রাজার সাথে কথা বলার জন্য এলোরাস দ্বিতীয়বার কামরা ছেড়ে চলে গেল। আর ফেরার সময় রাজা নিমরদ তার সাথে এলে আমি বুঝলাম আমার দামে জাহাজগুলো বিক্রির জন্য তার আগ্রহ আছে।
এরপর সারা সকাল আর বিকেলের শেষ প্রহর পর্যন্ত রাজা নিমরদ আর আমি দুজনে আরবি ঘোড়ার ব্যবসায়ীর মতো দর-কষাকষি করলাম। শেষপর্যন্ত আমরা ছয়টি জাহাজের দাম পাঁচশো রূপার ডেবেনে একমত হলাম। ফামেনথ মাসের শেষে মধ্যসাগরের পূর্ব উপকুলে সুমেরিয় বন্দর সিডনে জাহাজগুলো হস্তান্তর করা হবে।
তুঘোড় একটি ব্যবসা করতে পেরেছেন এই খুশিতে রাজা নিমরদ আমাদের চুক্তি উদ্যাপন করার উদ্দেশ্যে আমাদের সকলকে সন্ধ্যায় একটি বিশেষ ভোজে আমন্ত্রণ জানালেন।
.
পরিষদ কক্ষ বের হয়ে আসার পর ফাট তুর আমার পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে আমাকে বেশ জোরে বললেন, আমি আপনাকে কথা দিয়েছিলাম ইশতারের মন্দির দেখাতে নিয়ে যাবো। মন্দিরটি কখনও বন্ধ হয় না, কাজেই আপনি যখন ইচ্ছা সেখানে যেতে পারেন। সন্ধ্যায় রাজকীয় ভোজের আগে আমাদের হাতে কাটাবার মত কয়েক ঘন্টা সময় আছে।
নিমরদ যেরকম বিক্রি ব্যবসায়ে খুশি হয়েছিল তেমনি আমিও যুদ্ধ জাহাজগুলো অর্জন করতে পেরে বেশ খুশি হয়েছিলাম। আসলে আমি এর দ্বিগুণ দাম দিতে প্রস্তুত ছিলাম। ফলে আমার মনে খুশি খুশি ভাব থাকায় আমি তার প্রস্তাবে রাজি হয়ে বললাম, আপনি যেরকম বলছেন যে, মন্দিরটি বেশ চমৎকার আর এটা দেখে শেখার মতো কিছু আছে তাহলে চলুন এখুনি সেখান থেকে ঘুরে আসি।
প্রাসাদ থেকে বের হয়ে নদীর তীর দিয়ে হেঁটে আমরা ইশতার দেবীর মন্দিরের দিকে এগোলাম। যেতে যেতে ফাট তুর এর ইতিহাস বর্ণনা করলো, আমি আগেই আপনাকে বলেছি রাজা মারদুকের একশোরও বেশি স্ত্রী এবং রক্ষিতা ছিল, তারপরও দেবী ইশতারের প্রতি তার প্রচণ্ড আকর্ষণ ছিল। তার মন জয় করার জন্য প্রথমে এই মন্দিরটি নির্মাণ করলো। কিন্তু এতেও দেবীকে প্রলুব্ধ করতে না পেরে নদীর অপর তীরে বিশাল অট্টালিকাটি নির্মাণ শুরু করলো। দুজনেই ঘুরে অট্টালিকাটির অসমাপ্ত চূড়াটির দিকে তাকালাম, যা সেই চমকপ্রদ শূন্যদ্যানের সর্বোচ্চ মঞ্চের উপরে দেখা যাচ্ছে। আমি আপনাকে ইতোমধ্যে বলেছি দেবীকে লাভ করার ইচ্ছা চরিতার্থ করার আগেই মারদুক মৃত্যুবরণ করে। রাজা মারদুকের একটি বস্তুর প্রতি আকর্ষণ কেন্দ্রীভূত হলেও তার পুত্র রাজা নিমরদের আকর্ষণ ছিল বিভিন্ন দিকে। সে গর্ব করে বলে মৃত্যুর আগে সে সুমেরিয়ার সমস্ত আবেদনময়ী নারীর সাথে তার কামবাসনা মেটাবে: সে তরুণি হোক কিংবা বয়ষ্ক হোক, বিবাহিতা হোক কিংবা কুমারি হোক।
আমি মন্তব্য করলাম, একজন রাজার পক্ষে এ-ধরনের ইচ্ছা পোষণ করা খুব একটা অযৌক্তিক বলা চলে না। তবে তার শিকার করার ব্যাপারটি দেখে মনে হচ্ছে রাজা নিমরদ গুণগত মানের চেয়ে সংখ্যার প্রতি বেশি মনোযোগ দেন। তবে তার চোখ দুটো কি দেহের অন্যান্য অঙ্গের চেয়ে খুব বেশি বড় না?
ফাট তুর মাথা নেড়ে বললো, এটি সুবিদিত যে রাজা নিমরদ সদা অতৃপ্ত।
আমি বললাম, কিন্তু এর সাথে তার বাবার মন্দিরের সম্পর্ক কি?
সিংহাসনে আরোহণ করার ছয় মাসের মধ্যে রাজা নিমরদ একটি নির্দেশ জারি করলেন যে, তার রাজ্যের প্রত্যেক নারী জীবনে একবার মন্দিরে এক দিন কাটাবে। সেখানে শত্রু মিত্র কিংবা অচেনা যে পুরুষ তার সাথে যৌন মিলন করতে চাইবে সে তা করতে বাধ্য। কোনো নারী এই আদেশ অমান্য করতে পারবে না আর কোনো স্বামী তার স্ত্রীকে এই মিলনে বাধা দিতে পারবে না।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, তার মানে রাজা নিমরদ কী তার প্রজাদের সাথে এক সারিতে দাঁড়িয়ে তার সঙ্গিনী বাছাই করবেন? ফাট তুর মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
রাজকীয় ফরমান অনুযায়ী মেয়েরা সূর্যোদয়ের আগে মন্দিরে তাদের জায়গায় বসে পড়বে, তবে কেবল একজন পুরুষ তার সঙ্গিনী বাছাই করতে দুপুরের আগে মন্দিরে ঢোকার অনুমতি পাবে। নিঃসন্দেহে এবার আপনি আন্দাজ করতে পারছেন সেই লোকটি কে হতে পারে। তারপর সে আবার মৃদু হেসে বললো, দুপুরের পর অবশ্য যে কোনো সুমেরিয় পুরুষ মন্দিরে ঢুকে তার পছন্দমতো সঙ্গিনী বাছাই করতে পারবে।
মন্দিরের সামনের প্রবেশ পথে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। পবিত্র অঙ্গনের মূল দ্বারে ঢোকার জন্য পঞ্চাশ জনেরও বেশি পুরুষ সার বেঁধে অপেক্ষা করছে। সৈনিক, নাবিক থেকে শুরু করে সাদাটুপি পরা আইনবিদ এবং রক্ত মাখা কালো আলখাল্লা পরা শল্য চিকিৎসকও সারিতে রয়েছে।
এক দিকে আঙুল তুলে ফাট তুর বললো, দেবীর পুরোহিত এবং যাজিকারা সবুজ আলখাল্লা পরে আলাদা রয়েছেন। ঐ যে একজন পুরোহিত এদিকে আসছেন। তার নাম অনিওস। তিনি আমাদেরকে সবকিছু ঘুরিয়ে দেখাবেন। আর এর রহস্য ব্যাখ্যা করবেন।
অনিওস বেশ সম্মান দেখিয়ে আমাদের স্বাগত জানালেন, তারপর মূল ফটকের পাশে একটি ছোট বন্ধ দরজার দিকে নিয়ে গেলেন। আমরা এগোতেই দরজাটা ভেতর থেকে কেউ খুলে দিতেই আমরা মন্দিরের মূল অংশে ঢুকলাম।
এটি এতো বিশাল যে মাথার উপরে সূউচ্চ ছাদ অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে। ছাদ থেকে কেবল এক ফালি সূর্য রশ্মি নিচে নেমে এসে মেঝের কেন্দ্রস্থলে দেবীর সোনালি মূর্তিটিকে আলোকিত করেছে।
