাধ্য করবে তুমি। আহ! ওই যে চলে যাচ্ছে ও।
আবার নড়ছে মেয়েটা। কাঠের নিচ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হয়ে এসে ওর দিকে গুঁড়ি মেরে এগিয়ে আসছে এখন। মেরেনের সামনে দৌড়াচ্ছে।
এসো, ছোট্ট সোনা। চারপাশে জাদুর আঁকশী জোরদার করে তুলল ও। কাছে এসো।
ম্যাগাস! আরও কাছ থেকে আবার চিৎকার করল মেরেন। কাঠের স্তূপের কোণে তাইতার সামনে হাজির হলো মেয়েটা। থেমে মেরেনের কণ্ঠস্বরের উৎসের দিকে তাকাল। ত্রাসে মেয়েটাকে কাঁপতে দেখল তাইতা। ওর দিকে তাকাল সে। ওর চেহারা কাঁদার এক ভীতিকর মুখোশ, মাথার চুল দেখে মনে হচ্ছে কাঁদা আর বাবলা গাছের আঠা দিয়ে মাথার উপর তূপ করে বাঁধা হয়েছে। আগুনের ধোঁয়ায় চোখজোড়া রক্তলাল হয়ে গেছে, আর চুল থেকে গড়িয়ে পড়া রংয়ের কারণে ভুরুর রঙ ধরতে পারল না তাই। ওর দাঁত জোর করে কালো করা। ওদের আটক করা লু-নারীদের সবার দাঁতই কালো করা; ওদের চুল বাঁধার কায়দাও একই রকম। স্পষ্টতই, ওদের সৌন্দর্যের আদিম ধারণা এটা।
