পরিষদ কক্ষে ঢোকার পর দেখলাম নিমরদের সিংহাসন তখনও শূন্য। তবে অন্যান্য সভাসদ আর পদস্থ সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন। তারা সবাই উঠে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে স্বাগত জানিয়ে লম্বা টেবিলে বসালো। একটু পরই মূল দরজার বাইরে তূর্য ধ্বনি শোনা গেল।
ধীর ভাবগাম্ভীর্য পদক্ষেপে রাজা নিমরদ কামরায় ঢুকলেন। এতো সকালে তাকে এখানে দেখার সাথেই সাথেই আমার প্রথম চিন্তা ছিল, তিনি নিশ্চয়ই ইশতার দেবীর মন্দিরে তার নিত্যকার প্রেমলীলা বাদ দিয়ে আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন।
তার প্রতি আমার যে সম্মান দেখানো প্রয়োজন সে বিষয়ে আমি সচেতন হলাম আর এতে আরাধ্য কাজটি শুরু করতে আমার আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গেল। যথারীতি রাজকীয় সৌজন্য প্রদর্শনের পর আমি দাঁড়িয়ে সরাসরি রাজার উদ্দেশ্যে কথা বলতে শুরু করলাম।
মহামান্য, আমি এমন একটি স্পর্শকাতর এবং গোপনীয় প্রস্তাব দিতে চাই যা কেবল আপনি এবং আপনার একান্ত একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে বলা যেতে পারে। আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে, আমার প্রস্তাবটি আমাদের পারস্পরিক উপকারে আসবে এবং সেই সাথে এই মুহূর্তে আমরা যে সঙ্কটাবস্থার সম্মুখীন হয়েছি তা দূর করতে সূদূর প্রসারী প্রভাব ফেলবে।
একথা শোনার পর নিমরদ একটু থমকে গেলেন এবং মনে হল সিদ্ধান্ত নেওয়াটা এড়াবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না এবং অন্য কোনো বিকল্পে রাজি হলাম না। শেষ পর্যন্ত তিনি আমার সনির্বন্ধ অনুরোধে রাজি হলেন।
আমি সেনাপতি রেমরেমকে আমার ডান দিকে আর দোভাষি হিসেবে ফাট তুরকে বামে নিলাম। নিমরদ এডমিরাল এলোরাসকে টেবিলে থাকতে ইশারা করলেন, বাকিরা কামরা ছেড়ে চলে গেল।
কামরায় যখন কেবল আমরা পাঁচজন রইলাম তখন আমি রাজকীয় বাজপাখির সিলমোহরটা বের করে টেবিলে আমাদের মাঝে রাখলাম।
আমি নিশ্চিত মহামান্য নিশ্চয়ই এই বস্তুটির গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত আছেন।
যদিও এই প্রথম এটা দেখলাম তবে আমি বুঝতে পেরেছি এই সিলমোহর নিশ্চিত করছে যে আপনি মিসরের ফারাও ত্যামোসের কণ্ঠ এবং কর্তৃত্ব নিয়ে কথা বলছেন।
আপনি ঠিকই বলেছেন মহামান্য।
রাজা নিমরদ তার ঠাণ্ডা কালো চোখ আমার উপর নিবদ্ধ করলেন। আর কিছু না বললেন না, কেবল পানির দিকে শিকারের আসা টের পেয়ে একটি চিতাবাঘের তীক্ষ্ণতা নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। আমিও সেভাবে তার দিকে লক্ষ্য রাখলাম।
মহামান্য, আপনি এবং আমি দুজনেই অভিজ্ঞ যোদ্ধা। অভিজ্ঞতা আর জ্ঞান থেকে আমরা জানি শুধু মনোবল আর ক্ষুরধার তলোয়ারের পাত দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না, এর সাথে প্রয়োজন কী পরিমাণ রূপা আমরা শত্রুপক্ষের দিকে ছুঁড়ে মারতে পারি।
নিমরদ বললেন, বিষয়টি এভাবে কাউকে কখনও প্রকাশ করতে শুনিনি, তবে আপনি একজন বিবেচকের মতো সত্যি কথাটিই বলেছেন।
মিসরের ফারাও ত্যামোসের নামে আর যে বাজপাখির সিলমোহরটি আমি বহন করছি তার কর্তৃত্ববলে আমি আপনাকে ত্রিশ লাখ রূপা অর্পণের প্রস্তাব করছি শুধুমাত্র এই শর্তে যে, আপনি মিসরের সাথে একটি সামরিক চুক্তিতে আসবেন আর এই পরিমাণ অর্থ কেবল রাজা গোরাব এবং হাইকসো গোত্র বিনাশের কাজে ব্যবহার করবেন।
আমি শুনতে পেলাম আমার পাশে বসে রেমরেম একবার দ্রুত নিঃশ্বাস নিল। সে জানে আমি এই প্রস্তাবের জন্য ফারাওয়ের অনুমোদন নেই নি আর এও জানে এতে আমি কী ধরনের ঝুঁকি নিচ্ছি। তবে আমি মোটেই তার দিকে তাকালাম না। এদিকে নিমরদ সিংহাসনে বসে সামনে পেছনে দুলতে লাগলেন আর অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। লক্ষ্য করলাম তার মুকুটের নিচে কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম নিচে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত যখন তিনি কথা বললেন তখন চরম অবিশ্বাস আর ধনতৃষ্ণায় তার গলার স্বর ফ্যাসফ্যাস করে উঠলো, এতোগুলো টাকা দিয়ে দেবার মতো সম্পদ কি আসলেই আপনার ফারাওয়ের কাছে আছে?
আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি মহামান্য যে, হ্যাঁ সে পরিমাণ সম্পদ তার আছে। আমাদের দুই রাষ্ট্রের মধ্যে এই বন্ধন সুনিশ্চিত করার জন্য এই মুহূর্তে আপনার হাতে তিন লাখ রূপা তুলে দেবার জন্য ফারাও আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। এরপর যা আসছে এটি তার সামান্য একটি নিদর্শন মাত্র।
কোনো কথা না বলে রাজা নিমরদ বেশ কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর অকস্মাৎ লাফ দিয়ে উঠে কামরার এক দিক থেকে অন্যদিকে পায়চারি শুরু করলেন। মুখ কুঁচকে রুষ্ট চেহারা নিয়ে এতোজোরে ঠোঁট কামড়ে ধরলেন যে এক ফোঁটা রক্ত চিবুক থেকে এমব্রয়ডারি করা রাজপোশাকে পড়লো।
তারপর হঠাৎ আমার সামনে এসে থেমে জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, এখন তিন লাখ আর আরও সাতাশ লাখ এক বছরের মধ্যে? কথাটা ফাট তুর তরজমা করার পর আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানালাম।
মহামান্য যা বলেন। তবে বাকি রূপা গ্রহণ করার জন্য আপনার সবচেয়ে চৌকশ একটি সেনা-পল্টন থিবসে পাঠাতে হবে। এতো রূপা ফারাও তার নিজের লোক দিয়ে পাঠাবার ঝুঁকি নেবেন না।
নিমরদ আবার ঘুরে পায়চারি শুরু করলেন। তার স্যান্ডেলের নিচে ব্রোঞ্জের তলি হাঁটার তালে খটখট শব্দ করছিল। এবার তিনি সুমেরিয় ভাষায় নিজের সাথে তর্ক শুরু করলেন।
