ফারাও আর মিসরের জন্য পরিস্থিতি বিপর্যয়ের দ্বারে টলমল করছে। সুমেরিয়া ব্যর্থ হলে আমাদের পূর্ব সীমান্ত সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। যে করেই হোক রাজা নিমরদকে এই সঙ্কটাবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে। তার জন্য নয়, বরং আমার জাতির অস্তিত্বের স্বার্থে এটা করতে হবে।
আমি হিসেব করে দেখেছি সুমেরিয়াকে আবার একটি সামরিক শক্তি হিসেবে দাঁড় করাতে রাজা নিমরদের কমপক্ষে ত্রিশ লাখ রূপা লাগবে।
আমাকে দ্বিমুখি সঙ্কট এড়াতে হবে। নিমরদ হচ্ছে এই দ্বিমুখি সঙ্কটের একটি কাঁটা আর দ্বিতীয়টি হচ্ছেন আমার প্রিয় ফারাও। নিমরদ নিঃস্ব আর এদিকে মেমনন ত্যামোস রূপার সমুদ্রে গড়াগড়ি দিচ্ছেন। তিনি প্রায় ছয়শো লাখ রূপার সম্পদের উপর বসে রয়েছেন। একা আমি যে আর কারও সহায়তা ছাড়াই তার জন্য এই সম্পদ এনেছি তার কোনো অর্থ নেই। কোষাগার তার, তবে আমি আমার মেমকে ভালোকরেই জানি। ছোটবেলা থেকে আমিই তাকে মানুষ করেছি আর তিনি যা কিছু জানেন তা সমস্ত আমিই তাকে শিখিয়েছি। আমিই তাকে শিখিয়েছি রূপা অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন তবে খরচ করা বড়ই সহজ। এখন যে করেই হোক তাকে আমার এই শিক্ষা ভুলাতে হবে। তাকে রাজি করাতে হবে যাতে তিনি ত্রিশ লাখ রূপা এমন একজন মানুষকে দেন যাকে তিনি চেনেন না এবং বিশ্বাস করেন না। জানি আর কোনো উপায় নেই। মিসরকে বাঁচাতে হলে তাকে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে।
সারাদিন রাজা নিমরদ আর তার সভাসদদের সাথে আলোচনার পর সন্ধ্যায় আমার ঘরে ফিরে এলাম। খুব একটা খিদে না থাকায় একটি পাকা ডুমুর, একটু পনির আর শক্ত রুটি দিয়ে একা রাতের খাবার সেরে নিলাম। কয়েক ফোঁটা মদ ঢেলে নিলাম তবে প্রথম চুমুকটি ভিনেগারের স্বাদের মতো মনে হল। গ্লাস সরিয়ে মেমকে পাঠাবার জন্য একটা বার্তা মুসাবিদা করার দিকে মনোযোগ দিলাম। এমন একটি বার্তা যা কবুতরের পায়ে বাধা পাতলা একটি পার্চমেন্টে জায়গা হয়। এমন একটি বার্তা লিখতে হবে যা ফারাও ত্যামোসের মনে এমন একটি কাজ করতে বিশ্বাস যোগায় যা করাটা তিনি পুরোপুরি নির্বুদ্ধিতা মনে করেন।
অনেক ঘন্টা পার হয়ে গেল, ইতোমধ্যে আমি ছয়টি খসড়া ছিঁড়েছি। তারপরও কাজ হচ্ছে না। বুঝতে পারলাম শুরু করার আগেই আমি ব্যর্থ হয়ে বসেছি। ভাঁজ করা পা সোজা করে লেখার টেবিল থেকে উঠে দাঁড়ালাম। দরজার সামনে গিয়ে বারান্দার বাইরে তাকালাম। নতুন চাঁদের উচ্চতা দেখে বুঝলাম মাঝরাত পার হয়ে গেছে।
হঠাৎ ছোট এক টুকরা মেঘ ভাসতে ভাসতে এসে চাঁদকে ঢেকে ফেললো। আমার চতুর্দিক সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল। ভেবেছিলাম চাঁদের আলো চলে যাওয়ায় আমার কষ্ট হয়তো আরও বেড়ে যাবে। তবে অলৌকিকভাবে বরং উল্টোটি হল। অনুভব করলাম এক মুহূর্ত আগেই আমার মনে যে অশান্তি ছিল তা দূর হয়ে গভীর প্রশান্তিতে মন ভরে গেছে।
তারপর শুনলাম কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। পরিষ্কার কন্ঠে কেউ আমাকে ডেকেছে, চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম কে ডাকছে। কিন্তু কেউ নেই, আমি একা।
তারপর হঠাৎ আমার সঙ্কটের একটি সমাধান আমার সামনে ভেসে উঠলো। আমি ভেবে পেলাম না কেন আমি এতোক্ষণ ইতস্তত করেছি।
আমার কাছে বাজপাখির সিল মোহর রয়েছে। আমার হাতে ফারাওয়ের সমস্ত ক্ষমতা রয়েছে। আমি জানি বিপদ থেকে দেশকে উদ্ধার করতে আর ধ্বংসের হাত থেকে ফারাওকে রক্ষা করতে আমাকে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতেই হবে। এমনকি তা ফারাওয়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও করতে হবে।
সিদ্ধান্তটি নেওয়ার পর আমি ভাবলাম কোথা থেকে আর কে আমাকে পথ দেখিয়েছে। আমার গভীর আনুগত্যের বিপরীতে স্বভাব বিরোধি এই সমাধানটি এমন যে, আমি বুঝতে পারলাম এই সিদ্ধান্তটি আমার একার ছিল না।
ছোট্ট মেঘটি সরে গিয়ে নরম চাঁদের আলো মধ্যরাতের পৃথিবীকে নরম আলোয় স্নাত করলো। ইশতারের মন্দিরের মার্বেল পাথরের দেয়ালে আলো পড়ে জ্বল জ্বল করে উঠলো।
আলখাল্লা ঢাকা নারী মূর্তিটি আবার আমার উল্টোদিকে মন্দিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন, ঠিক যেখানে এর আগে তাকে দেখেছিলাম। আগের মতোই রূপালি-ধূসর আলখাল্লায় তার মুখ ঢাকা। এবার আমি জেনেছি কোথা থেকে আমার অনুপ্রেরণা এসেছে।
আবার তার মুখ দেখতে আমার খুব ইচ্ছা হল। মনে হল কোন অলৌকিক বলে তিনি তা বুঝতে পেরেছেন। মাথা একবার হেলাতেই মুখ-মাথা ঢাকা আলখাল্লার অংশটি কাঁধের উপর খসে পড়তেই তার মুখ অনাবৃত হল। মুখটি চাঁদের চেয়েও স্নিগ্ধ। তাকে আগের চেয়েও সুন্দর দেখাচ্ছে, এর আগে এমন সুন্দর কোনোকিছু আমি আর দেখিনি।
আমি শূন্যে তার দিকে দুই হাত বাড়িয়ে দিলাম। তবে তার চেহারা দেখে মনে হল তিনি মনে দুঃখ নিয়ে আরও দূরে চলে যাচ্ছেন। আস্তে আস্তে পিছিয়ে গেলেন। ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেলেন আর তার সাথে চাঁদের আলোও ম্লান হয়ে এলো।
.
পরদিন সকালে আমি পোশাক পরে সম্পূর্ণ তৈরি হবার পর ফাট তুর আমার কামরায় এলো। পূর্ণ শক্তি আর দৃঢ়সংকল্প মনোভাব নিয়ে আর আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে আমি প্রস্তুত। লঘু পায়ে খুশিতে এমন দ্রুত হেঁটে চললাম যে, আমার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে রেমরেম, ফাট তুর আর দলের অন্যান্য সদস্যদের রীতিমতো ছুটে চলতে হচ্ছিল।
