খরার সাত বছর ধরে এই চৌকিতে আটকে আছেন গভর্নর। তাঁর নাম নারা। জলাভূমির জ্বরে বারবার আক্রান্ত হয়ে এখন রীতিমতো কুঁজো ও হলদে হয়ে গেছেন। তবে তাঁর সেনাছাউনী অনেকটা ভালো অবস্থায় রয়েছে। ধুরা খেয়ে বেঁচেবর্তে আছে। ওদের ঘোড়াগুলোও বেশ তরতাজা। মেরেন রাজকীয় সীলমোহর দেখিয়ে তাইতার পরিচয় জানানোর পর প্রবল হয়ে উঠল নারার আতিথেয়তা। পথ দেখিয়ে তাইতা ও মেরেনকে দুর্গের অতিথি ভবনে নিয়ে গেলেন তিনি, সেরা কামরা বরাদ্দ করলেন, নিজস্ব রাধুনীকে ওদের খাবার তৈরির নির্দেশ দিলেন। তারপর অস্ত্রাগারের দরজা খুলে দিলেন, যাতে লোকজনকে সজ্জিত করে তুলতে পারে ওরা।
ঘোড়ার আস্তাবল থেকে পছন্দসই ঘোড়া বেছে নিন। আপনাদের কী পরিমাণ ধুরা ও খড়ের প্রয়োজন আমার কোয়ার্টার মাস্টারকে বলবেন। কাপণ্যের কোনও দরকার নেই। আমাদের ভালোই রসদ জমা আছে।
মেরেন যখন নতুন কোয়ার্টারে লোকজনেকে দেখতে গেল, সবাইকে সন্তুষ্ট দেখল ও। এখানকার রেশন অসাধারণ। শহরে বেশি মেয়েলোক নেই, তবে অল্প কয়েক জন যারা আছে তারা সবাই বন্ধুসুলভ। ঘোড়া আর খচ্চরের দল ধুরা ও সবুজ ঘাস খেয়ে পেট ভরে নিচ্ছে। কারও কোনও অভিযোগ নেই, জানাল হিলতো।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর গভর্নর নারা সভ্য জগতের খবরাখবর পেতে উদগ্রীব ছিলেন। সংস্কৃত লোকদের সংস্পর্শ পেতেও ছিলেন লালায়িত। বিশেষ করে তাইতার প্রাজ্ঞ বয়ান তাকে মুগ্ধ করে দিল। বেশির ভাগ সন্ধ্যায় একসাথে খাবেন বলে মেরেন ও ওকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন তিনি। তাই যখন ওকে জানাল যে ওদের উদ্দেশ্য জলাভূমি হয়ে দক্ষিণে যাওয়া, নারাকে গম্ভীর দেখাল।
জলাভূমির ওধারের দেশ থেকে কেউ কোনওদিন ফিরে আসেনি। আমি বিশ্বাস করি, দুনিয়ার শেষ প্রান্তে চলে গেছে ওই পথ। ওখানে যারা যায়, কিনারার উপর দিয়ে খাদে পড়ে যায়।
পরক্ষণেই আরও আশাবাদী সুর ধরলেন তিনিঃ এই লোকগুলোর কাছে রাজকীয় বাজপাখীর সীলমোহর রয়েছে, তাঁর উচিত ওদের দায়িত্ব সম্পর্কে উৎসাহিত করা। অবশ্যই পৃথিবীর শেষপ্রান্তে কেন আপনারাই প্রথমবারের মতো গিয়ে হাজির হয়ে নিরাপদে ফিরে আসতে পারবেন না তার কোনও কারণ নেই। আপনার লোকেরা কঠিন, আপনার সাথে ম্যাগাস রয়েছেন। তাইতার উদ্দেশে মাথা নোয়ালেন তিনি। আপনাকে সাহায্য করতে কী করতে পারি আমি? শুধু বলে দেখুন।
আমাদের পথ দেখাতে দেশি শাস্ত্রী আছে আপনার? জিজ্ঞেস করল তাইতা।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, ওকে আশ্বস্ত করলেন নারা। ওদিকে কোথাও থেকে আসা লোকজন আছে আমার কাছে।
ওরা কোন গোত্রের লোক জানেন?
না, তবে ওরা লম্বা, খুবই কালো, গায়ে অদ্ভুত নকশার টাটু আঁকা।
তাহলে সম্ভবত শিলুক, খুশি হয়ে বলল তাইতা। যাত্রার সময় সেনাপতি লর্ড তানাস বেশ কয়েক রেজিমেন্ট শিলুককে নিয়োগ দিয়েছিল। ওরা বুদ্ধিমান, সহজে নির্দেশ দেওয়া যায়। সবসময় হাসিখুশি থাকলেও আসলে কিন্তু ভয়ঙ্কর যোদ্ধা।
ওদের বর্ণনার সাথে ভালোভাবেই মিলে যাচ্ছে, সায় দিলেন গভর্নর নারা। পদবী যাই হোক, দেশটাকে বেশ ভালোই চেনে ওরা। আমি যে দুজনের কথা ভাবছি, বেশ কয়েক বছর সেনাবাহিনীতে কাজ করছে, মিশরের ভাষাও শিখেছে কিছুটা। সকালে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব ওদের।
সকালে তাইতা ও মেরেন ওদের কোয়ার্টার থেকে বের হয়ে নুবিয়ানদের প্রাঙ্গণের দেয়াল বরাবর হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে দেখল। সোজা হয়ে দাঁড়ালে মেরেনকে ছাড়িয়ে গেল ওরা। ছিপছিপে শরীর চ্যাপ্টা কঠিন পেশিতে ঢাকা, আচরিক ক্ষতের জটিল নকশায় সজ্জিত। চর্বি বা তেলে চকচক করছে ওদের চামড়া। পরনে পশুর চামড়ার খাট স্কার্ট, হাড় থেকে বানানো কাটা লাগানো দীর্ঘ বর্শা বইছে সাথে।
তোমাদের দেখেছি, লোকেরা! শিলুক ভাষায় ওদের স্বাগত জানাল তাই। লোকেরা ক্ষমতা বোঝানোর এক ধরনের পরিভাষা, কেবল যোদ্ধাদের মাঝেই চল আছে এর; খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল ওদের সুদর্শন নিলোটিক চেহারা।
হে প্রবীন, প্রাজ্ঞজন, আপনাকে দেখেছি, ওদের ভেতর দীর্ঘজন জবাব দিল। এটাও সম্মান ও সমীহের ভাষা। তাইতার রূপালি দাড়ি ওদের মনে গভীর রেখাপাত করেছে। কিন্তু আপনি কীভাবে এত সুন্দরভাবে আমাদের ভাষা জানেন?
তোমরা সিংহ হৃদয়ের নাম শুনেছ? জানতে চাইল তাইতা। শিলুকরা মনে করে হৃদয়ই পুরুষের সাহসের জায়গা।
হাও! হাও! হতবাক হয়ে গেছে ওরা। লর্ড তানাসের অধীনে ওদের গোত্র কাজ করার সময় তাকে এই নাম দিয়েছিল ওরা। আমাদের দাদা সিংহ হৃদয়ের কথা বলেছে, কারণ আমরা চাচাত ভাই। পুবের পাহাড়ে ওই লোকের পক্ষে যুদ্ধ করেছে সে। সে আমাদের বলেছে সিংহ হৃদয় যোদ্ধাদের বাবা ছিলেন।
সিংহ হৃদয় আমার ভাই ও বন্ধু, ওদের জানাল তাই।
তাহলে আপনি সত্যিই প্রবীন মানুষ, এমনকি আমাদের দাদার চেয়েও বয়স্ক। আরও মুগ্ধ হয়ে গেছে ওরা।
চলো, ছায়ায় বসে কথা বলা যাক, পথ দেখিয়ে প্রাঙ্গণের মাঝখানে একটা বিরাট ডুমুর গাছের নিচে নিয়ে এলো ওদের তাইতা।
সভার কায়দায় বৃত্তাকারে বসল ওরা। একে অন্যের মুখোমুখি। এবার নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করল ওদের। বয়স্ক চাচাত ভাইটি ওদের মুখপাত্র। ওর নাম নাকোন্তো, খাট ঘাই মারার বর্শার শিলুক প্রতিশব্দ। কারণ যুদ্ধে অনেক লোক খতম করেছি আমি। বড়াই নয়, বরং নেহাত সত্যি কথা বলছে। আমার চাচাত ভাই নোম্ভ, কারণ সে খাট।
