আমার মনের প্রশ্নটি বুঝতে পেরে ফাট তুর বললো, মন্দিরের ছাদের উপরে একটি বিশাল ব্রোঞ্জের আয়না স্থাপন করা আছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সূর্যের চলার পথ অনুসরণ করে দশজন ক্রীতদাস চাকার উপর দিয়ে এটি টেনে নিয়ে যায়। যার ফলে সূর্যরশ্মি মূর্তির উপর প্রতিফলিত হয়। এর উদ্দিষ্ট পরিণতিটি ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। আলোকচ্ছটায় প্রজ্বলিত মূর্তিটির গা থেকে চলমান আলোক রশ্মি চারপাশের দেয়ালে ঠিকরে পড়ে এক অপূর্ব আবহ সৃষ্টি করেছে।
ফাট তুর জিজ্ঞেস করলো, প্রাচীরচিত্রগুলো লক্ষ্য করেছেন তায়তা? এখানে লেখা রয়েছে দুইশো শিল্পী বিশ বছরে এগুলো এঁকেছে।
আমি বললাম, সত্যি আশ্চর্যজনক। আমি যত মন্দির দেখেছি কোনোটাই এর সাথে তুলনা হয় না, এমনকি ফারাও ম্যামোসের সমাধি মন্দিরও নয়।
বিষয়বস্তুটি অপূর্ব তাই না, আপনি নিশ্চয়ই আমার সাথে একমত? ফাট তুর এমন গর্বভরে কথাগুলো বলছিল যেন সেই এগুলোর মালিক। তারপর সে আঙুল তুলে দেখিয়ে বললো, দেবী ইশতারের জ্বলন্ত অনুভূতি এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
মন্দিরের উঁচু দেয়ালে যুদ্ধসাজে সেনাদল হেঁটে চলেছে। ধূলির ঝড় উড়িয়ে রথ ছুটে চলেছে। আকাশ জুড়ে উড়ন্ত তীর ছড়িয়ে রয়েছে। লোকালয় আগুনে পুড়ছে আর যুদ্ধংদেহী সৈন্যদের আগে আগে শরণার্থীরা প্রাণভয়ে পালাচ্ছে। মৃত শিশু কোলে নিয়ে ক্রন্দনরত নারী বিজয়ী সেনাদলের কাছে করুণা ভিক্ষা করছে। বিশাল যুদ্ধজাহাজ ব্রোঞ্জের হাল দিয়ে ছোট ছোট নৌযানের পাশে গুতো মারছে আর ধ্বংসপ্রাপ্ত নৌযানের নাবিকেরা সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। পানিতে মৃতদেহ আর ভাঙা নৌযানের টুকরা ভাসছে। যুদ্ধক্ষেত্রের উপরে দেবী উড়ে বেড়াচ্ছেন আর বিজয়ীর দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন আর পরাভূত শক্তিকে নিন্দা করছেন।
ফাট তুর ধীরে ধীরে ঘুরে অন্যান্য দেয়াল আর তারপর তার শরীর পেছনে বাঁকিয়ে পঞ্চাশ কিউবিট উপরে ধনুকাকৃতির খিলান আর ছাদের দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললো, যুদ্ধ, প্রেম আর যৌনতা…আর কোনো মন্দিরে এ ধরনের যৌনসংসর্গঘটিত দেয়াল চিত্র আছে কি না আমি জানিনা।
আমি তাকিয়ে দেখলাম নারী ও পুরুষের অন্তরঙ্গ এবং আলিঙ্গনবদ্ধ দৃশ্য। দেবদেবীর যৌনলীলার দৃশ্য।
সবকিছুর উপরে উজ্জ্বল সাদা ডানাসহ দেবী ইশতার মাথার চারপাশে অগ্নিবৃত্ত নিয়ে তাদের উপর ঝুঁকে রয়েছেন।
আমি আর ফাট তুর ধীরে ধীরে গির্জার মূল অংশটি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দুইশোজন প্রশ্নসাপেক্ষ শিল্পীর বিশ বছর ধরে আঁকা এই বিশাল কাল্পনিক চিত্রকর্ম দেখে অত্যন্ত বিস্মিত হলাম।
প্রতিটি দেয়ালের একটু পর পর চারদিক দেয়ালঘেরা বড় বড় কামরা রয়েছে। আমি গুণে দেখলাম, একেক দিকে সাতটি করে দুই দিকের দেয়াল মিলে মোট চৌদ্দটি কামরা রয়েছে। ভেতরে কি আছে দেখা যাচ্ছে না, কেননা দরজায় অনেক নারী পুরুষ ভীড় করে রয়েছে।
আমি জানি ভেতরে কী হচ্ছে তা জানতে চেয়ে আমার প্রশ্নের জন্য ফাট তুর অপেক্ষা করছে, কিন্তু আমি আমার পদমর্যাদা বজায় রেখে নিচুপ থাকলাম। পরিশেষে সে সবুজ আলখাল্লা পরা একজন পুরোহিতের সাথে কথা বললো, সে তার সঙ্গিসাথীদের নিয়ে কাছের কামরার দরজার সামনে জটলা বেঁধে থাকা লোকজনদের হটালো। স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে মুখ কালো করে লোকেরা আমাদের জন্য পথ করে দেওয়ার পর আমরা ভেতরে ঢুকলাম।
গোলাকার কামরাটির দেয়াল ঘেঁসে মেঝেতে উজ্জ্বল রঙের চাদর দিয়ে ঢাকা বিছানা পাতা রয়েছে।
ফাট তুর ব্যাখ্যা করলো, চৌদ্দটি আলাদা আলাদা কামরায় চৌদ্দটি বিছানায় চৌদ্দজন নারী অবস্থান করছে। চৌদ্দ হচ্ছে দেবী ইশতারের ঐন্দ্রজালিক সংখ্যা, যার উদ্দেশ্যে এই ক্রিয়াকর্মটি উৎসর্গ করা হচ্ছে।
আমি উঁকি দিয়ে দেখলাম সংখ্যাটি সঠিক। সেখানে চৌদ্দজন মধ্য বয়ষ্কা অসুখি চেহারার নারী রয়েছে। সবার মাথায় লাল গোলাপের মুকুট, পরনে আর কিছু নেই। সবাই মাথা নিচু করে বসে রয়েছে।
ফাট তুর আবার ব্যাখ্যা করলো, লাল গোলাপ দেবী ইশতারের ফুল।
আমার পেছনে দাঁড়ান একজন নাবিক আমাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা মেরে হটিয়ে ভেতরে ঢুকলো। গোলাপের মুকুট পরা একজন মহিলার সামনে গিয়ে সে বললো, আমি তোমাকে দেবীর ঋণ শোধ করার আহ্বান জানাচ্ছি। এই কথাটি বলে সে একটি মুদ্রা মহিলার দিকে ছুঁড়ে মারলো। মহিলাটি ঘৃণাভরে তার দিকে তাকাল।
এরপর আমি আর সেখানে থাকতে পারলাম না, ফাট তুরের হাত ধরে টেনে নিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এলাম। সুন্দর একটি বিষয়কে এই নোংরা লোকগুলো এমন বিকৃত রূপ দিয়েছে, যা আমার মনকে আনন্দের বদলে বিষণ্ণ করে তুলেছে।
.
পরদিন বিকেলে রাজা নিমরদ ইশতার দেবীর মন্দির থেকে নিত্যদিনের পূজা শেষে ফিরে আসার পর আমি তার সাথে আলোচনায় বসলাম। রাজার সাথে তার সামরিক কর্মকর্তা এবং জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন।
সেনাপতি রেমরেম আর আমি দুজনে মিলে হাইকসোদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাবার জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছিলাম।
সবকিছু আটকে রয়েছে নিমরদের অর্থাভাবের কারণে। ছয়টি যুদ্ধ জাহাজ কেনা বাবদ যে টাকা আমি দিয়েছিলাম, তা তার প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই ছিল না। প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত কর আদায়ের পরও গত দুই বছরে সেনা আর নৌবাহিনীর বেতন মেটানো যায় নি। অস্ত্রশস্ত্র, রথ থেকে শুরু করে অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। আর অন্যান্য সেনারা বিদ্রোহের পথে রয়েছে।
