আমি মেঝে থেকে ফুলটা তুলে গন্ধ শুঁকে দেখলাম আগের মতোই সুগন্ধ। তারপর আরও ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখলাম পানি না দেওয়া সত্ত্বেও ফুলটি বোঁটা থেকে ছেঁড়ার সময় যেরকম ছিল এখনও ঠিক সেরকমই তাজা আর অমলিন রয়েছে।
তাহলে আমি যে ধারণা করেছিলাম স্বর্গীয় আলিঙ্গনে আমি আর ইনানা এক জীবন কাটিয়েছি, আসলে তার বদলে কেবল এক রাত কাটিয়েছি? ভাবলাম, এটি কী করে সম্ভবপর। হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকলাম।
দরজার বাইরে মিসরি ভাষায় মানুষের কথা বলার আওয়াজ পাওয়া গেল। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, বাইরে কে?
রুস্তির কণ্ঠ শোনা গেল, আমি রুস্তি প্রভু।
কয়েক মুহূর্ত পর সে দরজার কাছে উদয় হল।
আমি বললাম, তুমি কোথায় ছিলে?
সে বললো, আপনি তো আমাকে বলেছিলেন সূর্য দিগন্তের উপরে উঠার পর আপনাকে জাগাতে।
কখন একথা বলেছি?
কেন গতরাতে আমাকে বিদায় দেবার সময় বলেছিলেন? তার মানে আমি কেবল এক রাত দূরে ছিলাম। কিংবা হয়তো এটা আদৌ ঘটেনি। হয়তো পুরোটাই একটি স্বপ্ন ছিল, তবে আমি মরিয়া হয়ে আশা করছিলাম এটা তা হতে পারে না। এর মধ্যেই আমার আবার ইনানার সাথে অভিসারের আকাঙ্খ হচ্ছে, অবশ্য যদি সে আমার মনের অলীক কল্পনা না হয়ে আসলেই বাস্তব হয়। কল্পনা না বাস্তব, ইনানা কি আর সে কে; এই রহস্যের উত্তর কি কখনও পাবো?
আমি ভুলে গিয়েছিলাম রুস্তি, আমাকে ক্ষমা কর।
অবশ্যই প্রভু। তবে আপনি নন বরং আমিই ক্ষমা চাইবো। রুস্তি চমৎকার একজন মানুষ আর আমি তাকে সত্যি ভালোবাসি। যাইহোক তাকে আবার মনে করিয়ে দিয়ে বললাম, ভুলো না, আর পাঁচ দিনের মধ্যে আমরা সিডন রওয়ানা দিচ্ছি। সবকিছু গোছগাছ করে আবার সফরের প্রস্তুতি নাও।
আমি বেশিরভাগ জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে দিয়েছি। এক ঘন্টার মধ্যেই আমি রওয়ানা দিতে প্রস্তুত।
৬. পরবর্তী পাঁচটি দিন
পরবর্তী পাঁচটি দিন ব্যবিলনে অত্যন্ত ব্যস্ততার মধ্যে কাটলো। নিমরদ আর তার সভাসদদের সাথে শেষ বারের মতো সাক্ষাতকার, দুই জাতির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর আর চুক্তি মোতাবেক আমি যে কথা দিয়েছিলাম বাকি রূপা থিবসে নিমরদের প্রতিনিধির কাছে হস্তান্তর করা হবে, তার ব্যবস্থা করা। মনে মনে খুশি হলাম যে, বাহককে বাকি ২৭ লাখ রূপা প্রদানের জন্য বাজপাখি সীলমোহর দিয়ে স্বাক্ষরিত আমার দেওয়া প্রতিশ্রুতি পত্রটি যখন ফারাও ত্যামোসের সামনে উপস্থিত করা হবে তখন আমি সেখানে উপস্থিত থাকবো না।
সর্বোপরি আমাদেরকে স্বাগত জানিয়ে ক্রিটে নিয়ে যাবার জন্য সর্বাধিরাজ মিনোজ ব্যবিলনে যে দূত পাঠিয়েছেন তার আগমন। উচ্চপর্যায়ের সফরসঙ্গি নিয়ে কুমুসস বন্দর থেকে রণতরীর বহর নিয়ে সে রওয়ানা দিয়েছিল। জাহাজগুলো সিডন বন্দরে রেখে সফরসঙ্গীদের নিয়ে স্থলপথে দূত আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে।
তার নাম তোরান, মিনোয়ান ভাষা থেকে অনুবাদ করার পর এর অর্থ হয় যাঁড়ের পুত্র। সে একজন সুদর্শন ব্যক্তি আর পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী এবং শক্তিশালী একজন রাজার প্রতিনিধি হিসেবে বেশ জাঁকজমকের সাথে সফরে এসেছে। রাজা নিমরদ তার সফরসঙ্গীদের থাকার জন্য প্রাসাদের পুরো একটি অংশ ছেড়ে দিয়েছেন। ক্রিটের অতিথিদের আপ্যায়ন এবং আহার বিহারের ব্যবস্থা করার জন্য নিমরদকে আমার দেওয়া তিন লাখ রূপার বেশ কিছু অংশ খরচ করতে হচ্ছিল। তাই তিনি চাচ্ছিলেন তোরান যেন অতি শিঘ্রই ক্রিটে ফিরে যায়।
সুন্দর চেহারা এবং রাজকীয় আচার আচরণ ছাড়াও তোরান ছিল তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন এবং বিচক্ষণ একজন লোক। এযাবত আমি যত বুদ্ধিমান মানুষের মোকাবেলা করেছি সে ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রথম সাক্ষাতেই আমাদের মধ্যে একটি পারস্পরিক শ্রদ্ধার বন্ধন সূচিত হল; আর সেই সাথে আমরা একে অপরের উচ্চস্তরের গুণাবলি শনাক্ত করতে পারলাম।
একটি বিষয়ে অবশ্য আমরা উভয়ে এক মত ছিলাম, আর তা হল বর্বর হাইকসোদের প্রতি চরম ঘৃণার মনোভাব পোষণ করা। কোনো ধরনের উস্কানি ছাড়াই গর্হিতভাবে তামিয়াতে ক্রেটান দুর্গে বর্বর হাইকসোদের হামলা আর পরবর্তীতে সেখানে বন্দী ক্রিট সেনাদের উপর নৃশংসতার ঘটনাটি নিয়ে প্রায় একঘন্টা সমবেদনা জানিয়ে কাটালাম। তোরানের সবচেয়ে ছোট ছেলেটিও সেখানে ছিল, আত্মসমর্পণের পর ওরা তার মাথা কেটে ফেলে।
অবশ্য আমরা কেউই বিশাল তিনটি ক্রেটান যুদ্ধ জাহাজ আর হাইকসোরা যে সর্বাধিরাজ মিনোজের ৫৮০ লাখ রূপার পিণ্ড লুট করে নিয়েছিল তা উল্লেখ করলাম না। ব্যাপারটি এমন, যেন এই বিশাল সম্পদের কখনও অস্তিত্বই ছিল না।
মিসরীয় ভাষায় তোরানের স্বাচ্ছন্দ্য বিচরণ লক্ষ্য করে পরিশেষে আমার মনে তোরানের উচ্চ প্রতিভা এবং প্রাগ্রসর ধীশক্তি সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় জন্মালো। বিভিন্ন বিষয়ে আমার বেশ কিছু লেখাও সে পড়েছে এবং তা নিয়ে গবেষণাও করেছে। সে জানালো নৌযুদ্ধের কলাকৌশল সম্পর্কে আমার গবেষণামূলক প্রবন্ধটি অবশ্যই একটি প্রতিভামূলক কর্ম। এছাড়া আমার বেশকিছু কবিতা সে মিনোয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছে।
দ্বিতীয় দিনে আমরা দুই পরাক্রমশালী জাতির মাঝে প্রস্তাবিত মৈত্রির বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। কীভাবে চুক্তিটি সম্পাদিত হবে তার নানা দিক নিয়ে তিন দিন আলোচনা চললো। তারপর চতুর্থ দিনে সন্ধিচুক্তিটি স্বাক্ষরিত হল। আমি অবশ্য চুক্তিটি মিসরীয় গূঢ়লিপি এবং মিনোয়ান রৈখিক এ-হরফে লিখে রেখেছিলাম।
