তাই প্রমাণিত হলো। ওরা এরপর যে পুকুরের কাছে পৌঁছাল সেটার পানি সবুজ, মাগুর মাছের ছড়াছড়ি সেখানে, ওগুলোর মুখের চাপাশে দীর্ঘ কাটা। শুকিয়ে আসা পুকুর নিবিড় ঝাঁকে পরিণত করেছে ওদের। ঝটপট বর্শা ছুঁড়ে মারা হলো ওদের। ওগুলোর চর্বিদার মাংস উজ্জ্বল হলুদ। খাসা খাবার হলো ওগুলো। লোকজনের মাঝে তাইতার খ্যাতি মর্মর পাথরে সোনার হরফে খোদাই হয়ে গেছে। চার ক্যাপ্টেন ও তাদের সেনাদল দুনিয়ার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ওর সাথে যেতে তৈরি এখন, ঠিক একাজ করারই নির্দেশ দিয়েছেন ফারাও।
ঘোড়ার খড়ের সরবরাহের পরিমাণ সবসময়ই প্রয়োজনের চেয়ে কম, কিন্তুএই পথে আগেও গেছে যাওয়ার সময় আশপাশের এলাকায় ছুঁড়ে বেরিয়েছে তাই। নদীর কাছ থেকে ঘুর পথে ওদের একটা গোপন উপত্যকায় নিয়ে গেল ও, এখানে খাট শক্ত ধরনের মরুভূমির গুল্ম রয়েছে, দেখে মনে হবে মরে শুকিয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি গাছের নিচে চাপা পড়ে রয়েছে একটা করে জল ও পুষ্টি ভরা বিরাট কন্দ। কঠিন সময়ে অরিক্সের মূল খাবার ছিল-খুরের ঘায়ে খুঁড়ে তোলে ওরা এগুলো। সৈনিকরা বড় বড় টুকরো করল ওগুলোকে। প্রথমে স্পর্শও করতে চাইল না ঘোড়ার দল, কিন্তু ক্ষুধা অচিরেই অনীহাকে জয় করে নিল। পানির পাত্র আর চুনা পাথরের ব্যাগ সরিয়ে তার জায়গায় কন্দগুলো নিল লোকেরা।
পরের মাসগুলোতে চলার গতি বজায় রাখল ওরা। কিন্তু ঘোড়াগুলো দুর্বল হয়ে আসায় পিছিয়ে পড়তে লাগল। সেগুলো লুটিয়ে পড়লে সৈনিকরা দুই কানের মাঝখান দিয়ে খুলির গভীরে তলোয়ার চালিয়ে ব্যবস্থা করল। চামড়া শুকোতে রোদে ফেলে রাখল ওরা। শেষ বাধা শাবলুকা গোর্জ মোকাবিলা করার আগে মোট বিশটা ঘোড়া প্রাণ হারাল-সংকীর্ণ একটা ফোকরের ভেতর দিয়ে প্রবল বেগে ধেয়ে গেছে নীল।
গোর্জের উপরে বিস্তৃত নীল নদ, প্রায় মাইলটাক প্রশস্ত। তবে গ্যাপের ভেতরে ওটা খাড়া পাথুরে কিনারা থেকে আরেক কিনারা পর্যন্ত সাকুল্যে শখানেক গজে সীমিত। ওরা যখন ওটার ঠিক নিচে তাঁবু ফেলল, কারনাক ছেড়ে আসার পর এই প্রথমবারের মতো প্রবাহমান পানির দেখা পেল। পাথুরে শ্যুটের ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছে ক্ষীণ একটা পানির ধারা, নিচের পুকুরে জমা হচ্ছে। অবশ্য, মাইল খানেক দূরে যাবার আগেই আবার বালিতে শুষে নিয়েছে, ওদের নিচে অদৃশ্য হয়ে গেছে।
গোর্জের ঠোঁটের কিনারা বরাবর একটা বুনো ছাগল চলাচলের পথ ধরে শাবলুকো রিজে উঠে এলো ওরা। চূড়া থেকে সমতল ভূমির উপর দিয়ে দূরের নিচু নীল পাহাড়ের রেখার দিকে তাকাল। কেরেন পাহাড়, বলল তাইতা। দুই নীলের পাহারাদার। কেবুই এখন মাত্র পঞ্চাশ লীগ সামনে।
তীরে পামগাছের সারিতে নদীর সীমানা চিহ্নিত। পশ্চিমের তীর ধরে পাহাড়ের দিকে এগোল ওরা। যতই কেবুইয়ের কাছাকাছি হচ্ছে নদীর ধারাও তত প্রবল হয়ে উঠছে। সেই সাথে প্রফুল্ল হয়ে উঠছে ওদের মন। মাত্র এক দিনেই যাত্রার বাকি অংশ শেষ করল ওরা। অবশেষে নীলের সঙ্গমে পৌঁছুল।
মিশরিয় সাম্রাজ্যের দূরতম সীমায় কেবুই একটা চৌকি। ছোট দুর্গে নোমের গভর্নর ও সীমান্ত রক্ষীদের আবাস। দক্ষিণ তীর বরাবর বিস্তৃত শহরটা। বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল এটা, কিন্তু এতদূর থেকেও অনেকগুলো দালানকোঠার ধ্বসে পড়া দেখতে পেল ওরা, পরিত্যক্ত হয়ে গেছে। নীলের ব্যর্থতার কারণে মিশর মায়ের সাথে উত্তরের সমস্ত ব্যবসা রুদ্ধ হয়ে গেছে। অল্প লোকই তাইতা, মেরেন ও অন্য যারা নীলের যেপথে এসেছে সেপথে বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে যেতে প্রস্তুত আছে।
পানির এই ধারা আসছে ইথিওপিয়ার উঁচু ভূমি থেকে। প্রশস্ত পুবের নদীর ধারার দিকে ইঙ্গিত করল তাইতা। জল বইছে, অপর পাড়ে শাদুফের চাকা ঘুরে ঘুরে সেঁচের নালায় পানি ঢেলে দেওয়া দেখতে পেল ওরা। ধুরা শস্যের প্রশস্ত ক্ষেত ঘিরে রেখেছে শহরকে।
এখানে ঘোড়ার দলকে মোটাতাজা করে তোলার মতো শস্যের ভালো সরবরাহের আশা করেছিলাম, খুশি মনে বলল মেরেন।
হ্যাঁ, সায় দিল তাইতা। ওরা পুরোপুরি সেরে ওঠার আগ পর্যন্ত আমাদের বিশ্রাম নিতে হবে। উইন্ডম্মেকের ঘাড়ে হাত বোলাল ও। দুঃখজনকভাবে কাহিল অবস্থা হয়ে গেছে ওটা। পাঁজরের হাড় বেরিয়ে পড়েছে, ম্লান হয়ে গেছে গায়ের চামড়া। এমনকি তাইতা ধুরা শস্যের ওর ভাগ থেকে খেতে দিলেও পেটের বাচ্চা ও যাত্রার খাটুনি অবস্থা কাহিল করে দিয়েছে ওকে।
নদীর পুব শাখার দিকে মনোযোগ দিল তাইতা। রানি লস্ত্রিস ওই পথে যাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিল, বলল ও। গালি নিয়ে আরেকটা খাড়া গোর্জের মুখ পর্যন্ত চলে গিয়েছিলাম আমরা, ওটা পার হতে পারেনি ওগুলো; আমরা তখন নোঙর ফেলে রথ আর ওয়্যাগনে চেপে আগে বেড়েছি। পাহাড়ে যাবার পর রানি ও আমি ফারাও মেমোজের সমাধিস্থল নির্বাচন করি। আমি নকশা করেছিলাম; বুদ্ধি খাঁটিয়ে লুকিয়ে রেখেছি। ওটা যে কোনওদিনই আবিস্কৃত হয়নি সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। এবার হবে। এক মুহূর্তের জন্যে সম্ভষ্টির সাথে নিজের সাফল্যের কথা ভাবল ও। তারপর ফের খেই ধরল, ইথিওপিওদের চমৎকার ঘোড়া আছে, তবে ওরা যোদ্ধা এবং হিংস্রভাবে পাহাড়ী দুর্গ রক্ষা করে। ওদের পরাস্ত করে আমাদের সাম্রাজ্যের অধীনে আনার জন্যে পাঠানো দুদুটি সেনাদলকে হটিয়ে দিয়েছে ওরা। আমার ভয় হচ্ছে যে, তৃতীয় চেষ্টা আর হবে না। ঘুরে সরাসরি নদীর দক্ষিণ শাখার দিকে ইঙ্গিত করল ও। পুবের শাখার চেয়ে প্রশস্ত ওটা। তবে শুকনো, এমনকি ওটার তলদেশ দিয়ে ক্ষীণ কোনও ধারাও বইছে না। ওই পথেই যেতে হবে আমাদের। অল্প কয়েক লীগ এগোনোর পর জলাভূমিতে প্রবেশ করেছে নদী, কোনও চিহ্ন না রেখে এরই মধ্যে গোটা সেনাবাহিনীকে গ্রাস করে নিয়েছে ওটা। অবশ্য, ভাগ্য ভালো হলে বেশ শুকনো অবস্থায়ই পাব ওটাকে। সম্ভবত ওটার ভেতর দিয়ে যাবার মতো অন্যদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত সহজ পথের দেখা পাব আমরা। পথ দেখানোর জন্যে রাজকীয় বাজপাখীর সীলমোহর সঠিক ব্যবহার করে গভর্নরদের কাছ থেকে দেশি প্রহরী নিতে পারব। এসো, নদী পেরিয়ে কেবুইতে যাই।
