জবাব দেওয়ার আগেই কর্কশ স্পর্শে ওর ঘুম টুটে গেল। পরমানন্দটুকু আঁকড়ে থাকার প্রয়াস পেল ও। কিন্তু সেটা কেড়ে নেওয়া হলো ওর কাছ থেকে।
ওর পাশে হাঁটু গেড়ে বসে আছে নাকোন্তো। ঘোড়া আর লু-শেয়ালগুলোর দেখা পেয়েছি, বলল সে। এখন ওদের মারার সময় হয়েছে।
*
প্যাপিরাসের আড়াল ছাড়ার আগে রাত নামার অপেক্ষা করল ওরা, তারপর নিচু মাটির তীর বেয়ে উন্মুক্ত চারণভূমিতে উঠে এলো। নরম বালির উপর বলতে গেলে কোনও শব্দই করছে না ঘোড়ার খুর। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে গাছপালার কাছে নিয়ে এলো ওদের নাকোন্তো, তারার পটভূমিতে ছায়ামূর্তির মতো লাগছে ওগুলোকে। প্রলম্বিত আড়াল করা ডালপালার নিচে আসার পর জলাভূমির তীর বরাবার সমান্তরাল হয়ে গেল সে। অল্প খানিকটা সময়ের জন্যে নীরবে এগিয়ে চলল ওরা, তারপরই একটা বনে ঢুকে পড়ল, এখানে মাথার উপর ঝুলে পড়া ডালপালার হাত থেকে বাঁচতে ঘোড়ার পিঠে নুয়ে পড়তে হলো ওদের। বেশি দূরে যেতে পারল না, এই সময় সামনে রাতের আকাশে গোলাপি একটা আভা দেখা দিল। ওটার দিকেই ওদের নিয়ে চলল নাকোন্তো। এখন ভয়াবহ ছন্দে ঢাকের আওয়াজ কানে আসছে। ওরা এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে আরও জোরাল হয়ে উঠল শব্দটা, এক সময় পুরো রাত যেন পৃথিবীর হৃৎপিণ্ডের মতো তড়পাতে লাগল। আরও কাছে যাওয়ার পর ঢাকের আওয়াজের সাথে যোগ হলো বেসুরো কোরাস।
ওদের বনের সীমানায় থামাল নাকোন্তো। মেরেনের পাশে এসে দাঁড়াল তাইতা; খোলা প্রান্তরের উপর দিয়ে আদিম খড় আর কাদায় লেপা কুঁড়ের বিশাল এক গ্রাম দেখতে পেল ওরা, চারটে বিরাট বনফায়ারে আলোকিত হয়ে আছে, প্রবল বেগে ফুলিঙ্গ উঠছে ওগুলো থেকে। শেষ কুঁড়েটার পেছনে ধূমায়িত তাকের সারি, মাছের কাটা লাশের টুকরোয় ঢাকা, আগুনের আলোয় রূপালি চাদরের মতো ঝিলিক খেলছে ওগুলোর আঁশ। বনফায়ার ঘিরে আনুমানিক জনা বার মানবদেহ পাক খাচ্ছে, লাফাচ্ছে। আপাদমস্তক শাদা রংয়ে রাঙানো; সেখানে কালো, হলুদ আর লাল কাদার বিচিত্র নকশা। তাইতা বুঝতে পারল ওরা উভয় লিঙ্গের, শাদা কাদা ও ছাইয়ের প্রলেপের নিচে সবাই নগ্ন। নাচার সময় বুনো ছন্দে গান গাইছে, এক পাল বুনো জানোয়ারের চিৎকারের মতো আওয়াজ হচ্ছে।
হঠাৎ, ছায়া থেকে লু-দের নর্তনকুর্দন করতে থাকা আরেকটা দল টেনে হিঁচড়ে একটা চোরাই ঘোড়া নিয়ে এলো। ঘোড়সওয়ারদের সবাই চিনতে পারল ওটাকে। স্টার্লিং নামে একটা মেয়ার। ওটার গলায় বাকলের একটা রশি পেঁচিয়েছে লু, আর সামনে থেকে টানছে অন্য পাঁচজন; ওদিকে আরও জনা বার ওটার পাশ ও পেছন থেকে ঠেলছে, তীক্ষ্ণ কাঠি দিয়ে খোঁচা মারছে। আঘাতে সৃষ্ট ক্ষতস্থানে রক্ত চিকচিক করছে। দুই হাতে ভারি মুগুর তুলে নিল এক লু, তেড়ে এলো ঘোড়াটার দিকে। ওটার মাথা লক্ষ্য করে সজোরে নামিয়ে আনল। খুলিতে লাগল আঘাতটা। নিমেষে মাটিতে লুটিয়ে পা ছুঁড়তে লাগল ওটা। সবুজ তরল হয়ে বের এলো পেটের মল। রঙ চর্চিত লু-রা ঝাঁপিয়ে পড়ল লাশের উপর, পাথরের ছুরি হাঁকাচ্ছে। পশুটার কাঁপতে থাকা দেহ থেকেই খাবলা খাবলা মাংস তুলে নিচ্ছে, মুখে পুরে দিচ্ছে তারপর। চিবুক বেয়ে রঙচঙে ধড়ে রক্ত গড়িয়ে নামছে। বুনো কুকুরের দল ওরা। মরা লাশ নিয়ে মারপিট করছে, চিৎকার করছে। ক্রোধে গর্জন ছাড়ল অপেক্ষমান সৈনিকরা।
পাশে দাঁড়ানো তাইতার দিকে তাকাল মেরেন। মাথা দোলাল ও। বামে, ডানে, আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে এগোও। নিচু অথচ পরিষ্কার কণ্ঠে নির্দেশ দিল মেরেন। পাখার মতো প্রসারিত রেখায় ছড়িয়ে পড়ল দুপাশে দুটি কলাম। ওরা অবস্থান গ্রহণ করার পরই ফের হাঁক দিল মেরেন: সেনাদল আগে বাড়বে! অস্ত্র বের করো! খাপ থেকে তলোয়ার বের করে আনল ওরা। আগে বাড়ো! দৌড়াও! ছোটো! আক্রমণ!
নিবিড় ফর্মে ছুটতে শুরু করল ওরা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রয়েছে ঘোড়াগুলো। সেনাদল ঝড়ের বেগে গ্রামে ঢোকার আগে লু-রা ওদের উপস্থিতি টেরই পেল না, এত উন্মত্ত ছিল ওরা। এবার ইতিউতি ছুটে সটকে পড়ার চেষ্টা করল। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে। ঘোড়ার পাল ওদের মাড়িয়ে দিল, পিষে ফেলল খুরের নিচে। ওঠানামা করল তলোয়ার, হাড়-মাংসের ভেতর দিয়ে থ্যাপ শব্দ করে চলল ওগুলোর ফলা। আক্রমণের পুরোভাগে ছিল দুই শিলুক। গর্জন করছে, আঘাত হানছে, লাফ দিয়ে উঠে ফের আক্রমণ করছে।
নাকোন্তোকে একজনের শরীরের ভেতর একটা বর্শা সেঁধিয়ে দিতে দেখল তাইতা। লু-র শোল্ডার ব্লেডের মাঝখানে খাড়া হয়ে রইল ওটার ফলা। নাকোন্তো ওটা বের করে আনার সময় মনে হলো যেন মরা মানুষটার শরীরের সব রক্ত শুষে নিয়েছে। আগুনের আলোয় কালো ফোয়ারা ছুটল।
রঙ করা নাভী পর্যন্ত ঝুলে থাকা বিশালবক্ষা এক মহিলা মাথা ঢাকতে দুই হাত শূন্যে ওঠাল। সোজা হয়ে রেকাবে দাঁড়াল মেরেন, কনুইয়ের কাছ থেকে তার একটা হাত আলগা করে দিল। পরক্ষণেই ফের তলোয়ার হাঁকাল, তরমুজের মতো দুভাগ করে দিল অরক্ষিত মুণ্ডটা। তখনও কাঁচা মাংসে ঠাসা ছিল তার মুখ, মরণ চিৎকারের সাথে ছিটকে বের হয়ে এলো সেটা। নিবিড় ফর্মেশন বজায় রেখে লু দের তাড়া করে চলল সৈনিকরা, ওদের তলোয়ার ধরা হাত মারাত্মক ছন্দে উঠছে, নামছে। যারা পালানোর চেষ্টা করছিল তাদের পাকড়াও করল শিলুকরা। ঢোলবাদকরা ফুটো করা কিগেলা গাছের কাণ্ডের সামনে এমনভাবে জমে গেছে যে চোখ তুলে তাকাল না পর্যন্ত। কাঠের লাঠি দিয়ে ক্রমাগত উন্মত্ত তালে ঢোল বাজিয়ে চলল, যতক্ষণ না ঘোড়সওয়ারা ওদের পিষে ফেলল। রক্তক্ষরণে তড়পাতে তড়পাতে নিজেদের ঢোলের উপরই মারা গেল ওরা।
