ইনানা দুঃখভারাক্রান্ত হয়ে মাথা নেড়ে বললেন, তুমি একজন নারীর সাথেই মিশেছো তায়তা। যখন এটা হয় তখনও আমি সেখানে ছিলাম। আমি তোমাকে সাবধান করতে পারতাম, কেননা এই ক্ষণিকের আনন্দের কারণে তুমি চরম মূল্য দিয়েছে, তোমার উপর খোঁজা করার ছুরি চালানো হয়েছিল। তার নিঃশ্বাস আমার মুখে অনুভব করছিলাম আর আমার হৃদয়ে তার মনের দুঃখ অনুভূত হল। তারপর তিনি বলে চললেন, আমি এই কষ্ট থেকে তোমাকে রেহাই দিতে পারতাম। কিন্তু যদি তা করতাম, অর্থাৎ এর পরিণতি কী হবে তা তোমাকে জানাতাম, তাহলে এখন তুমি আর আমি অনন্তকাল ধরে যে স্বর্গীয় শুদ্ধতায় যুগল হতে পেরেছি তা কখনও পারতাম না।
তার কথাটি শুনে আমি একটু ভাবলাম তারপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, তিনিও আমার সাথে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আমি স্বীকার করলাম, এটা অনেকদিন আগে ঘটেছিল, মেয়েটার চেহারাও আমার মনে নেই। এমনকি তার নামটাও মনে পড়ছে না।
তিনি ফিসফিস করে বললেন, এর কারণ আমি তোমার মন থেকে সেই স্মৃতি মুছে ফেলেছি। যদি তুমি চাও, তবে সেই স্মৃতি আবার ফিরিয়ে দিতে পারি আর তুমি পরবর্তী পাঁচ হাজার বছর তা তোমার মনে রাখতে পারো। তবে তা তোমার মনে কোনো খুশি বয়ে আনবে না। তুমি কি তা চাও?
সেই দুঃখি বেচারিকে আমি এখন অস্বীকার করে বললাম, তুমি জানো যে আমি তা চাই না। একসাথে ভাগাভাগি করে দুঃখকষ্টের দিনগুলো কাটাবার সময় আমরা একে অপরকে একটু স্বস্তি দিয়েছিলাম। সে আমাকে ভালোবাসা দিয়েছিল। তবে অনেকদিন আগে স্থান ও কালের অতল গহ্বরে সে হারিয়ে গিয়েছে। যেখানে সে চলে গেছে সেখানে কেউ তাকে অনুসরণ করতে পারে না; এমনকি একজন খোঁজা উপদেবতাও নয়।
এই মুহূর্তটির কাছে নিজেকে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করলাম। দুজনের দেহ আর মন পরস্পর সংবদ্ধ হওয়ার পর সময় আর নদীর মতো শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে না। এটি একটি প্রশান্ত সমুদ্রে পরিণত হল, যেখানে আমরা একত্রে ভেসে বেড়াতে লাগলাম; প্রতিটি মুহূর্তের আমেজ উপভোগ করতে লাগলাম যেন তা অনন্তকালের একটি অংশ। তিনি আমার আত্মার প্রতিরোধকে সমর্থন দিয়ে অশুভের বিরুদ্ধে একে আরও জ্ঞানী এবং অভেদ্য করে তুললেন।
দুজনে মিলে আমরা একটি আধ্যাত্মিক মর্যাদার অবস্থান অর্জন করলাম।
এক অনন্তকাল পর আমার আত্মা তার সাথে কথা বললো, এটা শেষ হোক, তা আমি চাই না ইনানা। আমি এভাবেই তোমার সাথে চিরকাল থাকতে চাই।
তারপর আমি আমার ভেতর থেকে তার কণ্ঠস্বরকে উত্তর দিতে শুনলাম:
তুমি আমার একটি অংশ আর আমিও তোমার একটি অংশ তায়তা। তবুও একই সাথে আমরা আলাদা এবং নিজেকে নিয়ে সম্পূর্ণ। আমাদের নিজেদেরও স্বতন্ত্র অস্তিত্ব আছে, যেখানে আমাদেরকে অবশ্যই ফিরে যেতে হবে। আমাদের নিজেদের আলাদা আলাদা নিয়তি রয়েছে আর তা আমাদের একাই সমাপন করতে হবে।
আমি মিনতি করে বললাম, দয়া করে আমাকে ছেড়ে চলে যেও না।
এবার আমার কাছ থেকে আলাদা হয়ে তিনি বললেন, এখন আমি তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি। এখন আমার যাওয়ার সময় হয়েছে।
আবার কি ফিরে আসবে?
হ্যাঁ আসবো।
আমি বললাম, কোথায়?
যেখানেই তুমি থাক।
কখন ইনানা? কখন আবার তোমাকে দেখতে পাবো?
একদিন, এক বছর কিংবা হাজার বছর পর। অনুভব করলাম আমার আলিঙ্গন থেকে তার বাহু আলাদা হল।
আমি আবার অনুনয় করলাম, আরেকটু থাকো। কিন্তু তিনি ততক্ষণে চলে গেছেন। আমি উঠে বসলাম। হতবুদ্ধি হয়ে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম প্রাসাদের বারান্দায় ছোট খাটে আমি শুয়ে আছি। এক লাফে উঠে দৌড়ে শয়নকক্ষে গেলাম। বড় কামরাটির মাঝখানে দাঁড়িয়ে উল্টোদিকের দেয়ালে দরজাটা খুঁজলাম, যার মধ্য দিয়ে সেই রহস্যময় উদ্যানে ইনানা আর আমি উড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন সেখানে কোনো দরজা দেখতে পেলাম না।
ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে তন্ন তন্ন করে দেয়ালটা পরীক্ষা করতে শুরু করলাম। আঙুল বুলিয়ে দরজার ফাঁক খুঁজার চেষ্টা করলাম। দেয়ালে মসৃণ পলেস্তারা করা রয়েছে। মনে পড়লো ইনানা কী বলেছিলেন।
তোমাকে জানতে হবে তায়তা, আমাদের মতো দেবতা আর উপ-দেবতার পক্ষে সবকিছু সম্ভব।
মনে হল শেষ যখন এই জায়গায় দাঁড়িয়েছিলাম তারপর অনেক বছর পার হয়ে গেছে। সময়ের মাঝে এমন কী কোনো মাত্রা আছে, সুদূর সেই যে জায়গায় ইনানা আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন? ভাবলাম, যদি তেমন কোনো জায়গা থাকে, যখন আমি সেই জগতে ছিলাম তখন কি এই পৃথিবীতে সময় নিশ্চল হয়ে ছিল?
যখন বাস্তবতা থেকে কল্পনা আর মিথ্যা থেকে সত্যকে আলাদা করার চেষ্টা করছিলাম, তখন আমার চোখ পড়লো কামরার ঠিক মাঝখানে মেঝেতে দাঁড় করে রাখা বড় একটি ব্রোঞ্জের কলসের মতো আকৃতির ফুলদানির দিকে। ফুলদানিটিতে বড় এক গুচ্ছ গোলাপফুল সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সামনে এগিয়ে কাঁটাওয়ালা উঁটিতে ফুটন্ত গোলাপগুলো পরীক্ষা করলাম। শেষ যেরকম তাজা দেখেছিলাম, এখনও সেরকমই রয়েছে।
আমি জোরে জোরে বলে উঠলাম, আমার অবর্তমানে হয়তো এগুলো বেশ কয়েকবার বদলানো হয়েছে। তারপর নিচে তাকালাম। মার্বেল পাথরের মেঝেতে একটি লাল গোলাপ পড়ে রয়েছে। মনে পড়লো গত সন্ধ্যায় ফুলের সুগন্ধ নেবার জন্য গোলাপের গুচ্ছ থেকে এই ফুলটি বোঁটা থেকে ছিঁড়েছিলাম, তারপর এটা মেঝেতে ফেলে দিয়েছিলাম যাতে পরে প্রাসাদের পরিচারকেরা তা পরিষ্কার করতে পারে।
