জেটি থেকে তুগার্টার নেতৃত্বে শোভাযাত্রা করে আমরা প্রাসাদের রাজদরবার কক্ষের দিকে এগোলাম। উঁচু ছাদওয়ালা গুহার মতো একটা কামরা। যুদ্ধক্ষেত্র এবং শিকারের বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন দেয়ালে ঝুলানো রয়েছে। এসব প্রদর্শনী থেকে আপাত বুঝা যাচ্ছে যে, রাজা নিমরদ একশোরও বেশি সিংহ এবং বাইসন শিকার করেছেন। শিকারের পশুর মাথা ও চামড়া আর মানুষের ঘাম মিশ্রিত দুর্গন্ধে কামরাটির পরিবেশ দুর্গন্ধময় হয়ে রয়েছে। ফাট তুর অবশ্য আমাকে আগেই বলেছিল যে, সুমেরিয়রা স্নান করাটাকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মনে করে।
রত্নখচিত সাদা মার্বেল পাথরের বেদীর উপর সোনা ও হাতির দাঁতের সিংহাসন থেকে রাজা নিমরদ উঠে দাঁড়াতেই আমি লক্ষ্য করলাম, তার প্রজাদের চেয়ে তিনি অনেক লম্বা। চওড়া কাঁধ, পেশিবহুল হাত। প্রত্যেক আঙুলে আংটিপরা ডান হাত উঠিয়ে তিনি আমাদেরকে স্বাগত জানালেন। চওড়া হাতটি দেখে আমার মনে হল এই হাত দিয়ে তিনি আমার মাথা ঢেকে ফেলতে পারবেন। আমার দুই রাজকুমারীর দিকে যখন তাকালেন, তখন তার কালো চোখে লালসা ফুটে উঠলো। সাথে সাথে আমি বুঝতে পারলাম সে যেমন একজন শক্তিশালী শিকারী সেই সাথে একজন লম্পটও বটে।
পরবর্তী কয়েক ঘন্টা দোভাষীর মাধ্যমে আমরা কেবল গতানুগতিক আর কৃত্রিম সৌজন্যসূচক কথা এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করে কাটালাম। তারপর রাজা নিমরদ বিশ্রামের জন্য চলে যাওয়ার পর আমাদেরকে প্রাসাদে আমাদের থাকার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হল।
আমার থাকার জন্য যে কামরাগুলো নির্দিষ্ট করা হয়েছিল, তা দেখে আমি বুঝতে পারলাম ওরা আমার গুরুত্ব এবং পদমর্যাদা বুঝতে পেরে যথাযথ স্বীকৃতি দিয়েছে। বড় বড় কামরাগুলো নদীর দিকে মুখ করা, যথেষ্ট আলো বাতাস চলাচল করতে পারে। আর সামনেই ইশতার দেবীর মন্দির। দামী কাঠের আসবাব দিয়ে কামরাগুলো সজ্জিত। পর্দাগুলো পশমী এবং দামী রেশমি কাপড়ের। বিশাল আর অস্বাভাবিক আকারের বিছানাটি দেখে আমি ঠিক করলাম অন্য কোথাও শোবো।
ফাট তুরের সাহায্য নিয়ে প্রাসাদের কয়েকজন কর্মীকে দিয়ে গরম পানির বড় বড় কয়েকটা বালতি ঘরের বাইরে বারান্দায় আনার ব্যবস্থা করলাম। তারপর পোশাক খুলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসতেই আমার ক্রীতদাসেরা আমার মাথা আর শরীরে পানি ঢালতে শুরু করলো। স্নান শেষ করতেই সূর্য পশ্চিম দিগন্তে ঢলে পড়লো। তারপরও গরম তখনও কমেনি। সন্ধ্যায় পূর্ব দিগন্তে বরফে ঢাকা জাগোস পর্বত চূড়া থেকে মিষ্টি শীতল বাতাস বইতে শুরু করলো।
স্নান সমাপনের পর ক্রীতদাসদের বিদায় দিয়ে আমি নগ্ন অবস্থায়ই আরও কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে রইলাম। অস্তমান সূর্য আর নিচে নদীর বুকে আলোর খেলা দেখে আনন্দে সময় কাটালাম।
হঠাৎ মনে হল কেউ আমাকে লক্ষ্য করছে। দ্রুত ঘুরে সামনে রাজপ্রাসাদের পাশেই উঁচু মন্দিরের দিকে তাকালাম। মন্দিরের চত্বরগুলো আমার খুব কাছ দিয়ে ঘুরে ঘুরে মাটি থেকে চূড়া পর্যন্ত উঠে গেছে। এতো কাছে যে আমি বেশ সহজেই এর উপর একটা পাথর ছুঁড়ে মারতে পারি।
আমার ঠিক উল্টো দিকে চত্বরে আপাদ মস্তক আলখাল্লায় ঢাকা একটি মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাথা ঢাকা কাপড়ের ছায়ায় চোখদুটো দেখা না গেলেও অনুভব করলাম সে আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। এভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমাকে দেখা সত্ত্বেও আমি স্বচ্ছন্দেই রইলাম। তবে অচেনা মানুষটির পরিচয় জানতে আমার ভীষণ কৌতূহল হল। আমি যথেষ্ট সচেতন যে, অনেক আগের কয়েকটা ক্ষতের দাগ ছাড়া আমার দেহ দীর্ঘ এবং অত্যন্ত সুগঠিত। প্রচুর ঘোড়দৌড় আর ব্যায়ামের ফলে দেহের পেশিগুলো শানানো রয়েছে। বিনয়ের কারণে সাধারণত আমি নিজেকে সুন্দর হিসেবে বর্ণনা করি না, তবে সতোর কারণে এই মুহূর্তে নিজেকে তাই বলা দরকার।
অচেনা মানুষটি আর আমি দুজনেই শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে পরস্পরকে লক্ষ্য করতে লাগলাম। তারপর আপাদমস্তক আলখাল্লা ঢাকা মূর্তিটি দুই হাত তুলে মাথা ঢাকা কাপড়টি কাঁধের চারদিকে ফেলে দিল। প্রথমে আমার ধারণা ছিল লোকটি একজন পুরুষ, কিন্তু এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হল।
আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে অপূর্ব সুন্দরী একজন নারী। দিব্যকান্তি অপরূপ সুন্দর মুখটি দেখে আমার তীব্র মানসিক কষ্ট হল। এই রূপ বর্ণনা করার কোনো ভাষা খুঁজে পেলাম না। আমাদের মহান ভাষার অতিশয়ার্থবাচক সমস্ত শব্দ এর সামনে ম্লান আর গতানুগতিক মনে হল। এমন হৃদয় বিদীর্ণ করা ভাবোচ্ছ্বাস আমি কখনও অনুভব করিনি। এযাবত যার জন্য ক্ষুধার্ত ছিলাম কিন্তু কখনও তা পাই নি তা এখানেই রয়েছে। অমূল্য যে বস্তুটি ভাগ্য সবসময় আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছিল। নারীত্বের মহত্তম রূপটি এখানে উপস্থিত।
নিষ্ফল প্রয়াস জেনে বুঝেও ধীরে ধীরে তার দিকে হাত বাড়ালাম। ভালো করেই জানি এমন অপূর্ব বস্তু সবসময় আমার ধরাছোঁয়ার অনেক দূরে রয়ে যাবে। তবে চিরদিন আমার স্মৃতিতে অম্লান থাকবে।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে কষ্টের হাসি হাসলেন। আমার প্রতি যে কষ্ট আর গভীর অনুতাপ বয়ে এনেছেন তার জন্য সমবেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন। তারপর আবার মুখমাথা ঢাকা কাপড়টা দিয়ে মাথা ঢেকে আমার দিক থেকে ঘুরে মন্দিরের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। আমাকে শোকে নিমজ্জিত করে চলে গেলেন।
