তাইতার জানা ছিল শিলুক যাযাবর গোত্র। গরু-ছাগলের জন্যে গভীর মমতা ওদের রয়েছে, কখনওই হত্যা করে না। তার বদলে সাবধানে পশুর গলায় একটা শিরা কেটে তারপর একটা কালাবাশে যথেষ্ট পরিমাণ রক্ত জমা হলে ক্ষতস্থান ফের কাদা দিয়ে বন্ধ করে দেয়। এই রক্তের সাথে গরুর দুধ মিশিয়ে পান করে। এই জন্যেই আমরা এত লম্বা, শক্তিশালী। এমন শক্তিশালী যোদ্ধা। এই জন্যেই জলাভূমির রোগ আমাদের কখনও আক্রান্ত করে না। শিলুকরা ব্যাখ্যা করবে।
লু-দের শিবিরে পৌঁছার পর ওরা দেখল শাখা করছে খুঁটির ডগায় বসানো কুঁড়েগুলো। তবে ইদানীং বসবাসের আলামত রয়েছে। ওরা যেখানে আগুনে শিকার ঝলসেছে সেখানে পড়ে থাকা মাছের মুড়ো ও আঁশ এখনও বেশ টাটকা। টাটকা পানির কাঁকড়া খেয়ে নেয়নি; বা ছাদে বসে থাকা শকুনের পেটে যায়নি। তুলতুলে শাদা ছাইয়ের ভেতর জ্বলন্ত অঙার জ্বলজ্বল করছে। শিবিরের ওপাশের এলাকাকে ল্যাট্রিন হিসাবে ব্যবহার করেছে লু-রা, টাটকা বর্জ্যের ছড়াছড়ি ওখানে। ওটার পাশে দাঁড়াল নাকোন্তো। সকালেও এখানে ছিল ওরা। এখনও আশপাশে রয়েছে। সম্ভবত আগাছার আড়াল থেকে আমাদের উপর নজর রাখছে।
গ্রাম থেকে বের হয়ে আবার অন্তহীন মনে হওয়া দূরত্ব পার হলো ওরা। শেষ বিকেলের দিকে পথ দেখিয়ে ওদের একটা ভোলা জায়গায় নিয়ে এলো নাকোন্তো, জায়গাটা আশপাশের কাদার তীরের তুলনায় কিঞ্চিত উঁচু জলাভূমির বুকে এক চিলতে শুকনো জমিন। মাটিতে গাঁথা কাঠের খুঁটির সাথে ঘোড়া বাঁধল ওরা, চামড়ার নোজব্যাগে করে পেষা খাবার দিল খেতে। অসুস্থ সৈনিকদের পরিচর্যা করল তাইতা। লোকেরা রাতের খাবার তৈরি করল। রাত নেমে এলে আগুনের চারপাশে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ওরা। কেবল শান্ত্রীরাই জেগে রইল।
অনেক আগেই আগুন নিভে গেছে। শাস্ত্রীরা যখন হঠাৎ ধড়মড় করে জেগে উঠল তখনও ওদের চোখে ঘুমের ছাপ। গোটা শিবির জুড়ে যেন প্রলয় নেমে এসেছে। চিৎকার-চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে, ঘোড়ার খুরের ছুটন্ত আওয়াজ, দ্বীপের চারপাশে জলাভূমির জলে ছলাৎছলাৎ শব্দ। মাদুর ছেড়ে লাফ দিয়ে উঠল তাইতা, দৌড়ে গেল উইন্ডস্মোকের কাছে। পেছনে হটছে ওটা, লাফাচ্ছে, ওকে জমিনের সাথে আটকে রাখা পেরেক ওপড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্য ঘোড়াগুলোও একই চেষ্টা চালাচ্ছে। ওটার হল্টার আঁকড়ে ধরল তাইতা, টেনে ধরে রাখল। স্বস্তির সাথে লক্ষ করল, ত্রাসে কাঁপতে থাকা বাচ্চাটা এখনও রয়েছে ওর পাশে।
চারপাশে পিছলে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত কালো সব ছায়ামূর্তি, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করছে, বর্শা দিয়ে খোঁচা মারছে ঘোড়ার গায়ে। দড়ি ছিঁড়ে পালানোর জন্যে খেপাচ্ছে। লাফাচ্ছে শঙ্কিত জানোয়ারগুলো, দড়ির বাধন আলগা করতে ক্ষেপে উঠেছে। তাইতার দিকে তেড়ে এলো একটা ছায়ামূর্তি, বর্শার আঘাত হানল। হাতের ছড়ি দিয়ে ওটাকে একপাশে ঠেলে দিয়েই পরক্ষণে ডগাটা হানাদারের গলায় বসিয়ে দিল ও। লুটিয়ে পড়ল লোকটা, পড়ে রইল সেভাবেই।
মেরেন ও তার ক্যাপ্টেনরা লোকজন জড়ো করে ফেলেছে। উন্মুক্ত তলোয়ার বাগিয়ে তেড়ে এলো ওরা। অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে বেশ কয়েকজন হানাদারকে কতল করতে পারল।
পিছু নাও ওদের! ঘোড়া নিয়ে পালাতে দিয়ো না! গর্জে উঠল মেরেন।
অন্ধকারে ওদের পিছু নিতে গিয়ে নিজের নোক হারাবেন না, তাইতার উদ্দেশে কাকুতি করল নাকোন্তো। লু-রা দারুণ বিশ্বাসঘাতক। ওদের পুকুরের কাছে নিয়ে অ্যাম্বুশে ফেলে খতম করে ফেলবে। অনুসরণ করার আগে দিনের আলো ফোঁটার অপেক্ষা করতে হবে।
মেরেনকে ঠেকাতে দ্রুত ছুটে এলো তাই। অনীহার সাথে সতর্কবাণী মেনে নিল ও; কারণ ওর রক্তে যুদ্ধের নেশা ছড়িয়ে পড়েছে। নিজের লোকদের ফিরিয়ে আনল।
ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিল ওরা। চারজন শাস্ত্রীর গলাই দুফাঁক করে রেখে গেছে ওরা। সৈনিকদের একজন উরুতে বিরাট একটা আঘাত হজম করেছে। তিনজন লু কে হত্যা করা গেছে। আরেকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। নিজের রক্ত ও ক্ষতস্থান থেকে বের হয়ে আসা আবর্জনায় গড়াগড়ি খেয়ে গোঙাচ্ছে সে।
খতম করো ওকে! নির্দেশ দিল মেরেন। ওর দলের একজন যুদ্ধ কুড়ালের এক কোপে দুটুকরো করে ফেলল তাকে। আঠারটা ঘোড়া খোয়া গেছে।
এতগুলো ঘোড়া হারানো চলবে না, বলল তাইতা।
হারাব না, গম্ভীর কণ্ঠে প্রতিশ্রুতি দিল মেরেন। ওগুলো উদ্ধার করব আমরা-আইসিসের অণ্ডকোষের কসম খেয়ে শপথ করছি।
আগুনের আলোয় লু-দের একজনের লাশ পরখ করল তাইতা। খাট, মোটাসোটা লোকের লাশ ওটা, নিষ্ঠুর বানরের মতো চেহারা। ঢালু কপাল, ঠোঁটজোড়া পুরু, খুব কাছাকাছি বসানো কুঁতকুঁতে চোখ। কোমরে জড়ানো চামড়ার বেল্টটা বাদ দিলে নগ্নই বলা চলে তাকে। বেল্টে একটা থলে ঝুলছে। ওটায় রয়েছে বেশকিছু জাদুর তাবিজ, গিঁটের হাড় ও দাঁত, সেগুলোর কিছু আবার মানুষের। লোকটার গলায় পঁাচানো বাকলের দড়িতে পাথরের ছুরি ঝুলছে। শাস্ত্রীদের কারও রক্তই জমাট বেঁধে আছে ওটায়। আনাড়ী কায়দায় বানানো হলেও ডগাটা লাশের গলায় বসিয়ে পরখ করতে গিয়ে তাইতা দেখল সামান্য ছোঁয়াতেই চামড়া ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। তার বুক ও মুখে শাদা কাদা, লাল হলদে ফোঁটা, বৃত্ত ও আঁকাবাঁকা আদিম নকশা আঁকা। কাঠের ধোঁয়া, পচা মাছ আর তার নিজস্ব বুনো গন্ধ বের হচ্ছে শরীর থেকে।
