এটা হচ্ছে দেবী ইশতারের পবিত্র মেঘের অট্টালিকা। নিজেকে দেবত্বের পর্যায়ে উন্নিত করার পর রাজা মারদুক এটি বানিয়েছিলেন। তিনি দেবী ইশতারকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। আপনিতো জানেন তায়তা, ইশতার হচ্ছেন ভালোবাসা, যৌনতা এবং যুদ্ধ জয়ের দেবী। এগুলোই মারদকের সবচেয়ে আকাঙ্খিত বস্তু ছিল। তিনি এই সূউচ্চ অট্টালিকাটি নির্মাণের নির্দেশ দেন যাতে ইশতার তার সম্পদ এবং ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়ে নিচে নেমে এই অট্টালিকার মাথায় অবতরণ করেন আর তিনি তাকে বিয়ে করতে পারেন। তারপর স্বামী স্ত্রী হিসেবে ওরা দুজন সমস্ত সৃষ্টিকে শাসন করতে পারেন। তবে দুঃখের বিষয়, এই অট্টালিকা এর পরিকল্পিত উচ্চতায় পৌঁছাবার আগেই মারদক মৃত্যু বরণ করেন। অতএব ইশতারেরও আর পৃথিবীর বুকে নামা হল না। অদৃষ্টের এই পরিহাসের কথা চিন্তা করে ফাট তুর জিহ্বা চুক চুক করলো আর আমিও মৃদু হাসলাম।
আমি বললাম, এখন এই অট্টলিকার কি হবে?
মারদক এটি তার ছেলে, বর্তমান রাজা নিমরদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। একটু পরই তার সাথে আপনার দেখা হবে। তবে নিমরদের এতো সম্পদও নেই আর ইচ্ছাও নেই, যে তার বাবার পরিকল্পনা অনুযায়ী ইশতারকে প্রলুব্ধ করে তার স্বর্গীয় আবাস থেকে নিচে নামিয়ে আনে।
আমি বললাম, আমি শুনেছি লোকে বলাবলি করছে যে, নিমরদ একজন মস্ত শিকারী। তিনি নাকি জাগরোস পর্বতে একশো সিংহ আর একশো বিশাল বাইসন মেরেছেন। এতো বড় একজন শিকারী হলে তো তার নিশ্চয়ই নারীর প্রতিও আকর্ষণ আছে? তাহলে তিনি কেন দেবীর সাথে প্রেমবিলাসের এই সুযোগটি ছেড়ে দিলেন?
আমার বিশ্বাস দেবীকে শয্যা সঙ্গিনী হিসেবে পেতে তিনি নিশ্চয়ই ভালোবাসবেন। শোনা যায় একজন দক্ষ শিকারীর মতো একাজেও তিনি একজন ভালো খেলোয়াড়। তবে অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তার কোষাগারের অর্থের পরিমাণ তার বিশেষ অঙ্গের মতো প্রসারিত হয় না।
রাজা নিমরদের প্রাসাদটি ভালোভাবে দেখার জন্য আমি ফাট তুরের হাত ধরে তাকে বজরার অন্য পাশে নিয়ে গেলাম। বিশাল ভবনটির আকার আর জাকজমক দেখে আমি কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তারপর একটু সামনে প্রাসাদের পাশেই একটি বিশাল মন্দিরের দিকে আমার চোখ পড়লো।
ইউফ্রেটিস নদীর তীরে পৌঁছার পর শালদিসের উরের যে মন্দির চত্বরে আমরা থেকেছিলাম তার চেয়ে তিনচারগুণ বড়। পিরামিড আকৃতির না হয়ে এটি গোলাকার। মূল ভবনটির চতুর্দিক ঘিরে চত্বর মাটি থেকে একেবারে চূড়া পর্যন্ত উঠে গেছে।
আমার নজর এই ভবনটির দিকে লক্ষ্য করে ফাট তুর বললো, এটি হচ্ছে ইশতার দেবীর মন্দির। তবে দেবীর অট্টালিকার সঙ্গে এটাকে মিলিয়ে ফেলবেন না। এটি একটি চমৎকার স্থান। এর চারদেয়ালের মাঝে যে ধরনের উৎসব হয় তা বর্ণনা করা যায় না। বরং আমি আমি প্রথম সুযোগেই এর ভেতরে নিয়ে যাবো যাতে আপনি তা চাক্ষুষ উপভোগ করতে পারেন।
আমি বললাম, আপনি আমার মাঝে বেশ কৌতূহল জাগিয়ে তুলেছেন ফাট তুর।
সে রহস্যজনকভাবে হেসে বললো, আপনার কৌতূহলে সন্তুষ্টি জোগাতে পারলে আমি খুশি হব। তারপর সে প্রাসাদের দেয়ালের নিচে নদীর তীরে পাথরের জেটিতে ভীড় করে থাকা জমকালো পোশাক পরা একদল লোককে দেখিয়ে বললো:
ফারাওয়ের দূত এবং রাজকীয় বাজপাখির সিলমোহরের ধারক হিসেবে আপনাকে অভ্যর্থনা জানাতে রাজা নিমরদের রাজদরবারের প্রধান ব্যক্তি সম্মানিত রাজসদস্য তুগার্টা আর অন্যান্য বিশিষ্ট সভাসদগণ সমবেত হয়েছে। এটি অত্যন্ত সম্মানসূচক একটি ঘটনা। মহামান্য রাজা নিজে আপনাকে স্বাগত জানাতে প্রাসাদের রাজদরবারে অপেক্ষা করছেন।
আমি দ্রুত হেঁটে ডেকের অন্যধারে যেখানে রাজকুমারীরা তাদের ক্রীতদাস-দাসীদের দ্বারা ঘিরে ছিলেন সেখানে গেলাম। জেটিতে অভ্যর্থনা দলের সদস্যদের দেখাবার জন্য আমি বেশ নিচু হয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে তাদেরকে অভিবাদন করলাম আর সেই সাথে ফিসফিস করে মনে করিয়ে দিলাম মিসরের ফারাও রাজপরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে যথাযথ আচরণ করতে যা, আমি তাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর আমি ফাট তুরকে পাশে নিয়ে তাদের পেছনে অবস্থান নিলাম।
বজরা জেটির কাছাকাছি আসতেই আমি সুমেরিয় অভিজাত দলটির সদস্যদের লক্ষ্য করার সুযোগ পেলাম।
প্রথমেই আমার চোখে পড়লো মেয়েরা এমনকি বয়স্করাও তাদের পুরুষ সহযোগীদের চেয়ে বেশ সুন্দর। তাদের তামাটে রংয়ের চামড়া উজ্জ্বল চকচকে এবং মসৃণ। গভীররাতের মতো কালো চুল আর নীলচে-কালো দুইচোখে রঙ মাখা। সবার মাঝে একধরনের সহজাত মর্যাদা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কঠিন চেহারার পুরুষেরা বেশ লম্বা। লম্বা নাক বাঁকা। উঁচু চিবুক। আর কালো চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। দীর্ঘ ঢেউ খেলানো দাড়ি কোমর পর্যন্ত নেমে এসেছে। নারী পুরুষ সবাই গোড়ালি পর্যন্ত লম্বা বিভিন্ন ধরনের নকশা করা পশমী পোশাক পরে রয়েছে।
কোনো ভুল নেই এখানে অভিজাত, যোদ্ধা এবং শক্তিশালী নারী পুরুষের সমাবেশ হয়েছে।
পাথরের জেটি থেকে একটি সুসজ্জিত কাঠের সিঁড়ি বজরায় নামিয়ে দেওয়া হল। আমরা সিঁড়ি বেয়ে তীরে নেমে রাজসদস্য তুগার্টার সামনে এলাম। ফাট তুর আমাদের দোভাষী হিসেবে কাজ করলো। আমি প্রশান্ত গাম্ভীর্য বজায় রেখে পেছনেই রইলাম। আমি চাই না যে আমাদের আতিথ্যকর্তারা জানুক যে, আমি তাদের ভাষা জানি। সামনে অনেক কঠিন দর কষাকষির ব্যাপার আছে কাজেই যতটুকু সম্ভব সুবিধা পাওয়া যায় তা আদায় করতে হবে।
