.
ভাবলাম আর কখনও হয়তো ঘুমাতে পারবো না। এখন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি রাত সেই মাথা ঢাকা নারীর প্রতিমূর্তি চোখে ভেসে থাকবে। অবশ্য তা হল না।
সেই সন্ধ্যায় তারাভরা আকাশের নিচে বারান্দায় পাতা বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে চোখ বুজার সাথে সাথেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। তারপর ফাট তুর হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে আমার ঘুম ভাঙালো।
আমি উঠে বসে বুঝলাম সূর্য দিগন্তের উপরে এসেছে। ফাট তুরের পেছনে আমার পরিচর্যার সমস্ত জিনিসপত্র নিয়ে চাকরবাকর আর ক্রীতদাসেরা সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
ফাট তুর বললো, উইন তায়তা! রাজা নিমরদ তার সমরপরিষদ ডেকেছেন আর সেখানে আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
সকালের উজ্জ্বল রোদে আমার চোখ পিট পিট করে উঠলো। গতরাতের বেদনাময় স্মৃতির পরও আমার সারা শরীর ঝরঝরে হয়ে রয়েছে।
মহামান্য রাজা যদি আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকেন তাহলে এখানে আর সময় নষ্ট করে লাভ কী ফাট তুর? চলুন কাজে লেগে পড়ি। আসলে এমন সময়ে একটুখানি রসিকতা করে আমি বুঝাতে চেয়েঠিলাম যে আমার মন হালকা হয়ে আছে।
সমরপরিষদ কক্ষে পৌঁছার পর দেখলাম বেশির ভাব সুমেরিয় সামরিক নেতৃবৃন্দ পুরোদস্তুর সামরিক পোশাক এবং বুকে বিভিন্ন সম্মানসুচক পদক লাগিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। কেবল রাজা নিমরদ এখনও এসে পৌঁছাননি।
যথারীতি সম্ভাষণের পর অভ্যর্থনামূলক বক্তৃতার জবাবে আমি উত্তর দিলাম, তবে দোভাষি ফাট তুরের মাধ্যমে। আমি এখনও অপর পক্ষকে জানাতে প্রস্তুত নই যে তাদের ভাষা আমার ভালোভাবেই জানা আছে। তারপর আলোচনা শুরু করলাম।
ভদ্রমহোদয়গণ, আমি সম্পূর্ণরূপে অবগত যে আপনাদের নৌবাহিনী সমস্ত সাগরের মাঝে অজেয়। আপনাদের রণতরীগুলো মহাশক্তিশালী, আপনাদের নৌবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষ এবং সাহসী। মনে হল এসব প্রশংসাসূচক কথাবার্তা শুনে ওরা সবাই খুশি হয়েছে, যদিও তা অতিশয়োক্তি ছিল। ক্রিটের সর্বাধিরাজ মিনোজের এর চেয়েও শক্তিশালী নৌবহর রয়েছে। তাদের সমুদ্র বাণিজ্যের পরিমাণ সুমেরিয়দের চেয়ে অনেকগুণ বেশি। তারপর আমি আমার প্রস্তাবটি উপস্থাপন করলাম, আমি আপনাদের ছয়টি বড় জাহাজ কিনে নিয়ে হাইকসো ভণ্ড জবরদখলকারি গোরাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কাজে লাগাতে চাই।
সুমেরিয় নৌবাহিনীর প্রধানের নাম নৌ-অধ্যক্ষ এলোরাস। লম্বা ছিপছিপে দেহের অধিকারি এই ব্যক্তিটির দাড়ি সযত্নে পাকানো। চোখের নিচে কালি আর দাঁতে ক্ষয়ের দাগ। আমার অনুরোধ শুনে লোকটি ভ তুলে মুখে চুকচুক করলো। যেন খুব একটা মজা পেয়েছে।
তারপর সে বললো, সম্মানিয় তায়তা, আমি জানি আমাদের উভয়েরই সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে আপনার যুদ্ধের সদিচ্ছাকে রাজা নিমরদ প্রশংসা করেন। তবে রাজা নিমরদের হয়ে আমি আপনাকে জানাচ্ছি একটি মাত্র জাহাজের দামই অনেক। আর ছয়টি জাহাজ… এখানে সে থেমে গেল।
আমি তার সাথে একমত হয়ে জানালাম, যুদ্ধের কোনো উপকরণই সস্তা নয়। রাজা নিমরদের মতো আমাদের ফারাও তা ভালো করেই জানেন। মিসর একটি অনাকাঙ্খনীয় অবস্থানে রয়েছে। হাইকসোরা উত্তরে আখেনতন থেকে মধ্যসাগর পর্যন্ত নীল নদী নিয়ন্ত্রণ করছে। হাইকসো জবরদখলকারি গোরাবের বিরুদ্ধে লড়ার মতো সমুদ্রগামি যুদ্ধ জাহাজ আমাদের কাছে নেই। আমাদের আছে কেবল নদীপথে চলাচলকারী বড় নৌকা। এগুলো নীল নদীতে আটকে রয়েছে। খোলা সাগরে যদি আমরা তার নৌবহরে আকস্মিক হামলা করতে পারি তাহলে আমরা কী ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতে পারবো, ভেবে দেখুন।
জামার হাতার ভাঁজ থেকে একটা প্যাপিরাসের টুকরা নিয়ে টেবিলের উপর রাখলাম। এডমিরাল প্রথমে কাগজটার উপর চোখ বুলালেন কিন্তু যখন বুঝতে পারলেন এতে আমি সুমেরিয় ছয়টি প্রধান যুদ্ধ জাহাজের নামধাম আর পুরো বিবরণ লিখে রেখেছি, তখন কাগজটা টেবিল থেকে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে নিবিষ্টভাবে দেখতে শুরু করলেন। তারপর কাগজের উপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন।
তারপর জানতে চাইলেন, এসব গোপনীয় তথ্য আপনি কোথায় পেলেন? আমি মাথা নেড়ে বোঝাতে চাইলাম যে, তার কথা আমি বুঝতে পারিনি। আসলে ফাট তুরের চরেরা এই তালিকাটা আমার জন্য তৈরি করেছিল।
বরং আমি ভদ্রভাবে তাকে বললাম, আপনারা এই জাহাজগুলো বিক্রি করতে পারবেন? আর কত দামে বলুন?
এলোরাস উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে বললো, মার্জনা করবেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবার আগে আমাকে অবশ্যই মহামান্য রাজার সাথে পরামর্শ করতে হবে। একথা বলে সে দ্রুত পরিষদ কক্ষ থেকে বের হয়ে গেল। তারপর দেয়ালে দাঁড় করানো পানির ঘড়িতে প্রায় এক ঘন্টা পার হওয়ার পর ফিরে এলো।
তারপর এডমিরাল এলোরাস বললো, রাজা নিমরদ আপনাকে জানাতে বলেছেন, যে জাহাজগুলোর কথা আপনি বলেছেন সেগুলো প্রতিটি নির্মাণ করে পানিতে ভাসাতে একশো পঞ্চাশ রূপার ডেবেন পড়েছে। এখন যদি তিনি এগুলো বিক্রিও করতে চান, যার হয়তো কোনো সম্ভাবনা নেই, সেক্ষেত্রে এর চেয়ে কম দাম হতে পারে না। সে যে দর হেঁকেছে ফাট তুর তা তর্জমা করতে করতে আমি দ্রুত একবার হিসাব করে নিলাম। এক লাখ রূপায় দশ হাজার ডেবেন হয়। আমার উটের পিঠে যে থলেগুলো আছে তা দিয়ে চল্লিশটা যুদ্ধ জাহাজ কেনা যায়। কিন্তু আমি এলোরাসকে বললাম প্রতিটি জাহাজের জন্য আমি পঁচাত্তর রূপার ডেবেন দিতে পারবো।
