সবকিছুই আপেক্ষিক, আপনমনে হাসল তাইতা। নোম্ভ মেরেনের চেয়েও এক মাথা লম্বা।
কোত্থেকে এসেছ তোমরা, নাকোন্তো?
জলাভূমির ওধার থেকে, চিবুক দিয়ে দক্ষিণে ইঙ্গিত করল সে।
তাহলে দক্ষিণের এলাকা ভালো করে চেনা আছে?
ওখানেই আমাদের দেশ। মুহূর্তের জন্যে আনমনা মনে হলো ওকে। স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ল।
আমাকে পথ দেখিয়ে তোমাদের দেশে নেবে?
রোজ রাতে স্বপ্ন দেখি বাপ-দাদার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি, মৃদু কণ্ঠে বলল নাকোন্তো।
ওদের আত্মা তোমাকে ডাকছে, বলল তাইতা।
প্রবীন পুরুষ, আপনি বুঝতে পেরেছেন, প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় ওর দিকে তাকাল নাকোন্তো। আপনি কেবুই থেকে যাবার সময় আমি ও নোম্ভ পথ দেখাতে আপনার সাথে যাব।
*
ঘোড়া এবং ওদের সওয়ারিরা পুরোপুরি যাত্রার জন্যে তৈরি হওয়ার আগে আরও দুটি পূর্ণ চাঁদ নীলের পুকুরে ঝিলিক দিয়ে গেল। ওদের রওয়ানা হওয়ার আগের রাতে বিরাট মাছের ঝাঁকের স্বপ্ন দেখল তাইতা। নানা রঙ, চেহারা ও আকারের মাছ।
আমাকে মাছের মাঝে লুকানো অবস্থায় পাবে, স্বপ্নে ওর মনে প্রতিধ্বনি তুলল ফেনের মিষ্টি ছেলেমানুষি কণ্ঠস্বর। তোমার অপেক্ষায় থাকব আমি।
সকালে সুখ ও প্রবল প্রত্যাশার অনুভূতি নিয়ে ঘুম থেকে উঠল ও।
*
বিদায় নিতে দেখা করতে এলে গভর্নর নারা তাইতাকে বললেন, আপনি চলে যাচ্ছেন দেখে আমি দুঃখিত, ম্যাগাস। আপনার সঙ্গ এখানে কেবুইয়ে কাজের নিঃসঙ্গতা দূর করতে অনেক সাহায্য করেছে। আশা করছি অচিরেই আবার আপনাকে স্বাগত জানানোর সুযোগ পাব। বিদায় উপলক্ষ্যে আপনার জন্যে একটা উপহার রয়েছে, আশা করছি আপনার বেশ কাজে লাগবে। তাইতার কাঁধে হাত রেখে ওকে নিয়ে উজ্জ্বল রৌদ্রালোকিত প্রাঙ্গণে এলেন তিনি। পাঁচটি প্যাক মিউল উপহার দিলেন ওকে। সব কটার পিঠে ঘাসের ডগাভর্তি এক জোড়া করে বস্তা। বনের গভীরে আদিম গোত্রগুলোর কাছে এই সামান্য জিনিসের অনেক চাহিদা। এরই এক মুঠো হাতে পেতে পুরুষরা তাদের সবচেয়ে সুন্দরী স্ত্রীকেও বিক্রি করে দেবে। বলে হাসলেন তিনি। যদিও আমি এর কোনও কারণ খুঁজে পাই নাঃ কী কারণে অমন অনাকার্ষণীয় মেয়েদের পেছনে আপনি ভালো জিনিস নষ্ট করতে যাবেন।
কলাম কেবুই ছেড়ে আসার পরই লাফ দিয়ে সামনে চলে এলো দুই শিলুক, ঘোড়ার দুলকি চালে ছোটার সাথে অনায়াসে খাপ খাইয়ে নিল। ক্লান্তিহীন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই গতিতে এগিয়ে চলছে। প্রথম দুই রাতে প্রশস্ত শুকনো নদীর তলদেশের পুব পারের বিস্তৃর্ণ পোড়া সমতল পার হলো লোকগুলো। তৃতীয় দিন ভোরের দিকে শিবির গাড়তে থামার পর রেকাবে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে সামনে নজর চালাল মেরেন। তীর্যক সূর্যের রশ্মিতে দিগন্তের ওধারে অবিচ্ছিন্ন বিছিয়ে থাকা অবারিত সবুজ দেয়াল দেখতে পেল ও।
তাইতার ডাকে উইন্ডস্মোকের মাথার কাছে এসে দাঁড়াল নাকোন্তো।
আপনি যা দেখছেন, প্রবীন পুরুষ, সেটা হচ্ছে প্যাপিরাসের প্রথম কেয়ারি।
ওগুলো সবুজ, বলল তাইতা।
মহান সুদের জলাভূমি কখনও শুকোয় না। পুকুরগুলো অনেক গভীর, শ্যাওলার কারণে সূর্যের আলোর নাগালের বাইরে থাকে।
আমাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে ওটা?
কাঁধ ঝাঁকাল নাকোন্তা। আরও এক রাত চলার পর লাল তীরে পৌঁছাব আমরা। তখন দেখা যাবে ঘোড়া পার করার মতো যথেষ্ট শুকিয়েছে কিনা জল। নাকি আমাদের পুবের পাহাড়ের দিকে দীর্ঘ ঘুর পথে যেতে হবে। মাথা নাড়ল সে। তাতে দক্ষিণ যাত্রা আরও বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়াবে।
নাকোন্তো যেমন আশা করেছিল, ঠিক পরের রাতেই প্যাপিরাসের কাছে পৌঁছাল ওরা। আগাছার কেয়ারি থেকে লোকেরা শুকনো খড়ি কেটে সূর্যের আঁচ থেকে নিজেদের বাঁচাতে নতুন করে নিচু ছাপরা বানাল। প্যাপিরাসের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেল নাকোন্তো ও নোন্ত, পরর দুদিন আর দেখা গেল না তাদের।
ফের ওদের দেখা মিলবে, শঙ্কা প্রকাশ করল মেরেন, নাকি বুনো জানোয়ার বলে নিজেদের গ্রামে পালিয়ে গেছে?
ফিরে আসবে ওরা, ওকে আশ্বস্ত করল তাইতা। খুব ভালো করেই চিনি ওদের। ওরা অনুগত ও বিশ্বস্ত।
দ্বিতীয় রাতের মাঝামাঝি শাস্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ শুনে জেগে উঠল তাইতা, প্যাপিরাসের ঝোঁপ থেকে নাকোন্তোর জবাব শুনতে পেল। তারপর অন্ধকার থেকে উদয় হলো দুই শিলুক যেখানে নিখুঁতভাবে মিশে গিয়েছিল ওরা।
প্যাপিরাসের ভেতর দিয়ে যাওয়া পথ খোলা, জানাল নাকোন্তো।
ভোরে প্যাপিরাসের ভেতরে পথ দেখিয়ে নিয়ে এলো ওদের দুই গাইড। এরপর থেকে এমনকি নাকোন্তোর পক্ষেও অন্ধকারে দিশা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছিল না, ফলে দিনের বেলাতেই পথ চলতে বাধ্য হলো ওরা। জলাভূমি অচেনা, ভয়ঙ্কর এক জগৎ। এমনকি ঘোড়ার পিঠ থেকেও প্যাপিরাসের তুলতুলে গোছর উপর দিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না ওরা। অসীম দিগন্তের দিকে বিস্তৃত অবারিত সবুজের মহাসাগরের উপর দিয়ে দেখার জন্যে রেকাবের উপর ভর দিয়ে তাকাতে হচ্ছিল। ওগুলোর উপর উড়ে বেড়াচ্ছে জলচর পাখির ঝাঁক, ওদের ডানার ঝাপ্টানো ও ব্যাকুল আর্তনাদে ভরে আছে পরিবেশ। মাঝে মাঝে চোখের আড়ালে ধেয়ে যাচ্ছে বিশালদেহী জানোয়ার, আগাছার ডগায় কাঁপন উঠছে তখন। কোন প্রজাতির জানোয়ার, ধারণাই করতে পারছে না ওরা। কাদার উপর ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপ জরিপ করছে দুই শিলুক, ওদের বর্ণনা তরজমা করছে তাই। ওটা ছিল মোষের পাল, বিরাট কালো বুনো জানোয়ার, বা জলখাসী ছিল ওগুলো, প্যাচানো শিংয়ের অদ্ভুত বাদামী রংয়ের পশু, পানিতেই থাকে। জল-হঁদুরের মতো সাঁতার কাটতে সাহায্য করার জন্যে দীর্ঘ খুর রয়েছে ওদের।
