.
রূপাগুলো পাওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নিমরদের সেনাবাহিনীর কারখানাগুলোতে পুনর্দোমে কাজ চলতে লাগলো। নতুন বর্ম আর অস্ত্রশস্ত্র উৎপাদন শুরু হল, পুরোনো রথগুলো মেরামত করা হল আর আমার দেওয়া নকশা মোতাবেক উন্নত প্রযুক্তির শত শত নতুন রথ তৈরি হতে লাগলো। নতুন যোগদান করা সেনাসদস্যদের পদচারণায় ব্যবিলনের রাস্তাগুলো প্রকম্পিত হয়ে উঠলো হল আর বাজারগুলোও ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষিতে মুখরিত হল।
ফাট তুর এবং তার গুপ্তচরদের কাছ থেকে আমি জানতে পারলাম সুমেরিয়ার প্রতিটি শহরে একই রকম সমর প্রস্তুতি নতুন জীবন দান করেছে। বেকার প্রাক্তন হাজার হাজার সুমেরিয় যোদ্ধা আবার রাজার সেনাদলে যোগ দিতে ফিরে এলো।
যে কাজটি আমি শুরু করেছিলাম তা অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল ছিল, আর সুমেরিয়া ভাষা না জানার ভান করায় বিষয়টি আরও কঠিন হয়ে পড়লো। কাজেই আমি আমার আতিথ্যকর্তাদের সাথে শিশুর মতো ভাঙা ভাঙা সুমেরিয় বলতে শুরু করলাম। দিনে দিনে তা আরও সাবলিল এবং ব্যাকরণগতভাবে সঠিক হতে লাগলো। এমনকি রাজা নিমরদও সভাসদদের সাথে কথা বলার সময় আমার উপস্থিতিতে আমাকে লক্ষ্য করে অপমানজনক উক্তি করা থেকে বিরত হলেন। শিঘ্রই আমিও তাদের ভাষায় তাদের সাথে বিভিন্ন রকম শব্দ কৌতুক আর শব্দের খেলা শুরু করলাম।
বিকেলগুলোতে আবহাওয়া একটু ঠাণ্ডা হয়ে এলে আমি আমার দুই রাজকুমারীকে সাথে নিয়ে ইউফ্রেটিস নদীতে সাঁতার কাটতে যেতাম কিংবা শহরের সীমানার বাইরে দক্ষিণ দিকে পাহাড়ি এলাকায় ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতাম। অনেক সময় অনেক দূবরর্তী জায়গায় এসেও হঠাৎ জারাসের মুখোমুখি হলে আমার বেশ মজা লাগতো। মনে হত কেউ যেন তাকে আগে থেকেই জানিয়ে দিয়েছে যে আমরা এখানে আসবো। তবে এটা অবশ্যই তেহুতি হতে পারে না। কেননা তাকে আমাদের পথে দেখতে পেয়ে সে আমার থেকেও বেশি অবাক হত বা অবাক হওয়ার ভান করতো।
সন্ধ্যায় প্রায়ই আমাদের আতিথ্যকর্তা কিংবা আমার সেনাপতিদের সাথে নৈশভোজের আমন্ত্রণ থাকতো। এই সব ভোজে নিমরদ উপস্থিত থাকলে আমি দুই রাজকন্যাকে আমার কাছাকাছি বসাতাম যাতে তাদের উপর নজর রাখতে পারি।
সমস্ত কাজকর্ম সারার পর রাতে বারান্দায় একা বসে সেই ঘোমটায় ঢাকা নারীমূর্তির ফেরার অপেক্ষা করতাম। রাতের পর রাত তিনি আমাকে হতাশ করলেন।
ব্যস্তভাবে দিনগুলো দ্রুত কেটে যাচ্ছিল। তারপর একদিন সিডন বন্দরের নৌঘাঁটি থেকে খবর এলো নিমরদের কাছে কেনা ছয়টি রণতরী বেঁধে দেওয়া সময়সীমার বিশদিন আগেই পানিতে ভাসাবার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। লটবহরসহ আমাদের কাফেলা মধ্য সাগরের উপকূলে সিডন বন্দর পৌঁছাতে প্রায় দশ দিন লেগে যেতে পারে। আমি জারাস আর হুইকে ব্যবিলন থেকে উপকূল যাত্রার প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিলাম।
সেদিন সন্ধ্যায় রাজকুমারীদেরকে প্রাসাদের পূর্ব পাশে তাদের কামরায় পৌঁছে দিয়ে চাঁদ ডুবে যাওয়ার আগে আমার কামরায় ফিরে এলাম আমি। ক্রীতদাসেরা কামরায় আর বারান্দায় বিছানার পাশে তেলের প্রদীপে জ্বালিয়ে রেখেছিল। আমার নির্দেশমতো ওরা প্রদীপের তেলে ভেষজ মিশিয়ে দিয়েছিল। এতে যেমন মশা আর অন্যান্য কীটপতঙ্গ দূরে রইল তেমনি আমার সুনিদ্রা আর সুখস্বপ্ন দেখায় সহায়ক হল।
রুস্তি বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে পরনের পোশাক খুলে নিয়ে একটি রূপার পানপাত্র বিছানার পাশে রাখলো।
দীর্ঘদিনের সঙ্গী ক্রীতদাস রুস্তি আমার সেবাযত্নের ভার নিজ হাতে তুলে নিয়েছিল। সে আমাকে মনে করিয়ে দিল গত এক সপ্তাহ আমি রাতে কয়েক ঘন্টার বেশি ঘুমাই নি। সূতরাং আমার বেশি রাত জাগা ঠিক নয়।
সে চলে যাবার পর বারান্দার বিছানার কাছে গিয়ে মদের পানপাত্রটি তুলে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তৃপ্তির শ্বাস নিলাম। মেশিরে আমার জমিদারিতে নিজের আঙুর বাগান থেকে চোলাই করা আনা দশ বছরের পুরোনো উৎকৃষ্ট মদ। তারপর ফিরে দেবীর মন্দিরের বারান্দার দিকে তাকালাম। তবে সেখানে কেউ নেই। ঘোমটায় মুখ ঢাকা সেই নারীমূর্তিটিকে দেখার পর কয়েক সপ্তাহ পার হয়ে গেছে।
মার্বেল পাথরের মেঝের উপর পায়চারি করতে করতে সেদিন সন্ধ্যায় রাজার সাথে যে আলোচনা হয়েছিল তার বিশেষ দিকগুলো মনে মনে ভাবতে লাগলাম।
হঠাৎ মাঝপথে থেমে পড়লাম। চাঁদের আলোর রং বদলে গিয়ে অতিসূক্ষ সোনালি জ্যোতি ছড়িয়েছে। মুখ তুলে চাঁদের দিকে তাকালাম। সাথে সাথে বুঝতে পারলাম এখানে কোনো অনৈসর্গিক শক্তি কাজ করছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারলাম না এই শক্তি মঙ্গলকর না ক্ষতিকর। অমঙ্গল এড়াতে দুই আঙুলে হোরাসের চিহ্ন আঁকলাম, তারপর এই রহস্যময় শক্তির নিজেকে প্রকাশিত করার জন্য নীরবে অপেক্ষা করে রইলাম।
ক্রমশ সচেতন হলাম রাতের উষ্ণ বাতাসে একটি অতিসুক্ষ এবং বিস্মৃতিপ্রবণ সুগন্ধি ছড়িয়ে পড়ছে। এ-ধরনের সুগন্ধ এর আগে কখনও অনুভব করিনি। তারপরও আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় জেগে উঠছে। অনুভব করলাম আমার ঘাড় আর কাঁধ থেকে অস্বাভাবিক কিন্তু প্রীতিকর একটি চাঞ্চল্য জেগে উঠে মেরুদণ্ড বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। এটি আমার কাছেই একটি শক্তির উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন করলো।
