সন্দিহান ভঙ্গিতে পানি শুকল উইন্ডস্মোক, তারপর খেতে শুরু করল। জিনের পেটি ঢিল করে ওর পেট প্রসারিত হওয়ার সুযোগ করে দিল তাইতা। শুয়োরের ব্লাডারের মতো চোখের সামনে ফুলে উঠল সে। ওকে পানি খেতে ছেড়ে দিল ও। পুকুরের পানি ভেঙে আগে বেড়ে বসে পড়ল। পড়ন্ত জল ওর চিবুক স্পর্শ করছে; চোখ বন্ধ করল ও। মুখে পরমানন্দের হাসি।
ম্যাগাস! নদীর কিনার থেকে ওকে ডাকল মেরেন। এটা আপনার কেরামতি। আমি নিশ্চিত। নদীটাকে বিশ্রী রোগ থেকে সারিয়ে তুলেছেন। ঠিক বলেছি না?
ওর উপর মেরেনের বিশ্বাস সীমাহীন, মন ছুঁয়ে যায়। ওকে হতাশ করা ঠিক হবে না। চোখ খুলল তাইতা, অন্তত শখানেক লোক ওর জবাবের অপেক্ষায় তীরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ওর উপর ওদের আস্থা গড়ে তোলাটাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে। মেরেনের দিকে তাকিয়ে হাসল ও, তারপর হেঁয়ালির ভঙ্গিতে ডান চোখ টিপল। হতবাক দেখাল মেরেনকে, পরমুহূর্তে খুশিতে চিৎকার করে উঠল লোকজন। পুকুরে নেমে জল ভেঙে আগে বাড়ল ওরা, পরস্পরের দিকে পানি ছিটাতে লাগল। তারপর একে অন্যের মাথা চেপে ধরল পানির নিচে। ওদের ফুর্তি করতে দিয়ে তীরে উঠে এলো তাই। এরই মধ্যে পানি আর বাচ্চায় এমন ফুলে গেছে যে না হেঁটে বরং জল ভেঙে আগে বাড়ল উইন্ডস্মোক। ওকে টলটলে শাদা নদীতে নিয়ে এলো ও, তারপর বসে পড়ল। ওটার দিকে তাকিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন ও ওর ওপর মেরেনের কৃতিত্ব চাপিয়ে দেওয়া নদীর অলৌকিক পরিষ্কার জল নিয়ে ভাবল।
পানির দূষণ এরপর আর ছড়ায়নি, সিদ্ধান্তে পৌঁছল ও। এখান থেকে দক্ষিণে নদীর জল একেবারে পরিষ্কার। ক্ষীণতোয়া, মরা; তবে টলটলে।
সেদিন সকালে বনের ছায়ায় তাঁবু খাটাল ওরা।
ম্যাগাস, ঘোড়াগুলো সামলে ওঠা পর্যন্ত এখানেই থাকার পরিকল্পনা করছি আমি। এখুনি রওনা দিলে ওদের হারাতে হবে। বলল মেরেন।
মাথা দোলাল তাইতা। বুদ্ধিমানের মতো কথা বলেছ, বলল ও। জায়গাটা ভালো করেই চিনি। মহান যাত্রার সময় পুরো একটা মৌসুম ছিলাম এখানে। এখানকার জঙ্গলে গাছপালা আছে যেগুলোর পাতা ঘোড়া খেতে পারবে। দারুণ পুষ্টিকর, কয়েক দিনের মধ্যেই চর্বিদার, তরতাজা করে তুলবে ওদের। তাছাড়া, উইন্ডস্মোকও অল্পদিনের ভেতরই বাচ্চা দেবে, মরুভূমির চেয়ে এখানেই ওটার বাঁচার সম্ভাবনা বেশি থাকবে, ভাবল তাইতা, কিন্তু মুখে বলল না।
প্রাণবন্তভাবে কথা বলছে মেরেন। পুকুরের কাছে অরিক্সের পায়ের ছাপ দেখেছি। লোকেরা খুশিমনে শিকার করতে পারবে, ভালো মাংস পেয়ে শোকর করবে। আমরা আবার রওয়ানা দেওয়ার সময় অবশিষ্টগুলোকে শুকিয়ে, সেদ্ধ করে সাথে নিতে পারব।
উঠে দাঁড়াল তাইতা। যাই, আমাদের পশুর জন্যে বিচালীর খোঁজ করি।
আমিও যাচ্ছি আপনার সাথে। এই ক্ষুদে স্বৰ্গটা আরেকটু ভালো করে দেখব। গাছপালার ভেতর একসাথে ঘুরে বেড়াতে লাগল ওরা, খাবার উপযোগি গুল্ম ও লতা চিনিয়ে দিল ওকে তাই। মরুভূমির সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে ওগুলো, খরা পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিয়েছে। লম্বা লম্বা গাছের ছায়ায় তরতর করে বেড়ে উঠছে ওরা। দুহাত বোঝাই করে শিবিরে ফিরল ওরা।
উইন্ডস্মোককে বুনো ফসলের নমুনা খেতে দিল তাইতা। খানিক চিন্তাভাবনা করে আলতো করে একটায় কামড় বসাল সে; তারপর আরও খাবে বলে নাক বাড়িয়ে দিল। একটা বিরাট সংগ্রাহক দল গঠন করে ওদের বনে নিয়ে এলো ও; খাবার উপযোগি গাছপালা চিনিয়ে দেবে যাতে ওগুলো তুলতে পারে। দ্বিতীয় আরেকটা দল নিয়ে গেল মেরেন। শিকারের খোঁজে বনের সীমানায় সন্ধান চালাল ওরা। কুঠারের আওয়াজে বিরক্ত হয়ে দুটো বিরাট অ্যান্টিলোপ শিকারীদের তীরের সহজ নিশানায় চলে এলো।
ছাল খসাতে উষ্ণ লাশ শিবিরে নিয়ে আসা হলে সাবধানে পরখ করল তাইতা। মদ্দা অ্যান্টিলোপটার শিং বেশ মজবুত, গাঢ় অসাধারণ রঙিন নকশাদার চামড়া। মাদীটা শিঙহীন, শরীরের গড়ন বেশ জটিল, পশম বাদামী, কোমল। জানোয়ারগুলো চিনেছি, বলল ও। কোণঠাসা হলে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে মদ্দাগুলো। যাত্রার সময় আমাদের এক শিকারী একটা বিরাট মদ্দার ঘাই খেয়েছিল। ওর কুঁচকির রক্তবাহী শিরা কেটে ফেলে ওটা, ওর সাথীরা আমাকে ডেকে পাঠানোর আগেই রক্ত ক্ষরণে বেচারা মারা যায়। মাংস, বিশেষ করে বৃক্ক আর কলিজা, অবশ্য খাসা।
পুকুর ধারে শিবির করার সময় লোকজনকে নৈমিত্তিক কাজের ধারায় ফিরে যাবার সুযোগ দিল মেরেন। ঘোড়াকে দানাপানি খাওয়ানোর পর ঘোড়া আর নিজেদের থাকার ব্যবস্থা করতে জঙ্গলের ভেতর মজবুত ও অনায়াস সুরক্ষিত দুর্গ বানানোর কাজে লাগিয়ে দিল ওদের। সেদিন সন্ধ্যায় কয়লার আগুনে সেঁকা ধুরা আটার রুটি দিয়ে আগুনে ঝলসানো অ্যান্টিলোপের মাংস, বুনো পুদিনা পাতা ও তাইতার বাছাই করা গুল্ম দিয়ে ভোজ পর্ব সারল ওরা। নিজের মাদুরে শোয়ার আগে আকাশ নিরীখ করতে জল ভেঙে পুকুরে নেমে এলো তাইতা। লস্ত্রিসের তারার শেষ আভাটুকুও মিলিয়ে গেছে, তবে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য মহাজাগতিক ব্যাপার রয়েছে। খানিকটা সময় ধ্যানমগ্ন রইল ও, কিন্তু কোনও মনস্তাত্ত্বিক উপস্থিতি টের পেল না। সোয়ে কেটে পড়ার পর ডাইনীর সাথে যেন ওর সমস্ত যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেছে।
শিবিরে ফিরে এলো ও, কেবল শান্ত্রীকেই জাগ্রত অবস্থায় পেল। ঘুমন্তদের বিরক্তির উদ্রেক না করতে ফিসফিস করে ওদের নিরাপদ প্রতিরক্ষার জন্যে প্রার্থনা করল ও, তারপর মাদুরের বিছানার দিকে এগিয়ে গেল।
