জঘন্য চিড়িয়া, থুতু ফেলে বলল মেরেন।
আহত সৈনিকের পরিচর্যা করতে এগিয়ে গেল তাইতা। বর্শার আঘাত গভীর, বুঝতে পারল ক্ষতস্থানে পচন ধরবে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মারা যাবে লোকটা। কিন্তু আশ্বস্তকর ভাব দেখাল ও।
এই সময় চোরদের পিছু ধাওযার করতে সবচেয়ে শক্তিশালী ও সক্ষম লোকদের নিয়ে একটা দল তৈরি করল মেরেন। দলের বাকি অংশ মালপত্র, বাকি ঘোড়া ও অসুস্থদের পাহারা দিতে পেছনে থাকবে। পুরোপুরি আলো ফুটে ওঠার আগে হানাদারদের যাবার পথে ফেলে যাওয়া নাদির খোঁজে আগাছার ভেতরে চলে গেল দুই শিলুক। সূর্য ওঠার আগেই ফিরে এলো।
পালিয়ে যাওয়া ঘোড়াগুলো জড়ো করে দক্ষিণে নিয়ে গেছে লু-কুত্তারা, তাইতাকে জানাল নাকোন্তো। আরও দুটো লাশ আর একজন আহতের দেখা পেয়েছি আমরা, তখনও বেঁচে ছিল। এখন আর নেই। বেল্টে ঝোলানো ভারি ব্রোঞ্জের ছুরির বাট স্পর্শ করল নাকোন্তো। আপনার লোকেরা তৈরি থাকলে, প্রবীন ও মহান পুরুষ, এখুনি পিছু নেতে পারি আমরা।
ধূসর মেয়ারটাকে সাথে নিতে রাজি হলো না তাইতা, ওয়ার্লপুল এখনও অনেক ছোট, লু-দের বর্শার আঘাত পেয়েছে পেছন পায়ে। ভাগ্যক্রমে তেমন মারাত্মক কিছু নয়। তার বদলে একটা বাড়তি ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হলো ও। ওরা বেরিয়ে যাবার পর ওর দিকে তাকিয়ে হেষাধ্বনি করল উইন্ডস্মোক, যেন ওকে রেখে যাওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করছে।
আগাছার উপর একটা প্রশস্ত পথ তৈরি করে গেছে আঠারটা চোরাই ঘোড়ার খুর। ধাওয়া করে নিয়ে যাওয়া ঘোড়ার খুরের ছাপের উপর পড়েছে লু-দের নগ্ন পায়ের ছাপ। অনায়াসে ওগুলোর পেছনে ছুটতে লাগল শিলুকরা। দুলকি চালে ওদের অনুসরণ করল ঘোড়সওয়াররা। সারাদিন ওদের টেনে নিয়ে চলল ট্রেইলটা। সূর্য ডোবার সময় ঘোড়াগুলোকে সামলে ওঠার সুযোগ দিতে পিছিয়ে এলো ওরা, কিন্তু চাঁদ ওঠার পর আবার সামনে বাড়ার মতো পর্যাপ্ত আলো পেয়ে গেল। ভোরে সামনের দূরত্বে আরেকটা বৈশিষ্ট দেখল ওরা। প্যাপিরাসের একঘেয়ে সাগরের পর ওদের চোখ এমনকি এই নিচু গাঢ় রেখা দেখেও খুশি হয়ে উঠল।
লাফ দিয়ে চাচাত ভাইয়ের কাঁধে উঠে বসল নাকোন্তো, তারপর সামনে তাকাল। তাইতার দিকে ফিরে দাঁত বের করে হাসল। দিনের আলোয় মুক্তোর মতো বিঁকিয়ে উঠল ওর দাঁত। প্রবীন পুরুষ, সামনে জলাভূমির শেষ দেখতে পাচ্ছেন। ওগুলো গাছপালা, শুকনো জমিনের উপর দাঁড়িয়ে আছে।
মেরেন ও সৈনিকদের কাছে এই খবর চালান করল তাইতা। চিৎকার করে উঠল ওরা, হাসল, পরস্পরের পিঠ চাপড়ে দিল। ওদের ফের বিশ্রাম দিতে দিল মেরেন, কারণ অনেক জোরে ছুটেছে ওরা।
ট্র্যাক দেখে নাকোন্তো আঁচ করল যে বেশি দূরে নেই লু-রা। ওরা সামনে বাড়ার সময় গাছের সারি আরও বড় ও ঘন হয়ে উঠতে লাগল। কিন্তু তাসত্ত্বেও জনবসতির কোনও চিহ্ন দেখতে পেল না। অবশেষে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে বাহিনী নিয়ে পায়ে হেঁটে আগে বাড়ল ওরা, যাতে প্যাপিরাসের মাথার উপর দিয়ে সওয়ারিদের মাথা দেখা না যায়। দীর্ঘদিনের মাঝ দুপুরের আগে আর থামল না ওরা। এখন কেবল প্যাপিরাসের পাতলা একটা পর্দা আড়াল করে রেখেছে ওদের কিন্তু সেটাও অকস্মাৎ ফ্যাকাশে জমিনের নিচু একটা তীরের বিপরীতে শেষ হয়ে গেল। দুই কিউবিটের চেয়ে উঁচু হবে না সেটা, ওটার ওপাশে রয়েছে ছোট ছোট সবুজ ঘাসের প্রান্তর ও লম্বা গাছের বন। ওগুলোর বিরাট বিরাট বীজাধার দেখে কিগালা সসেজ গাছ, সরাসরি কাণ্ডে জন্মানো হলদে ফল দেখে সিকামোর ডুমুড় চিনতে পারল তাইতা। অন্য বেশিরভাগ প্রজাতি ওর অচেনা।
বনের আড়াল থেকে চোরাই ঘোড়র পায়ের ছাপ পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে ওরা। নরম মাটির বাধ বেয়ে উঠে গেছে। তবে ওদিকের ভোলা চারণভূমিতে পশুর কোনও চিহ্ন নেই। গাছপালার সারি পরখ করল ওরা।
ওগুলো কী? গাছপালার মাঝে ক্ষীণ নড়াচড়া আর ধূলির সূক্ষ্ম ধোঁয়াশার দিকে ইঙ্গিত করে জানতে চাইল মেরেন।
মাথা নাড়ল নাকোন্তো। মোষ, ছোট পাল। ঘোড়া নেই। নোম্ভ আর আমি সামনে রেকি করতে যাচ্ছি। আপনাদের এখানেই থাকতে হবে। প্যাপিরাসের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল দুই শিলুক। সতর্কতার সাথে খেয়াল রাখলেও ওদের আর দেখতে পেল না তাইতা ও মেরেন; এমনকি ভোলা চারণভূমি পার হওয়ার সময় এক ঝলকের জন্যেও না।
প্যাপিরাসের কিনারা থেকে পিছিয়ে এলো ওরা, এক চিলতে উন্মুক্ত, শুকনো জমিন খুঁজে পেল, এখানে নোজব্যাগগুলো ভর্তি করে ঘোড়াকে খেতে দিয়ে বিশ্রাম নিতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। মাথায় শাল মুড়ে নিয়েছে তাই। ছড়ি হাতের কাছে রেখে চিৎ হয়ে শুয়ে আছে ও। যারপরনাই ক্লান্ত, কাদা ভেঙে চলার ফলে পায়ে ব্যথা করছে। ঘুমের সীমানা থেকে গড়িয়ে পড়ল ও।
মন ভালো রেখ, তাইতা, আমি অনেক কাছে, ওর কণ্ঠস্বর, ক্ষীণ ফিসফিসানি, এত পরিষ্কার ও সুর এত নির্ভুলরকম ফেনের যে চমকে জেগে উঠে বসল ও। চট করে এপাশ ওপাশ তাকাল, চোখে প্রত্যাশা। কিন্তু ঘোড়া, খচ্চর, বিশ্রামরত লোকজন ও অন্তহীন প্যাপিরাস ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। ফের ঘুমিয়ে পড়ল
ঘুম ফিরে আসতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। কিন্তু ক্লান্ত ছিল ও, অবশেষে ওর চারপাশে জল থেকে লাফিয়ে ওঠা মাছের স্বপ্ন দেখতে লাগল, রোদে ঝিলিক দিয়ে উঠছে। বিভিন্ন ধরনের মাছ থাকলেও ওর পরিচিত মাছ নেই। তারপর ঝাঁক উন্মুক্ত হতেই দেখতে পেল ওটা। মূল্যবান পাথরের মতো ঝিলিক দিচ্ছে ওটার আঁশ, অসাধারণ লেজটা দীর্ঘ ও কোমল, ওটাকে ঘিরে থাকা আভা অলৌকিক, সূক্ষ্ম। চোখের সামনেই মানুষের চেহারা নিল ওটা, অল্পবয়সী মেয়ের অবয়ব। জল বেয়ে এগিয়ে এলো, ওর দীর্ঘ নগ্ন পাজোড়া ডলফিনের মতো মোহনীয় ভঙিতে কোমরের নিচ থেকে ওঠানামা করছে। মাথার উপরের সূর্যের আলো ওর ফিকে দেহ ও পেছনে বিছিয়ে থাকা দীর্ঘ উজ্জ্বল চুলে ঝিলিক খেলছে। চিত হলো সে, জলের ভেতর দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাসল। ওর নাক থেকে ছোট ছোট রূপালি বুদ্বুদ বের হয়ে এলো। আমি কাছে এসে গেছি, তাইতা। শিগগিরই আবার একসাথে হবো আমরা। খুব শিগগির।
