প্যাপিরাসের নিচের বেশিরভাগ জমিনই ভেজা, অনেক সময় নেহাতই স্যাঁতসেঁতে তবে প্রায়ই ঘোড়ার খুরের পশম ঢেকে দিচ্ছে জল। তা সত্ত্বেও মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলল ছোট্ট কোল্ট ওয়ার্লপুল। আগাছার ভেতর লুকিয়ে আছে পুকুরগুলো, এগুলোর কোনওটা ছোট, কিন্তু অন্যগুলো বিরাট ল্যাগুনের মতো। আগাছার উপর দিয়ে দেখতে না পেলেও নির্ভুলভাবে হয় ওগুলোকে এড়িয়ে যাচ্ছে বা দুটোর মাঝখান দিয়ে এগোচ্ছে শিলুকরা। একবারও বিকল্প পথের খোঁজে পিছু হটতে বাধ্য হয়নি কলামটা। রোজ সন্ধ্যায় শিবির খাটানোর সময় হলেই প্যাপিরাসের ভেতর শুকনো জমিনঅলা খোলা জায়গা খুঁজে বের করছে নাকোন্তো। শুকনো খড়ি দিয়ে লাকড়ি বানাচ্ছে, শিখা যাতে খাড়া থাকা আগাছার বাইরে যেতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখছে। ঘোড়া আর খচ্চরের দল আবদ্ধ জলে জন্মানো ঘাস আর গাছ খেতে নিজেদের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল।
রোজ সন্ধ্যায় বর্শা নিয়ে কোনও পুকুরের জলে নেমে পড়ছে নাকোন্তো, তারপর শিকারী সারসের ভঙ্গিতে অটল দাঁড়িয়ে থাকছে। যখন কোনও বড় আকারের মাগুর মাছ সাঁতরে ওর কাছে এসে পড়ে, ওটাকে নিপূণভাবে বর্শায় গেঁথে তুলে আনে, লেজ দাপিয়ে ছোটার জন্যে লড়াই করে চলে ওটা। ইতিমধ্যে আগাছা দিয়ে একটা ঢিলাঢালা ঝুড়ি বুনে নিয়েছে নোম্ভ, মাথায় চাপিয়েছে ওটা, বুনটের ফোকর দিয়ে ওর চোখ দেখা যায়। তারপর তীর ছেড়ে গোটা শরীর পানিতে ডুবিয়ে ফেলল, কেবল ঝুড়ির আড়ালে থাকা মাথাটা রইল পানির ওপর। অসীম ধৈর্যের সাথে নড়াচড়া করছে। হাঁসের একটা ঝাঁক শিকার করবে বলে খুব সাবধানে আগে বাড়ছে। নাগালের ভেতর আসামাত্র একটা পাখির পা আঁকড়ে ধরল সে, টেনে নিয়ে গেল পানির নিচে। ঘাড় মুচড়ে দেওয়ার আগে চিৎকার করারও অবসর পেল না। ওটা। এভাবে ঝাঁক থেকে পাঁচটা হাঁস কায়দা করার পর সন্দিহান হয়ে উঠল অন্যগুলো, চেঁচামেচি জুড়ে ডানা ঝাপ্টানোর আওয়াজ তুলে উড়াল দিল ওগুলো। বেশির ভাগ সন্ধ্যায়ই দলটা টাটকা মাংস আর ঝলসানো বুনো হাঁসের মাংস দিয়ে রাতের খাবার সারছে।
হুলঅলা পোকামাকড়ের দল মানুষ ও পশু উভয়কেই জ্বালিয়ে মারছে। সূর্য ডোবার সাথে সাথে জলের তল থেকে গুঞ্জন তুলে উঠে আসতে শুরু করে ওরা, ওদের হাত থেকে বাঁচতে অসহায়ের মতো ক্যাম্পফায়ারের আগুনের কাছে জড়ো হয় সৈনিকরা। সকালে দেখা যায় ওদের চোখমুখ ফুলে গেছে, কামড়ের দাগ পড়েছে।
বার দিন পথ চলার পর প্রথম একজনের ভেতর জলাভূমির রোগের লক্ষণ ফুটে উঠল। অচিরেই একের পর এক আক্রান্ত হতে লাগল কমেরেডরা। তীব্র মাথাব্যথা আর এমনকি গুমোট গরমেও নিয়ন্ত্রণাতীত কাঁপুনির শিকার হচ্ছে ওরা, গায়ের চামড়া এত গরম হয়ে উঠছে যে হাত দেওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ওদের সেরে ওঠার সুযোগ দিতে যাত্রায় বিরতি দিল না মেরেন। রোজ সকালে শক্তিশালী সৈনিকটি অচলদের ঘোড়ায় উঠতে সাহায্য করে, তারপর জিনের উপর বহাল থাকতে সাহায্য করতে পাশাপাশি এগোয়। রাতে অনেকেই মারাত্মক প্রলাপ বকে। সকালে আগুনের পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে মৃতদেহগুলো। দ্বাদশ দিনে মারা গেল ক্যাপ্টেন তনকা। কাদার ভেতর ওর জন্যে একটা অগভীর কবর খুঁড়ল ওরা, তারপর এগিয়ে গেল আবার।
অসুখে আক্রান্ত কয়েকজন রোগ প্রতিহত করলেও ওদের চোখ মুখ হলদে রয়ে গেল, দুর্বল ও পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছে ওরা। তাইতা ও মেরেনসহ অল্প কয়েক জন অসুখে আক্রান্তই হলো না।
জ্বরে আক্রান্ত লোকদের আগে বাড়ার তাগিদ দিচ্ছে মেরেন: যত তাড়াতাড়ি এই ভয়ঙ্কর বিষাক্ত ধোঁয়াশা থেকে বের হতে পারব তত দ্রুত সেরে উঠবে তোমরা। তারপর তাইতাকে বলল, ভয় একটাই, জলাভূমির জ্বরে শিলুকদের হারাতে হলে, বা ওরা আমাদের ফেলে চলে গেলে বেকায়দায় পড়ে যাব আমরা; আর কোনওদিনই এই ভয়ঙ্কর বুনো এলাকা থেকে বেরুতে পারব না। এখানেই শেষ হয়ে যাব সবাই।
জলাভূমিই ওদের দেশ। এখানকার সব রকম রোগ থেকে ওরা মুক্ত, ওকে আশ্বস্ত করল তাইতা। শেষ পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকবে ওরা।
দক্ষিণে এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে চোখের সামনে উন্মুক্ত হচ্ছে প্যাপিরাসের বিশাল বিস্তার, তারপর পেছনে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে আবার। যেন মধুতে আটকে যাওয়া পতঙ্গ ওরা, প্রাণান্ত চেষ্টা সত্ত্বেও মুক্ত করতে পারছে না নিজেদের। প্যাপিরাস বন্দি করে ফেলেছে ওদের; হজম করে নিচ্ছে, শ্বাস রুদ্ধ করে দিচ্ছে। এখানকার নিরেট একঘেয়েমি ক্লান্ত, শিথিল করে দিচ্ছে ওদের মন। অবশেষে, যাত্রার ছত্রিশতম দিনে ওদের সামনের দৃষ্টিপথের সীমানায় কালো বিন্দুর মতো একটা জটলা উদয় হলো।
ওগুলো কি গাছ? শিলুকদের উদ্দেশে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল তাইতা। লাফ দিয়ে নোন্তুর কাঁধে চড়ে বসল নাকোন্তো, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়াল, অনায়াসে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। আগাছার উপর দিয়ে দেখার দরকার হলেই এমনটা করে সে।
নাহ, প্রবীন পুরুষ, জবাব দিল সে, লু-দের কুঁড়ে ওগুলো।
লু-রা আবার কারা?
ঠিক মানুষ বলা যাবে না ওদের। এখানকার জলাবাসী জানোয়ার, মাছ, সাপ আর কুমীর খেয়ে বাঁচে। যেমন দেখতে পাচ্ছেন, খুঁটির উপর বাসা বানায় ওরা। পোকামাকড় তাড়াতে কাদা, ছাই আর অন্যান্য নোংরা জিনিস দিয়ে সারা শরীর লেপে রাখে। বুনো, বর্বর, ওদের পেলেই মেরে ফেলি আমরা, কারণ আমাদের গরু ছাগল চুরি করে ওরা। আমাদের কাছ থেকে চুরি করা গরু-ছাগল এখানে এনে তারপর খায়। মানুষ না, বরং হায়েনা আর শেয়াল। অসন্তোষের সাথে থুতু ফেলল সে।
