আমি ঘুরে এর মুখোমুখি হতেই চমকে উঠতেই আমার হাত থেকে মদের পানপাত্রটি সশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল। একটি মুহূর্তের জন্য আমার হৃৎস্পন্দন স্তব্ধ হল, তারপর আবার একটি ছুটন্ত ঘোড়ার খুরের শব্দের মতো ধকধক করে উঠলো।
মন্দিরের সেই রহস্যময়ী নারীটি আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন; এতো কাছে যে মাথা ঢাকা কাপড়ের ছায়ার নিচে আমি তার চেহারা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। হাত বাড়ালেই তাকে ছুঁতে পারবো, কিন্তু আমি কোনো নড়াচড়া করলাম না।
শেষপর্যন্ত কথা বলার শক্তি ফিরে পেয়ে গভীর শ্রদ্ধা নিয়ে চাপাস্বরে বললাম, আপনি কে?
আমার নাম ইনানা।
তার উত্তর শুনে আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেল। তার কণ্ঠের আওয়াজটি আমার কানে স্বর্গীয় সঙ্গীতের মতো অনুরণিত হল। আমি সাথে সাথে বুঝতে পারলাম এতো সুন্দর শব্দ কোনো মানব কণ্ঠ থেকে বের হতে পারে না। আর যে কথাটি তিনি বলেছিলেন তার অর্থও অত্যন্ত লক্ষণীয়। ইনানা ছিল সেই সময়ের শুরু থেকে দেবী ইশতারের প্রাচীন নাম।
আমি শুধু বললাম, আমার নাম তায়তা।
নাম ছাড়া নিজের সম্পর্কে আর কিছু জানো তুমি? এমনকি তোমার বাবা মারও নাম জানো না। একথাটি বলে সহানুভূতি সহকারে মৃদু হাসলেন।
আমি বললাম, না জানি না। সমবেদনা নিয়ে তিনি আমার দিকে এক হাত বাড়ালেন আর কোনো ইতস্তত না করে আমি তার হাত ধরলাম। সাথে সাথে অনুভব করলাম তার দেহ থেকে উত্তাপ আর শক্তি আমার দেহে সঞ্চারিত হল।
ভয় পেয়োনা তায়তা। আমি তোমার বন্ধু, আর বন্ধুর চেয়েও বেশি।
না, আমি ভয় পাইনি ইনানা। তিনি আরেক হাত বাড়িয়ে দিলেন আর হাতটি ধরতেই আমাদের মাঝে রক্ত এবং মনের একটি শক্তিশালী বন্ধনের অস্তিত্ব অনুভব করলাম।
সবিস্ময়ে বলে উঠলাম, আমি আপনাকে চিনি! মনে হচ্ছে সেই শুরু থেকেই চিনি। বলুন আপনি কে।
আমার সম্পর্কে বলার জন্য এখানে আসিনি। তোমার সম্পর্কে বলার জন্য এসেছি আমি। আমার সাথে এসো তায়তা। তখনও আমার দুই হাত ধরে তিনি আমাকে নিয়ে পিছিয়ে যেতে যেতে বারান্দা থেকে আমার শয়নকক্ষের দিকে চললেন। তার পায়ের চলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল না। কেবল তার পরনের ঘাগরার মৃদু খসখস শব্দ শোনা যাচ্ছিল। আমার মনে হল তার পা মাটি ছুঁয়ে চলছে না, মাটি থেকে একটু উপরে শূন্যে তিনি ভেসে চলেছেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লণ্ঠনের আলোয় আলোকিত সুন্দর যে কামরায় আমি থেকে এসেছি তার প্রতি ইঞ্চি জানতাম। তবে এখন দেখলাম বিপরীত দিকের দেয়ালে একটি দরজা দেখা যাচ্ছে যা এর আগে আমার চোখে পড়েনি। ইনানা আমাকে নিয়ে দরজাটির দিকে এগোতেই এটি আপনাআপনি খুলে গেল। দরজার ওপাশে ভীষণ অন্ধকার। তারপরও হাত ধরাধরি করে আমরা অন্ধকারে ঝাঁপিয়ে পড়তেই অন্ধকার চারদিক থেকে আমাদেরকে গ্রাস করে ফেললো। আমরা নিচের দিকে নামতে লাগলাম, তবে তিনি আমার হাত ধরে রইলেন আর আমার মনে কোনো ভয় এলো না। নিচের দিকে নামার সময় এতো জোর বাতাস আমার মুখে ঝাঁপটা মারছিল যে আমাকে চোখ বন্ধ করে রাখতে হল। মনে হল যেন অনন্তকাল ধরে আমরা অন্ধকারে উড়ে চলেছি, তবে আমি জানি সময় এখানে একটি মায়া। তারপর একসময় পায়ের নিচে শক্ত মাটি অনুভব করলাম, আর নড়াচড়া করছি না। সেখানে প্রথমে একটু মৃদু আলো দেখা গেল। আমি আবার ইনানার মাথার আকার দেখতে পেলাম, তারপর ধীরে ধীরে এর নিচে তার পুরো অবয়ব ফুটে উঠলো। দেখলাম আমার মতো তিনিও পুরোপুরি নগ্ন।
আমার দীর্ঘ জীবনে আমি অনেক সুন্দরি নারীর শরীর দেখেছি। তবে ইনানা তাদের সকলকে অনেক দূর ছাড়িয়ে গেছেন। চওড়া নিতম্বের উপর সরু কোমর তার সুগঠিত দৈহিক সৌন্দর্যকে মনোরম করে তুলেছে। তিনি আমার মতোই লম্বা আর তার সারা দেহের অঙ্গপ্রতঙ্গ এমন নিটোল আর মসৃণ যে আমি হাত বাড়িয়ে তাকে না ছুঁয়ে পারলাম না। হালকাভাবে তার কোমরের কাছ থেকে বাহু বেয়ে আমার আঙুলের ডগা কাঁধ পর্যন্ত বুলিয়ে নিলাম। রেশমের মতো মসৃণ চামড়া তবে তার নিচের পেশি অনমনীয়।
চুল উঁচু করে ঝুঁটি বাঁধা ছিল, তবে মাথা একবার ঝাঁকাতেই ঢেউ খেলানো লম্বা চুল কাঁধের দুপাশ দিয়ে ঝলমলিয়ে হাঁটু পর্যন্ত নেমে এলো। সারা দেহে কোনো পশম নেই।
আলো তখনও বেড়ে চলছিল আর এবার আমি বুঝতে পারলাম আমরা ব্যবিলন নগরীর বাইরে অনেক উঁচুতে শূন্যোদ্যানের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছি। চতুর্দিকে চমৎকার লতাগুল্ম আর ফুলগাছ আমাদেরকে জড়িয়ে রয়েছে, তবে ইনানার সৌন্দর্যের কাছে এগুলো ম্লান হয়ে রয়েছে। তিনি কাঁধ থেকে আমার হাত নিয়ে একটার পর একটা হাতে চুম্বন করলেন। আবেশে আমার সারা দেহ শিহরিত হল।
আপনি আমার কাছ থেকে কী চান, ইনানা? কণ্ঠস্বরটি শুনে মনে হল এটি আমার নয়।
আমি তোমার সাথে মিলিত হতে চাই।
আমি লজ্জায় ফিসফিস করে বললাম, আপনি নিশ্চয়ই জানেন আমি একজন পূর্ণ মানুষ নই। অনেক দিন আগেই আমাকে খোঁজা করা হয়েছে।
শান্ত ভাবে সমবেদনার স্বরে তিনি বললেন, হ্যাঁ। যখন এটা করা হয় তখন আমিও সেখানে ছিলাম। তুমি যেমন ছুরির ধার অনুভব করছিলে তেমন আমিও তা অনুভব করছিলাম। আমি তোমার জন্য কেঁদেছিলাম তায়তা। তবে নিজের জন্য আনন্দিত হয়েছিলাম। যুগলে হওয়া মানে মিলিত হওয়া নয়। আমি শুধু ক্ষণস্থায়ী দৈহিক মিলনের কথা বলছি না।
