তাহলে আর কিসে একজন নারী আর পুরুষের মধ্যে মিলন হয় ইনানা?
দেহের পরিবর্তে আত্মার মিলনের কথা বলছি। দুটি উচ্চতর মনের মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়ার কথা বলছি। আর তাই হচ্ছে অস্তিত্বের একটি প্রকৃত অলৌকিক দৃষ্টান্ত–যা খুব কমই পূর্ণতা পায়।
তিনি আমাকে রহস্য উদ্যানের সবুজ ঘাসের আচ্ছাদনে টেনে নামালেন। রেশমের মতো নরম। তিনি দ্রুত সপীল ভঙ্গিতে আমার উপর এলেন আর আষ্টেপিষ্টে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের দুজনের দেহ এক হয়ে মিশে গেল। আমার বুকে তার হৃৎস্পন্দন অনুভব করলাম।
ক্রমশ আমাদের দুটি হৃদপিণ্ড একটি অঙ্গ হয়ে স্পন্দিত হতে লাগলো। দুজনের মিলিত নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ঐকতানে দুটি ফুসফুসকে ধারণ করলো। এরকম আবেগ জনিত এবং তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি আমি আর কখনও অনুভব করিনি। আরও গভীরভাবে তার দেহের সাথে আচ্ছন্ন হয়ে আমার দেহের মাঝে তাকে সম্পূর্ণ গ্রাস করে ফেলতে চাচ্ছিলাম যাতে আমরা দুজন একটি মাত্র দেহে পরিণত হই।
অনুভব করলাম তার মন আমার মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে, এই অনুভূতি আমাকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুললো, আমি অসহায়বোধ করতে লাগলাম। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম, তবে বুঝতে পারলাম তার মতো আমিও তার মনের দখল নিতে চেষ্টা করছি। তিনি আমার সকল স্মৃতি নিয়ে নিতেই আমিও তারগুলো সঞ্চিত করলাম। দুজনের মাঝে কোনোকিছুই আর হারালো না কিংবা মন থেকে মুছে গেল না। আমরা এমন একটি অস্তিত্বের অংশীদার হলাম যা সুদূর অতীত থেকে শুরু হয়েছে।
ফিসফিস করে বললাম, এখন আমি জেনেছি কে আমার বাবা?
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কে? প্রশ্নটি করলেও তিনি উত্তরটি জানতেন। আর উচ্চারণ না করলেও আমি প্রশ্নটি শুনেছিলাম।
স্বর্গীয় নীরবতার মাঝে আমি উত্তর দিলাম, তিনি হচ্ছেন রাগ এবং নৈতিকতার দেবতা, মেনিওটস।
ইনানা জিজ্ঞেস করলেন, তাহলে তোমার মা কে?
আমরা দুজনে যে একটি মাত্র মনের অংশীদার ছিলাম, সেই মন থেকে উত্তরটি খুঁজে নিয়ে আমি বললাম, সেলিয়া ছিলেন আমার মা। তিনি একজন মরণশীল মানুষ ছিলেন। আমাকে জন্ম দেওয়ার পর তিনি মারা যান।
তুমি একজন নর-দেবতা তায়তা। পুরোপুরি মানুষও নও আবার সম্পূর্ণ দেবতাও নও। দীর্ঘজীবি হলেও তোমাকে একদিন মরতে হবে। তিনি শক্ত করে তার আত্মা দিয়ে আমার আত্মাকে চেপে ধরে বললেন, যদিও তার অনেক দেরি। যেদিন এটা হবে তখন আমি তোমাকে ধরে রাখবো। তারপর তুমি চলে যাবার পর হাজার বছর তোমার জন্য শোক করবো।
তুমি কে ইনানা? কেন আমি তোমাকে দেহমনে এতো আপন মনে করছি? তোমারা বাবা কে?
এবার তিনি সরাসরি উত্তর দিলেন, আমার বাবা হলেন আলোর দেবতা, হাইপেরিয়ন। তিনি মেনিওটসের ভাই। কাজেই তুমি আর আমি, দুজনেই একই দেবসূলভ রক্তধারার।
আমি নীরবে উত্তর দিলাম, প্রশ্নটি করার আগেই উত্তরটি আমি পেয়েছি। আর তোমার মা? তিনি কী একজন মরণশীল মানবী না দেবী ছিলেন?
ইনানা উত্তর দিলেন, আর্টেমিস আমার মা।
আমি বললাম, আর্টেমিস হচ্ছেন শিকার এবং সমস্ত বন্য প্রাণীর দেবী। আবার তিনি একজন কুমারী দেবী এবং কুমারীদেরও দেবী। কী করে তিনি একজন কুমারী আবার সেই সাথে তোমার জন্মদাত্রী মা হতে পারলেন?
তুমি তো জানো তায়তা, আমাদের মতো দেবদেবী এবং উপ-দেবতার পক্ষে সবকিছুই সম্ভব। আমার জন্মের এক ঘন্টা পর আমার বাবা হাইপেরিয়ন আমার মায়ের কুমারীত্ব ফিরিয়ে দেন।
তার বাবা যে চমৎকার সমাধান দিয়েছিলেন তার বাস্তবতার কথা ভেবে আমি মৃদু হাসলাম আর অনুভব করলাম ইনানাও মৃদু হেসেছেন। তারপর বললেন, তবে আমার মায়ের মতো আমিও একজন কুমারী এবং সকল দেবতার পিতা জিউসের এক অধ্যাদেশ বলে আমি চিরকাল কুমারীই থাকবো। এটা হচ্ছে আমার জন্য একটি শাস্তি, কেননা আমার পিতামহ জিউস যখন আমার সাথে অজাচারী হয়ে যৌনসঙ্গম করতে চেয়েছিলেন তখন আমি তাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম।
আমি তাকে সমবেদনা জানিয়ে বললাম, সামান্য অপরাধে এটি একটি নিষ্ঠুর শাস্তি।
কিন্তু আমি তা মনে করি না তায়তা। আমার মনে হয় এটি অত্যন্ত সদয় এবং মধুরতম একটি শাস্তি। আর নয়তো এতোগুলো বছর যে চলে গেল আর আগামী আরও অনেক বছর কীভাবে আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা থাকবো। আর তারপরও আমাদের কৌমার্য আর পবিত্রতা অক্ষুণ্ণ রেখে?
কে আমাদের ভবিতব্য বলতে পারবে ইনানা? তুমি যে সময়ের কথা বলছো সেই সুদূর অতীতে তো আমার জন্মও হয় নি।
তোমার যখন জন্ম হয় তখন আমি সেখানে ছিলাম তায়তা। আর যখন তোমার পুরুষত্ব তোমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয় তখনও আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। আমি তখন কেঁদেছিলাম, যদিও জানতাম সেই ভয়ঙ্কর কর্মটির কারণে হাজার বছর ধরে আমরা কীভাবে উপকৃত হব।
তুমি হাজার বছরের কথা বলছো? এতোকাল কি আমরা একসাথে থাকবো ইনানা?
তিনি সরাসরি আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, তুমি হয়তো জানেনা, তবে তোমার জন্মের পর থেকেই আমি খুব কাছে থেকেই তোমার গতিবিধি অনুসরণ করেছি। তোমার জীবনে যা কিছু হয়েছে তা সবই আমি জানি। তোমার ছোটখাট প্রতিটি আনন্দ-বেদনা আমি লক্ষ্য করেছি।
কিন্তু কেন আমি, ইনানা?
কারণ আমরা এক সত্তা তায়তা। আমরা একই রক্তের এবং আমাদের নিঃশ্বাস একই।
আমি বললাম, তোমার কাছে লুকাবো না। তোমার মতো আমি কিন্তু বিশুদ্ধ নই। আমার জীবনে আমি অন্য নারীর সাথে দৈহিকভাবে মিলিত হয়েছি।
