কেমন করে আমি এই চতুর খোঁজা লোকটিকে বিশ্বাস করবো? একথা আর গোপন নেই যে, সে শেঠ আর অন্ধকারের অন্যান্য দেবতার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আবার কেউ কেউ এমনও বলে যে, সে নিজেও শূন্যতার ওপারের অন্ধকার আত্মার একজন। এতোটুকু বিড়বিড় করে বলার পর যখন বুঝলেন তিনি কী বলেছেন তখন ঘুরে ফাট তুরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন, আমার কথাগুলো তরজমা করলেই তোমার সর্বনাশ ডেকে আনবে! যদি করো তবে তোমার নিজের নাড়িভূড়ি দিয়ে পেঁচিয়ে তোমাকে শ্বাসরোধ করে মারবো, বুঝতে পেরেছো?
ফাট তুরের মুখ ফ্যাকাশে হল, সে দৃষ্টি নিচে নামিয়ে বললো, মহামান্য যা হুকুম করেন। নিমরদ আবার পায়চারি শুরু করলেন আর নিজের মনে বিড়বিড় করে কথা বলতে লাগলেন। তারপর আবার সামনে এসে থামলেন।
ফাট তুরকে নির্দেশ দিলেন, বল আমি তাকে বিশ্বাস করি। তবে কোনো মৈত্রিবন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজি হওয়ার আগে আমি মিসরের ফারাও ত্যামোসের কাছ থেকে একটি অঙ্গিকার নামা চাই। এই শর্তটি বলার সময় আমি লক্ষ্য করলাম তার চোখে লালসাপূর্ণ ধুর্তামি ফুটে উঠেছে।
সরাসরি জবাব এড়িয়ে আমি সতর্কতার সাথে বললাম, যদি আদৌ তা সম্ভব হয়, আমি জানি ফারাও তা মেনে নেবেন।
তারপর নিমরদ বললেন, আমি আমার নিজের পরিবারের সাথে মিসরের রাজপরিবারকে একত্রিত করতে চাই। আমি ফারাওয়ের দুই বোন তেহুতি আর বেকাথাকে আমার স্ত্রী হিসেবে পেতে চাই। তাহলে ফারাও আর আমি পরস্পরের ভগ্নিপতি হব।
তার লোভ, ধৃষ্টতা আর কামুকতার সীমা দেখে আমি হতবাক হলাম। পাজি লোকটি টাকা আর খাবার দুটোই চায়। এই নোংরা জীবটি আমাকে উদ্দেশ্য করে যথেষ্ট অপমানজনক কথা বলেছে আর এখন খোলাখুলিভাবে আমার আদরের রাজকুমারীদের দিকে লালসাপূর্ণ হাত বাড়িয়েছে।
রাগ দমন করে যথাসম্ভব স্বাভাবিক কণ্ঠে আমি বললাম, এই প্রস্তাবটি করে মিসরের প্রতি আপনি অশেষ সম্মান দেখিয়েছেন। অন্য যেকোনো পরিস্থিতিতে আমি জানি ফারাও আপনার প্রস্তাব গ্রহণ করতে একমুহূর্ত দ্বিধা করতেন না। তবে ফারাও ইতোমধ্যেই আমাদের দুই জাতির সামরিক মৈত্রি নিশ্চয়তা করার উদ্দেশ্যে তার দুই বোনের সাথে ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের বিয়ে দেবার কথা দিয়েছেন। মিনোয়ানরা এই অপমান সহ্য করবে না।
নিমরদ কাঁধে একটি ঝাঁকি দিয়ে বিড়বিড় করে একটা অশ্লীল মন্তব্য করলেন।
তবে আমি বুঝলাম আমার প্রত্যাখ্যানে তিনি খুব একটা বিরক্ত হননি। আমরা দুজনেই জানতাম আমাদের চুক্তি থেকে যতটুকু সম্ভব সুবিধা হাতিয়ে নেওয়ার এটি একটা শেষ প্রচেষ্টা ছিল। আসলে কিছু কিছু মানুষ আছে, তাদেরকে যতই দেওয়া হোক না কেন ওরা আরও কিছু পেতে চায়।
নিমরদ আরেকবার কামরার চতুর্দিকে চক্কর দিয়ে আমার সামনে এসে থামলেন তারপর শেষ একবার চেষ্টা করে বললেন, আপনি যে তিনলাখ রূপার কথা বলেছেন তা আমি স্বচক্ষে দেখতে চাই। কেননা আমি বিশ্বাস করি না যে, আপনি আর আপনার ফারাও চুক্তির প্রতি সম্মান দেখাবেন। তবে আমি শুধু দেখতে চাই কীভাবে রূপাগুলো এতোক্ষণ পর্যন্ত আপনি লুকিয়ে রেখেছেন…. কথাগুলো নিমরদ সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে বলছিলেন এই আশায় যে, হয়তো আমি তার ফাঁদে পা দিয়ে ফাঁস করে দেই যে আমি সুমেরিয় ভাষা জানি। তবে আমি তাকে আবার হতাশ করে কথাগুলো তরজমা করার জন্য ফাট তুরের দিকে তাকালাম। নিমরদের ফাঁদগুলো এড়িয়ে যাওয়াটা আমি বেশ উপভোগ করছিলাম। অনেকটা এটনের সাথে বাও খেলার মতোই মনে হচ্ছিল।
নগরীর দেয়ালের বাইরে আমাদের পল্টনের শিবির থেকে রূপা আনার জন্য জারাস আর হুইকে পাঠালাম। পঞ্চাশজন লোক দুটি চার চাকার গাড়িতে রূপাগুলো আনলো। শেষ পর্যন্ত সভা কক্ষের মেঝেতে যখন এগুলো স্তূপ করে রাখা হল তখন দৃশ্যটি দেখতে বেশ সুন্দর লাগছিল। চকচকে রূপার স্কুপটির চারদিকে ঘুরে ঘুরে নিমরদ পিণ্ডগুলো ছুঁয়ে দেখতে লাগলেন আর এমনভাবে এগুলোর সাথে কথা বলতে লাগলেন যেন এগুলো তার পোষা প্রিয় কোনো প্রাণী।
সেই সন্ধ্যায় আবার নিমরদ আমাদের সম্মানে একটি ভোজের আয়োজন করলেন। এবার মদটি আগের চেয়ে অনেক ভালো ছিল। তবে এই মদ খাওয়ার ফলে অতিথীকর্তা আর তার সাঙ্গপাঙ্গদের আচরণ খুব একটা প্রশংসার যোগ্য ছিল না। ভোজে যেসব মহিলা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাদের অর্ধেকেই নিমরদ আর তার লোকদের বিকৃত কামনার শিকার হল।
সৌভাগ্যবশত আমার দুই রাজকন্যাকে তাদের কামরায় তালা বন্ধ করে রেখেছিলাম আর জারাস বারোজন সৈন্য নিয়ে তাদের দরজায় পাহারায় ছিল।
.
যে ছয়টি রণতরী নিমরদের কাছ থেকে কেনা হয়েছিল, সিডন বন্দরে সেগুলোর মেরামত কাজ চলছিল। ফামেনথ মাসের শেষে ওগুলো আমাদের হাতে আসবে।
এই সময়টুকু আমি রাজা নিমরদ আর তার উপদেষ্টাদের সাথে হাইকসোদের বিরুদ্ধে আসন্ন যৌথ হামলার বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা চালিয়ে গেলাম। আমি সেনাপতি রেমরেমকে ব্যবিলনে ফারাওয়ের সামরিক দূত হিসেবে থাকার জন্য মনোনীত করেছিলাম।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও কর্নেল হুইকে রেমরেমের সহকারী হিসেবে থাকার জন্য সম্মতি দিয়েছিলাম। আমার অভিভাবকত্বে হুই রথযুদ্ধের বিজ্ঞানে সবচেয়ে দক্ষ নায়ক হয়ে উঠেছিল। আমি জানি যখন মধ্যসাগরের উপকূল জুড়ে উত্তর মিসরে আমরা হাইকসোদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করবো তখন তার অভাব খুব অনুভব করবো। কিন্তু বেকাথা তার প্রতি যেরকম বিরূপতা দেখাচ্ছে সেক্ষেত্রে তাকে আমাদের সাথে ক্রিটে নিতে গেলে সে হৈ চৈ শুরু করে দেবে।
