সকালে মুখে নাকের স্পর্শ দিয়ে ওকে জাগাল উইন্ডস্মোক। নিদ্রালু চোখে ওটার মুখ সরিয়ে দিল ও। কিন্তু ঘোড়াটা নাছোড়বান্দা। উঠে বসল ও। ব্যাপারটা কী, প্রিয়া আমার? কী হয়েছে? পেছনের পা দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করল ওটা; মৃদু কণ্ঠে গুঙিয়ে উঠল। সতর্ক হয়ে উঠল তাইতা। চট করে উঠে ওটার মাথা ও ঘাড়ে, তারপর শরীরের পাশে হাত বোলাল। ফোলা পেটের গভীরে জরায়ুর ভেতর জোরাল খিচুনি টের পেল। আবার গুঙিয়ে উঠল ঘোড়াটা. পেছনের পাদুটো মেলে দিল। লেজ উপরে তুলে পেশাব করে দিল। এবার শরীরের পাশে নাক ঘষল সে। এক হাতে ওটার ঘাড় জড়িয়ে ধরে ওকে সীমানার শেষ প্রান্তে নিয়ে এলো তাই। ওকে শান্ত রাখার গুরুত্ব জানা আছে। বিরক্ত বা সতর্ক হয়ে উঠলে খিচুনি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাতে বাচ্চার প্রসব বিঘ্নিত হবে। চাঁদের আলোয় ঘোড়ার উপর নজর রাখতে বসে পড়ল ও। অস্থিরভাবে হ্রেষারব ছাড়ছে ওটা, নড়াচড়া করছে। এবার শুয়ে পড়ল ওটা, চিৎ হয়ে গেল।
দারুণ চালাক মেয়ে, ওকে উৎসাহ যোগাল তাইতা। প্রসব করানোর জন্যে সহজাত প্রবৃত্তির বশেই বাচ্চাটার অবস্থান ঠিক করে নিচ্ছে। আবার উঠে দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল ওটা। তারপর পেট ফুলে উঠল ওটার, পানি ভেঙে গেল। তরল পদার্থ গড়িয়ে পড়া ঘাসের উপর লাথি হাঁকাল সে। পাক খেতে লাগল। এখন ওর দিকে মুখ করে আছে লেজটা। লেজের নিচে অস্পষ্ট জন্ম থলেটাকে আবির্ভূত হতে দেখল ও। আবার দুলে উঠল ঘোড়াটা, নিয়মিত ও জোরাল খিঁচুনি হচ্ছে। পাতলা ঝিল্লির ভেতর এক জোড়া পায়ের আউটলাইন চিনতে পারছে তাইতা, প্রতিটি খিঁচুনির সাথে খুরের পশম বের হয়ে আসছে। অবশেষে ওকে স্বস্তিতে ভাসিয়ে ছোট একটা কালো নাক দেখা গেল। ওকে আর ব্রিচ ডেলিভারির জন্যে তলব করা হবে না।
বাক-হার! ওর তারিফ করল তাইতা। বেড়ে দেখিয়েছ, প্রিয়া আমার। ওকে সাহায্য করতে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে কষ্ট করে দমন করল। একাই ভালো কাজ দেখাচ্ছে সে। খিচুনি জোরাল, নিয়মিত।
বাচ্চাটার মাথা বের হয়ে এলো। মায়ের মতোই ধূসর, খুশিতে ফিসফিস করে বলল ও। তারপর সহসা পুরো থলে এবং ওটার ভেতরের বাচ্চাটা সবেগে বের হয়ে এলো। ওটা জমিন স্পর্শ করতেই নাড়ী আলগা হয়ে মুক্ত হয়ে গেল থলেটা। বিস্ময়ে হতবাক তাইতা। ওর দেখা হাজার হাজার ঘোড়ার বাচ্চার জন্মের ভেতর এটাই দ্রুততম। ইতিমধ্যে ঝিল্লি থেকে বের হতে যুদ্ধ শুরু করেছে বাচ্চাটা।
ঘূর্ণী হাওয়ার মতোই ক্ষিপ্র, হেসে বলল তাইতা। এটাই হবে ওর নাম। আগ্রহের সাথে সদ্যজাত বাচ্চাটাকে যুঝতে দেখল উইন্ডস্মোক। অবশেষে ঝিল্লি ছিঁড়ে গেল, তারপর কোল্টটা-ওটা কোল্টই-সোজা হয়ে দাঁড়াল, মাতালের মতো এপাশ-ওপাশ দোল খাচ্ছে। পরিশ্রম করার পর রীতিমতো হাঁপাচ্ছে এখন। দ্রুত ওঠানামা করছে ওটার রূপালি শরীরের দুপাশ।
দারুণ! মৃদু কণ্ঠে বলল তাইতা। বাচ্চাকে মাতৃসুলভ আদরে চেটে দিল উইন্ডস্মোক, স্বাগত জানাল ওকে, তাতে ওটার প্রায় উল্টে পড়ার দশা হলো। টলমল পায়ে নিজেকে স্থির করল ওটা। তারপর ঝটপট কাজে লাগল: জিভের দীর্ঘ দৃঢ় আঁচড়ে অ্যামিওটিক তরল মুছে তারপর সহজে নাগাল পাওয়ার মতো জায়গায় ফোলা ওলান স্থাপন করল। এরইমধ্যে দুধ চুঁইয়ে পড়তে শুরু করেছে ওটার নোম লাগানো বাট থেকে। মাথা দিয়ে ওখানে ধাক্কা দিল কোল্টটা, তারপর জেঁকের মতো একটা ওলান কামড়ে ধরল। হিংস্র ভঙ্গিতে চুষতে শুরু করল। সরে গেল তাইতা। ওর উপস্থিতির আর প্রয়োজন বা কাক্ষিত নয়।
ভোরে সেনাদল মা আর বাচ্চাটার তারিফ করল। প্রত্যেকেই ঘোড়ার সমঝদার, তাই ভীড় বাড়াতে গেল না; যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে পরস্পরকে সদ্যজাত বাচ্চার চমৎকার গড়নের মাথা ও দীর্ঘ পিঠ দেখাতে লাগল।
দারুণ গভীর সিনা, বলল শাবাকো। টিকে থাকার মতো। সারাদিন দৌড়াতে পারবে।
সামনের পাজোড়া চ্যাপ্টা বা কবুতরের পায়ের মতো নয়। দ্রুত ছুটতে পারবে, বলল হিলতো।
পেছনের পাজোড়া চমৎকারভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, কাস্তে বা হিপ-শট কোনওটাই নয়। হ্যাঁ, বাতাসের মতোই ক্ষিপ্র, বলল তোনকা।
কী নাম রাখবেন ওটার, ম্যাগাস? জানতে চাইল মেরেন।
ওয়ার্লউইন্ড।
হ্যাঁ, সাথে সাথে একমত হলো ওরা। দারুণ মানানসই নাম।
দশদিনের ভেতর মাকে ঘিরে ঘাস খেতে লেগে গেল ওয়ার্লউইন্ড। যখনই খিদে মেটার মতো দ্রুত ওলানে দুধ পাঠাচ্ছে না, তীব্রভাবে মাথা দিয়ে তো মারছে।
লোভী পিচ্চি, মন্তব্য করল তাইতা। আমরা পথে নামতে নামতে অনুসরণ করার মতো যথেষ্ট শীক্তশালী হয়ে উঠবে ওটা।
*
আবার দক্ষিণের পথ ধরার আগে পূর্নিমার চাঁদ ওঠার জন্যে আরও কয়েক দিন অপেক্ষা করল মেরেন। কলাম বরাবর এগোনোর সময় সব কটা খচ্চরের পিঠে বাঁধা পানির পাত্র ও চুনা পাথরের পাউডারের থলে পরখ করছে তাইতা, লক্ষ করল মেরেন। দ্রুত ব্যাখ্যা করল ও, আমি নিশ্চিত ওগুলোর আর দরকার হবে না, কিন্তু…, কৈফিয়ত খুঁজে বেড়াতে লাগল সে।
তাইতা নিজেই দিল জবাবটা। ফেলে যাওয়ার মতো তুচ্ছ জিনিস নয় ওগুলো। কেবুইতে বিক্রি করা যাবে।
ঠিক একথাটাই ছিল আমার মাথায়, স্বস্তি পেল মেরেন। এক মুহূর্তের জন্যেও আপনার জাদুমন্ত্রের ক্ষমতায় সন্দেহ জাগেনি আমার। আমি নিশ্চিত, এখন থেকে সামনে কেবল মিষ্টি পানিই মিলবে।
