গ্রামের দূর প্রান্তে গতি কমাল মেরেন। পেছনে তাকিয়ে দেখল কেউ দাঁড়িয়ে নেই। স্টার্লিংয়ের লাশের চারপাশের জমিন রক্ষিত মৃতদেহে ভরা। গুঁড়ি মেরে সরে যাবার প্রয়াস পাচ্ছে আহতদের অল্প কয়েকজন। অন্যরা গোঙাচ্ছে, ধুলিতে তড়পাচ্ছে। ওদের ভেতর ছুটে বেড়াচ্ছে শিলুকরা। ভীতিকর আর্তনাদ ছেড়ে আঘাত হেনে চলেছে।
ওদের খতম করার কাজে শিলুকদের সাহায্য করো! হুকুম দিল মেরেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে ঝটপট বধ্যভূমির দিকে এগিয়ে গেল ওর লোকেরা। যার মাঝে সামান্য প্রাণের চিহ্ন দেখছে তাকেই শেষ করে দিচ্ছে।
মেরেনের পাশে এসে লাগাম টেনে ধরল তাই। আক্রমণের প্রথম কাতারে ছিল না ও। তবে খুব কাছে থেকে অনুসরণ করেছে। কয়েকজনকে কুঁড়ের দিকে পালিয়ে যেতে দেখেছি, বলল ও। ওদের খুঁজে বের করো, তবে মেরো না। নাকোন্তো ওদের পেট থেকে সামনের এলাকা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করতে পারবে হয়তো।
ক্যাপ্টেনদের উদ্দেশ করে নির্দেশ উচ্চারণ করল মেরেন। এক কুঁড়ে থেকে আরেক কুঁড়েতে ঘুরে ঘুরে লণ্ডভণ্ড করে ফেলল ওরা। আর্তনাদ ছেড়ে বাচ্চাসহ বের হয়ে এলো দু-একজন লু নারী। গ্রামের মাঝখানে এনে জমা করা হলো ওদের। ওদের ভাষায় নির্দেশ জারি করল শিলুকরা। মাথার উপর হাত তুলে সারি বেঁধে বসতে বাধ্য করা হলো ওদের। মাদের আঁকড়ে থাকল বাচ্চারা। ওদের ভীত চোখে অশ্রু টলটল করছে।
এবার আমাদের বেঁচে যাওয়া ঘোড়াগুলোর খোঁজ করতে হবে, চিৎকার করে বলল মেরেন। নিশ্চয়ই সবকটা কেটে খেয়ে ফেলেনি। স্টর্লিংকে যেদিক থেকে হত্যা করার জন্যে টেনে হিঁচড়ে আনতে দেখেছিল কসাইদের, সেই বনের দিকে ইঙ্গিত করল। সেনাদল নিয়ে অন্ধকারের দিকে এগিয়ে গেল হিলতো। সহসা হেষা ধ্বনি করে উঠল একটা ঘোড়া।
এখানেই আছে! খুশিতে চিৎকার বরে উঠল হিলতো। মশাল নিয়ে এসো!
কুঁড়ের ছাদ থেকে খড় খসিয়ে নিয়ে কোনওমতে মশাল তৈরি করল সৈনিকরা, ওগুলো জ্বেলে হিলতোকে অনুসরণ করে অন্ধকারে প্রবেশ করল। পাঁচজনকে বন্দি নারী-শিশুদের পাহারায় রেখে মশালধারীদের অনুসরণ করল মেরেন ও তাই। সামনে হিলতো ও ওর লোকেরা চিৎকার করে পথ বাৎলে দিচ্ছে, এক সময় গাঢ় হয়ে আসা আলো চোরাই পশুগুলোকে স্পষ্ট করে তুলল।
ঘোড়া থেকে নেমে ওদের কাছে দৌড়ে গেল তাইতা ও মেরেন। কয়টা বাকি আছে? তাগিদের সুরে জানতে চাইল মেরেন।
মাত্র এগারটা। শেয়ালের কছে ছয়টা খুইয়েছি আমরা, জবাব দিল হিলতো। ছোট একটা দড়ি দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে একই গাছের সাথে সবগুলোকে বেঁধে রেখেছে লু-রা। এমনকি মাটিতে মাথা নামাতে পারছে না ওরা।
ওদের ঘাস বা পানি খেতে দেওয়া হয়নি, সক্রোধে বলে উঠল হিলতো। কেমন জানোয়ার এই লোকগুলো?
ওদের মুক্ত করো, নির্দেশ দিল মেরেন। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে হুকুম তামিল করতে ছুটে গেল তিনজন সৈন্য। কিন্তু ঘোড়াগুলো খুব কাছাকাছি থাকায় ঠেলেঠুলে ঢুকতে হলো ওদের।
হঠাৎ যন্ত্রণা ও ক্রোধে গর্জে উঠল ওদের একজন। সাবধান! এক লু লুকিয়ে আছে এখানে। ওর কাছে বর্শা আছে, আমাকে আহত করেছে।
সহসা হুটোপুটি এবং তারপর ঘোড়ার খুরের ভেতর থেকে তীক্ষ্ণ ছেলেমানুষী চিৎকার ভেসে এলো।
ধরো ওকে! পালাতে দিয়ো না।
কী হচ্ছে ওখানে? জানতে চাইল মেরেন।
একটা বাচ্চা জংলী লুকিয়ে আছে এখানে। সেই বর্শার ঘাই মেরেছে আমাকে।
এই সময় ঘোড়ার পালের ভেতর থেকে বেগে ছুটে এলো একটা ছেলে, হাতে হালকা আসেগেই। এক সৈনিক ধরার চেষ্টা করল তাকে, কিন্তু তাকে আঘাত করে গ্রামের দিকে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল সে। অদৃশ্য হওয়ার আগ মুহূর্তে চকিতের জন্যে তাকে দেখলে তাইতা, তবে কিছুটা ভিন্ন কিছু চোখে লাগল ওর। এমনকি ছোট লু-রাও গাট্টাগোট্টা, বাঁকা পায়ের হয়। কিন্তু এটি প্যাপিরাসের বাকলের মতোই ছিপছিপে, পাজোড়া মোহনীয় ঋজু। সন্ত্রস্ত গেযেলের মতো মোহনীয় ভঙ্গিতে ছুটছে। সহসা তাইতা উপলব্ধি করল শাদা কাদা আর গোত্রীয় নকশার আড়ালে ওটা আসলে একটা মেয়ে, দেইজা ভ-র তীব্র অনুভুতিতে আক্রান্ত হলো ও। সব দেবতার কসম খেয়ে বলছি, ওকে আগেও দেখেছি আমি, আপনমনে বিড়বিড় করে বলল ও।
পিচ্চি শয়তানটাকে পাকড়াও করার পর ধীরে ধীরে খুন করব! ছেলেটাকে যেখান থেকে বের করেছে, সেই ঘোড়াগুলোর ভেতর থেকে বের হয়ে আসার সময় চিৎকার করে বলে উঠল আহত সৈনিক। ওর বাহুতে বর্শার আঘাতের চিহ্ন। আঙুলের ডগা থেকে রক্ত গড়াচ্ছে।
না! তাগিদের সুরে চিৎকার করল তাইতা। ও একটা মেয়ে। ওকে জীবিত চাই আমি। গ্রামের দিকে গেছে ও। এলাকাটা ঘিরে ফেল, কুঁড়েগুলোয় ফের তল্লাশি চালাও। যেকোনও একটায় গাঢাকা দিতে গেছে সে।
উদ্ধার করা ঘোড়াগুলোর ব্যবস্থা করতে অল্প কয়েকজন লোক রেখে কুঁড়েগুলোর চারপাশ ঘেরাও করে ফেলল মেরেন। নাকোন্তো ও নোস্তুকে জিজ্ঞাসাবাদ করল তাইতা। নারী-শিশুদের পাহারা দিচ্ছিল ওরা। এদিকে একটা বাচ্চাকে পালিয়ে যেতে দেখেছ? এতটা লম্বা, ওদের বাকি সবার মতো শাদা কাদায় ঢাকা?
মাথা নাড়ল ওরা।
ওরা ছাড়া, কাঁদতে থাকা বন্দিদের দিকে ইঙ্গিত করল নাকোন্তো। আর কাউকে দেখিনি।
বেশি দূরে যেতে পারেনি, ওকে আশ্বস্ত করল মেরেন। গ্রাম ঘিরে ফেলেছি আমরা। পালাতে পারবে না। ওকে আমরা খুঁজে বের করব। প্রতিটি কুঁড়েয় তল্লাশি চালাতে হাবারির প্লাটুনটাকে পাঠাল ও। সে ফিরে এলে তাইতাকে জিজ্ঞেস করল, এই খুনে ছুরিটা আপনার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ কেন, ম্যাগাস?
